সমতলের চা-বাগান আর কাঞ্চনজঙ্ঘা কারণে বেশ খ্যাতি রয়েছে উত্তরের প্রান্তিক জনপদ পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার। এই অঞ্চলের মানুষের আধুনিক চিকিৎসা-সুবিধা পাওয়া এখনো অনেকটা স্বপ্নের মতো। সেই সীমান্তঘেঁষা প্রান্তিক জনপদের এক স্বাস্থ্যকর্মী নারী নিজের দায়িত্ববোধ, মমতা আর দৃঢ়সংকল্পে বদলে দিয়েছেন হাজারো অসহায় দরিদ্র মায়ের জীবন। উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নে কাজীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে ১৪২৩ টি স্বাভাবিক প্রসব করিয়ে রেকর্ড গড়েছেন স্বাস্থ্যকর্মী নেহেরুন নেহার লিলি। প্রসূতি মায়েদের অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার করে সন্তান জন্মদানের প্রবণতা কমিয়ে আনছেন তিনি। তাই লোকে তাকে ডাকে ‘নরমাল আপা’।
কাজীপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে ২০১১ সালে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) পদে যোগদান করেন লিলি। এরপর ২০১৪ সালে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতাল থেকে কমিউনিটি স্কিল ব্যর্থ অ্যাটেনডেন্ট (সিএসবিএ) বিষয়ে ৬ মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি ২০১৫ সালে প্রথম নরমাল ডেলিভারি শুরু করে সফল হন। তখন থেকেই তিনি মায়েদের স্বাভাবিক প্রসবের কাজকর্মে নিয়োজিত আছেন।
মেহেরুন নেহার লিলি জানান, প্রথমে দিকে ভয়ে ভয়ে স্বাভাবিক প্রসব কার্যক্রম শুরু করেন। তার এই উদ্যোগ সফল হলে তার সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এ পর্যন্ত তিনি ১ হাজার ৪২৩ টি স্বাভাবিক প্রসব করিয়েছেন। যার অধিকাংশই সুবিধাবঞ্চিত হতদরিদ্র, চা শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, দিনমজুর পরিবারের বধূ। তিনি আরো জানান, ‘আমি আমার দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে মানব সেবার মহান ব্রত নিয়ে এই কাজ করছি। গভীর রাত, বৃষ্টি, ঝড়, তীব্র শীত উপেক্ষা করে যখন একটি ফুটফুটে শিশুর মুখ দেখি তখন সব ক্লান্তি ভুলে যাই।
এমনিতেই গর্ভকালীন, প্রসব-পূর্ব ও প্রসব-পরবর্তী স্বাস্থ্যসেবা, প্রেগনেন্সি চেক আপ, প্রেসার চেক আপ, ডায়াবেটিস চেক আপ, অপারেশন পরবর্তী ড্রেসিং ও সেলাই কাটা হয়ে থাকে। রাত নয়, দিন নয় যখনই সমস্যা, তখনই ডাক। সরাসরি অথবা মুঠোফোনে সমস্যার কথা বলছেন মায়েরা। তিনি সমস্যার প্রকৃতি বুঝে পরামর্শ দেন। নয়তো মায়েদের কাছে ছুটে যান। কোন জটিলতা দেখলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। এ পর্যন্ত কোন দুটনা ঘটেনি। জন্ম নেওয়া প্রতিটি শিশুই সুস্থ আছে। মায়েরাও সুস্থ আছেন। যেসব মায়ের অবস্থা রিস্ক মনে হয় তাদেরকে তিনি সরকারি হাসপাতালে রেফার করেন। এছাড়াও তিনি কমিউনিটি ক্লিনিকে সরকারি ২২ ধরণের ওষুধসহ সকল সেবা দেন।
‘মেহেরুন নেহার ৩ কন্যা সন্তানের জননী। তার স্বামী মকসেদ আলী, সিএ পদে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত। মকসেদ আলী বলেন, আমার স্ত্রীর এই মহৎ কাজ করতে সবসময়ই পাশে থেকে সহযোগিতা করেছি, উৎসাহ দিয়েছি, সে অসহায় মানুষের সেবা করছে। এতে মৃত্যুঝুঁকি কমার পাশাপাশি অর্থ ব্যয় থেকে রক্ষা পাচ্ছে। মেহেরুন নেহার লিলি আরও জানান, যতদিন সুস্থ আছি প্রান্তিক নারীদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখব।
সেবাগহিতা লিপা বেগম জানান, আমাদের সকল মায়েদের আস্থার জায়গা করে নিয়েছেন মেহেরুন আপা, দোয়া করি তার জন্য। নরমাল ডেলিভারির কাজে সন্তুষ্ট গৃহবধূ আরফিনা বেগম বলেন, লিলি আপা ভালো মানুষ। যখনই তাকে ফোন দিই তখনই পাওয়া যায়। নরমাল ডেলিভারিতে তাকে ডাকলেই পাওয়া যায়। খুব সুন্দরভাবে অল্প সময়েই আমার ডেলিভারি সম্পন্ন করেছেন। তার কাজে আমিসহ সবাই সন্তুষ্ট। ইউপি সদস্য ও ক্লিনিক গ্রুপের সভাপতি রাইতু মোহাম্মদ বলেন, নরমাল ডেলিভারিতে অত্র উপজেলার একটি ভালো রেকর্ড অর্জন করেছে আমাদের কাজিপাড়া ক্লিনিকটি। স্থানীয়দের দাবি এই ক্লিনিকটি আরও উন্নতমানের করা হলে সুবিধা পাবে হাজার হাজার জনগোষ্ঠী।
তিনি নরমাল ডেলিভারী সম্পন্ন করে সীমান্তের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাইলফলকের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে হয়ে উঠেছেন আস্থার প্রতীক। এ কারণে তিনি জেলা, উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ক্লিনিক এবং শ্রেষ্ঠ সিএইচসিপি'র পুরস্কার লাভ করেছেন। বেগম রোকেয়া দিবসে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জয়িতা পুরস্কারও পেয়েছেন। শিক্ষা ও চাকুরীক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী ক্যাটাগরিতে রংপুর বিভাগীয় পর্যায়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের অদম্য নারী হিসেবে পেয়েছেন সম্মাননা।
সিভিল সার্জন ডা. মো. মিজানুর রহমান জানান, প্রত্যন্ত অঞ্চলে কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবে ১৪২৩ টি পূর্ণ হওয়াটা অত্যন্ত গৌরবের। উত্তরাঞ্চলে এরকম রেকর্ড খুবই কম। এই উপজেলার অন্যান্য ক্লিনিকে গর্ভবতী নারীর অভিভাবকেরা কমিউনিটি ক্লিনিকে এনে নরমালি ডেলিভারি করাচ্ছেন। সিএইচসিপি মেহেরুন নেহার লিলির এই রেকর্ড প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারির একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি দেশবাসীর জন্য গৌরবের বিষয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









