আজ জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও কালজয়ী মাসুদ রানা ধারাবাহিকের স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেনের ৪র্থ মৃত্যুবার্ষিকী। ষাটের দশকের মধ্যভাগে সেবা প্রকাশনীর ব্যানারে তিনি যে রোমাঞ্চকর গুপ্তচর চরিত্রটি সৃষ্টি করেছিলেন, তা কয়েক প্রজন্মের পাঠকের কল্পনাজগৎকে আন্দোলিত করেছে। মাসুদ রানার আগে তার হাতেই জন্ম নেয় রহস্যময় চরিত্র কুয়াশা। সাহিত্যজগতে তিনি বিদ্যুৎ মিত্র ও শামসুদ্দীন নওয়াব ছদ্মনামেও লিখেছেন।
কাজী আনোয়ার হোসেন জন্মগ্রহণ করেন ১৯৩৬ সালের ১৯ জুলাই ঢাকায়। তার পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন, ডাকনাম নবাব। পৈত্রিক নিবাস রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। তিনি ছিলেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেনের পুত্র। চার ভাই ও সাত বোনের বড় পরিবারে তার শৈশব কেটেছে জ্ঞান ও সংস্কৃতির আবহে।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ সংলগ্ন গেস্ট হাউসে তার শৈশবের বড় একটি সময় কাটে। পরবর্তীতে পরিবার সেগুনবাগিচায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। শিক্ষাজীবনে তিনি সেন্ট গ্রেগরি স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএ ও বিএ এবং ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
লেখালেখির পাশাপাশি সংগীতচর্চাতেও তিনি যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা বেতারে নিয়মিত গান গেয়েছেন। তার তিন বোন সানজীদা খাতুন, ফাহমিদা খাতুন ও মাহমুদা খাতুন রবীন্দ্রসংগীতের বিশিষ্ট শিল্পী।
১৯৬৩ সালে বাবার দেওয়া দশ হাজার টাকা নিয়ে তিনি সেগুনবাগিচায় একটি ছোট প্রেস স্থাপন করেন, যা পরবর্তীতে সেবা প্রকাশনী নামে পরিচিত হয়। এই প্রকাশনী বাংলা পেপারব্যাক বই, কিশোর সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদে এক নতুন ধারার সূচনা করে। ১৯৬৪ সালে প্রকাশিত কুয়াশা-১ দিয়েই সেবা প্রকাশনীর যাত্রা শুরু হয়।
১৯৬৬ সালে ‘ধ্বংস পাহাড়’ গ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে শুরু হয় মাসুদ রানা সিরিজ। পরবর্তীতে এই চরিত্রকে কেন্দ্র করে চার শতাধিক গুপ্তচর কাহিনি প্রকাশিত হয়, যা বাংলা জনপ্রিয় সাহিত্যের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
তিনি ১৯৬২ সালে কণ্ঠশিল্পী ফরিদা ইয়াসমিনকে বিয়ে করেন। তার এক মেয়ে ও দুই ছেলে। মেয়ে শাহরীন সোনিয়া একজন কণ্ঠশিল্পী এবং দুই ছেলে কাজী শাহনূর হোসেন ও মায়মুর হোসেন সেবা প্রকাশনী ও লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত।
চলচ্চিত্রেও তার অবদান রয়েছে। ১৯৭৪ সালে শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার ও সংলাপ রচয়িতা হিসেবে তিনি বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া সিনেমা পত্রিকা ও জহির রায়হান চলচ্চিত্র পুরস্কারেও তিনি সম্মানিত হন।
২০২১ সালের অক্টোবরে তাঁর প্রোস্টেট ক্যান্সার ধরা পড়ে। এরপর একবার ব্রেইন স্ট্রোক ও হার্ট এটাক হয়। ২০২২ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় তিনি ২০২২ সালের ১৯ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।
কাজী আনোয়ার হোসেন চলে গেলেও, ‘মাসুদ রানা’ ও ‘কুয়াশা’র মতো চরিত্রের মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে চিরকাল বেঁচে থাকবেন রোমাঞ্চপ্রিয় পাঠকদের হৃদয়ে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









