দেশে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যু কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। এরই মধ্যে রোগটিতে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ৫২২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ঈদুল আজহা উপলক্ষে শুরু হওয়া গণ-ঈদযাত্রা হামের সংক্রমণ পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশজুড়ে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম পরিচালিত হলেও এখনো কার্যকর ‘হার্ড ইমিউনিটি’ গড়ে ওঠেনি। তদুপরি, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অন্তঃসত্ত্বা মায়েদের প্রয়োজনীয় আয়রন ও ফলিক অ্যাসিড প্রদান না করা এবং পরপর দুই বছর দেশব্যাপী ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন না হওয়ায় শিশুরা অপুষ্টিজনিত দুর্বলতায় ভুগছে। এটি সামগ্রিকভাবে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুঝুঁকি বাড়াতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
এক চিকিৎসা গবেষক জানান, নির্দিষ্ট বয়সে (৯ থেকে ১৫ মাস) টিকা পাওয়ার পরও ৫ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুদের একাংশের শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দেখা যাচ্ছে না। ফলে হার্ড ইমিউনিটি তৈরির জন্য বুস্টার ডোজ প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গবেষণার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিনের ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান ডা. আরিফা আকরাম বলেন, “ঈদের ছুটিতে অসংখ্য মানুষ ঢাকা ছাড়ছে এবং কয়েক সপ্তাহ পর আবার ঢাকায় ফিরবে। এতে ঈদের পরে হামের সংক্রমণ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।” একইভাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, অবাধ ঈদযাত্রা হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় প্রতিবন্ধকতা। যাদের ছোট শিশু রয়েছে, তাদের এই সময়ে ঈদযাত্রা পরিহার করাই উত্তম।
সংক্রমণ এড়াতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও শিশুদের নিয়ে সতর্কভাবে চলাচলের পরামর্শ দিয়েছেন। বাস, ট্রেন এবং অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে শিশুদের না নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আক্রান্ত শিশুদের কাছ থেকে সুস্থ শিশুদের দূরে রাখতে হবে এবং এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
উল্লেখ্য, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় গত ২০ এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়, যা স্থানভেদে ১২ মে এবং ২০ মে পর্যন্ত চলে। এর আওতায় প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা গ্রহণের পর শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে প্রায় এক মাস সময় লাগে। যেহেতু ধাপে ধাপে টিকা দেওয়া হয়েছে, তাই পূর্ণাঙ্গ হার্ড ইমিউনিটি পেতে আগামী ২০ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।
২৪ ঘণ্টার পরিস্থিতি:
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং নতুন করে ১২৮ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে। গতকাল রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত নিশ্চিত হামে ৮৬ জন এবং সন্দেহজনক লক্ষণে ৪৪২ জনসহ মোট ৫২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছে ঢাকায় এবং ৮০ জন মারা গেছে রাজশাহী বিভাগে।
গত ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৩০৬ জন হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন, যাদের মধ্যে ১ হাজার ১৬৯ জনই ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে দেশে মোট সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা ৬৩ হাজার ৮১৩ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৮ হাজার ৬২২ জন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









