বর্তমান প্রজন্মের অধিকাংশ শিশুই কোনো না কোনোভাবে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংস্পর্শে আসছে। কখনো তারা বাবা-মায়ের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করছে, কখনো আবার তাদের নামে আলাদা অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বয়স ও মানসিক পরিপক্বতার বিবেচনা ছাড়াই অনেক শিশু খুব অল্প বয়সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নানা ধরনের কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেমন শিক্ষামূলক, সৃজনশীল ও ইতিবাচক কনটেন্ট রয়েছে, তেমনি রয়েছে সহিংসতা, অশালীনতা, আত্মক্ষতির প্ররোচনা, সাইবার বুলিং, শরীর ও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে ক্ষতিকর ধারণা এবং বয়স-অনুপযোগী নানা বিষয়। এসব কনটেন্ট শিশুর চিন্তা, আচরণ ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কিন্তু শিশুরা কেন এত সহজে এসব কনটেন্টের নাগালে চলে যাচ্ছে? এর পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেন্দ্রিক কনটেন্ট তৈরির ক্রমবর্ধমান প্রবণতাও একটি কারণ।
দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম থেকে আয়, রিলস বা শর্টস তৈরি এবং মনিটাইজেশন নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। যেমন, মেটার গাইডলাইন: ফেসবুক রিলসে বেশি ভিউ পেতে যা করবেন’ (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ৩ এপ্রিল ২০২৩), ‘ফেসবুক রিলস বানিয়েই যেভাবে টাকা আয় করতে পারেন’ (প্রথম আলো, ২৫ অক্টোবর ২০২৪), ‘মনিটাইজেশন ছাড়াই ইউটিউব শর্টস থেকে আয়’ (ইত্তেফাক, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২২), ‘যেসব শর্তে ইউটিউব শর্টস থেকে টাকা পাবেন’ (নিউজটোয়েন্টিফোর, ১০ জানুয়ারি ২০২৩) এবং ‘ইউটিউবে প্রতি চারজনে একজন নির্মাতা শর্টস থেকে আয় করেন’ (প্রথম আলো, ৩০ মার্চ ২০২৪)।
এ ধরনের প্রতিবেদন তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরিকে অনেকের কাছে সম্ভাবনাময় আয়ের পথ হিসেবেও উপস্থাপন করছে। ফলে অনেকে জেনে বা না জেনে কনটেন্ট তৈরির দিকে ঝুঁকছেন। সমস্যা দেখা দিচ্ছে তখনই, যখন এই প্রবণতায় শিশুদেরও বাণিজ্যিকভাবে যুক্ত করা হচ্ছে।
শিশুদের স্বাভাবিক জীবন, ব্যক্তিগত পরিসর ও মানসিক বিকাশের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়ে তাদের দিয়ে ভিডিও বা অন্যান্য কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে। কখনো তারা নিজেরাই কনটেন্টের বিষয় হয়ে উঠছে, কখনো আবার তাদের আচরণ, পোশাক, কথাবার্তা কিংবা ব্যক্তিগত মুহূর্তকে দর্শক আকর্ষণের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থ উপার্জনের সম্ভাবনা থাকলেও শিশুকে এভাবে ব্যবহার করা তার অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
ইউনিসেফ শিশুদের শুধু ডিজিটাল কনটেন্টের ভোক্তা বা বাণিজ্যিক মুনাফার উপকরণ হিসেবে না দেখে ‘অধিকারধারী’ হিসেবে বিবেচনা ও সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ডিজিটাল পরিবেশে শিশুদের নিরাপত্তা, গোপনীয়তা, মতপ্রকাশ এবং সুস্থ বিকাশ নিশ্চিত করা তাই অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র—সবার দায়িত্ব।
শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বয়সসীমা, অভিভাবকের সম্মতি এবং অন্যান্য সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। ডেনমার্কও কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে। যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশে বয়স যাচাই, সময়সীমা এবং শিশুদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করার বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে শিশুদের সাইবার বুলিং, ক্ষতিকর বা বয়স-অনুপযোগী কনটেন্টের সংস্পর্শ, অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে আত্মক্ষতির প্ররোচনা, খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যা বা শরীর সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে, এমন কনটেন্ট শিশুদের জন্য গুরুতর উদ্বেগের কারণ।
তাহলে শিশু কোনো ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখে ফেললে অভিভাবকদের কী করা উচিত?
প্রথমত, আতঙ্কিত না হয়ে শিশুর সঙ্গে কথা বলতে হবে। তাকে বকাঝকা বা ভয় দেখালে সে ভবিষ্যতে এমন কোনো ঘটনা ঘটলে তা অভিভাবকের কাছে গোপন করতে পারে। বরং কী দেখেছে, কোথায় দেখেছে এবং সেটি দেখে তার কেমন লেগেছে—শান্তভাবে জানতে হবে।
দ্বিতীয়ত, খোলামেলা যোগাযোগের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শিশু যেন জানে, অনলাইনে কোনো অস্বস্তিকর, ভয়ংকর বা বিভ্রান্তিকর কিছু দেখলে সে নির্ভয়ে বাবা-মাকে জানাতে পারবে। অনলাইনে কার সঙ্গে কথা বলছে, কী ধরনের কনটেন্ট দেখছে- এসব বিষয়ে বয়স অনুযায়ী তার সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, ডিজিটাল সীমানা নির্ধারণ করতে হবে। কখন, কোথায় এবং কতক্ষণ মোবাইল বা অন্য ডিভাইস ব্যবহার করা যাবে—সে বিষয়ে পরিবারের নিজস্ব নিয়ম থাকা দরকার। বিশেষ করে খাবারের সময়, পড়াশোনা, ঘুম এবং পারিবারিক সময়কে স্ক্রিনমুক্ত রাখার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
চতুর্থত, প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বয়স উপযোগী প্যারেন্টাল কন্ট্রোল, নিরাপদ সার্চ, প্রাইভেসি সেটিংস এবং কনটেন্ট ফিল্টার ব্যবহার করা যেতে পারে। শিশুকে পূর্ণ নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, পাসওয়ার্ড, ব্যক্তিগত ছবি বা অন্য সংবেদনশীল তথ্য অনলাইনে শেয়ার না করার বিষয়েও সচেতন করতে হবে।
পঞ্চমত, ক্ষতিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো পোস্ট, ভিডিও বা অ্যাকাউন্ট শিশুর জন্য ক্ষতিকর হলে সেটি রিপোর্ট, ব্লক বা ‘নট ইন্টারেস্টেড’ করার পদ্ধতি শিশুকে শেখানো যেতে পারে। সাইবার বুলিং বা সরাসরি হুমকির ঘটনা ঘটলে প্রমাণ হিসেবে প্রয়োজনীয় স্ক্রিনশট সংরক্ষণ করা উচিত।
ষষ্ঠত, বিকল্প আনন্দের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বই পড়া, খেলাধুলা, ছবি আঁকা, গান, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা পরিবারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ বাড়ানো গেলে শিশুর জীবনে স্ক্রিনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সম্ভব।
সবশেষে, শিশুকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করাই সব ক্ষেত্রে একমাত্র সমাধান নয়। বরং বয়স, পরিপক্বতা ও প্রয়োজন অনুযায়ী নিরাপদ ডিজিটাল অভ্যাস গড়ে তোলাই গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য প্রয়োজন অভিভাবকের সচেতনতা, সন্তানের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার।
শিশুর হাতে প্রযুক্তি তুলে দেওয়া সহজ; কিন্তু তাকে সেই প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহার শেখানোই বড় দায়িত্ব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন শিশুর শৈশব কেড়ে না নেয়, বরং তার শেখা, সৃজনশীলতা ও বিকাশের নিরাপদ সহযাত্রী হয়ে ওঠে, সেদিকেই নজর দিতে হবে সবাইকে। বাসস


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









