পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর জন্য ৫০০ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণের ঘোষণা দেন। তবে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের পথে মুর্শিদাবাদ জেলায় তীব্র বাধার মুখে পড়েছে প্রশাসন।
মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর-এর মুর্শিদাবাদ জেলা শাখা এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করে জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠিয়েছে। সংগঠনের সম্পাদক রাহুল চক্রবর্তী চিঠির মাধ্যমে এই প্রতিবেদন জমা দেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার (৩ জুন) ডোমকল ব্লকের ঘোষপাড়া সর্বপল্লী ভুতগাড়ি এলাকায় মাঠ পর্যবেক্ষণ করেন এপিডিআরের প্রতিনিধিরা। প্রায় ১৫ হাজার বিঘা তিন ফসলি জমি নিয়ে গঠিত এই এলাকায় পাঁচটি গ্রামের অন্তত ৬০০ পরিবার কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। এসব গ্রাম হলো—দক্ষিণ ঘোষপাড়া, সর্বপল্লী, ফরাজীপাড়া, মুরাদপুর ও উত্তর ঘোষপাড়া।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জেলা কমিটির জানায়, অধিকাংশই ক্ষুদ্র চাষি পরিবারপ্রতি জমির পরিমাণ এক থেকে দুই বিঘার মধ্যে। পাট, গম, ডাল, রসুন, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে তাদের জীবিকা চলে। নদীভাঙনের কারণে আগেই অনেক জমি হারিয়েছেন তারা, ফলে বর্তমান জমিই তাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।
এপিডিআরের প্রতিবেদন বলছে, ‘বাপ ঠাকুরদার আমল থেকে এখানকার কৃষকেরা এই জমিতে চাষাবাদ করছেন। জলঙ্গী নদীর ব্যাপক ভাঙনে অনেক উর্বর জমি তলিয়ে গিয়েছে। ফলে এই জমির ওপর এলাকার কৃষকদের বেঁচে থাকা নির্ভর করছে। মাঠে যেসব কৃষি জমি আছে, তা সবই সরকারি খাতায় নথিভুক্ত। জমিও যথেষ্টই উর্বর…এই জমির ওপর নির্ভরশীল পাঁচটি গ্রামের প্রায় ৬০০ পরিবার।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই জমি অধিগ্রহণ হলে প্রায় তিন হাজার মানুষ জীবিকা হারাবে। ক্ষতিপূরণের অর্থকে কৃষকেরা অপ্রতুল বলে মনে করছেন। তাদের বক্তব্য, জমি দীর্ঘমেয়াদে জীবিকা দেয়, কিন্তু এককালীন অর্থ দ্রুত ফুরিয়ে যায়। গত ৩১ মে মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী ডোমকল মহকুমার এই অঞ্চলে ‘বিএসএফ লাল পতাকার সীমানা লাগিয়ে অধিগ্রহণ করতে যায় এবং কৃষকেরা এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু করেন। ভুতগাড়ির মাঠসংলগ্ন সড়কে বিপুলসংখ্যক কৃষক অবস্থান নিলে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। জলঙ্গি থানার পুলিশ ও বিএসএফ এক সঙ্গে জমায়েত ছত্রভঙ্গ করতে এলে কৃষকদের সঙ্গে বচসা বেঁধে যায়।
শেষ পর্যন্ত এলাকার পুলিশ প্রশাসন কৃষকদের চাষের জমি দখল না করার মৌখিক আশ্বাস দিলে কৃষকেরা সড়ক ছেড়ে যায়। কৃষকেরা এপিডিআরের প্রতিনিধিদলকে জানিয়েছে, বিএসএফ কৃষকদের চাষের জমি ছেড়ে দিয়ে অন্য জায়গায় নিজেদের শিবির বানালে তাদের আপত্তি নেই। ডোমকল মহাকুমার এই অঞ্চলের জমিতে হিন্দু-মুসলিম এক সঙ্গে চাষ করেন। পাশের গ্রামে হিন্দু এলাকার কৃষকেরাও এই জমি কিছুতেই দেবে না।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাশের হিন্দু গ্রামের অনেকেই এপিডিআরের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা জানিয়েছে, গত সরকারের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে তারা নতুন সরকার এনেছেন। অথচ নতুন সরকার আসার পর সীমান্ত এলাকার চাষিদের জমি বিএসএফ দিয়ে দখলে নেওয়ার চেষ্টা চলছে। তারা এটা কিছুতেই মানবেন না। বিএসএফ, পুলিশ ক্রমশ এলাকার চাষিদের বিরুদ্ধে দাঁড়াচ্ছে। জমি রক্ষার জন্য তারা লড়াই করবেন।
কৃষকেরা এপিডিআরকে আরও বলেন, গত দুই বছরে বিএসএফ দুবার জমির মাপজোখ করে গেছে। কিন্তু সেই সময়ও কৃষকদের প্রতিরোধের কারণে তারা জমি নিতে আসেনি। এখন আবার জমি নেওয়ার তৎপরতা শুরু হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে রাজ্য সরকার বা বিএসএফের তরফে কোনো বিবৃতি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
এপিডিআর চিঠি আকারে মুর্শিদাবাদের জেলা শাসককে যে প্রতিবেদন দিয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে রাজ্য সরকার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ১৫ কিলোমিটারের মধ্যে বিএসএফকে জমি দেওয়ার যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, তারই ফল হিসেবে গ্রামের ভেতরে নথিভুক্ত চাষের জমি অধিগ্রহণের চেষ্টা শুরু হয়েছে।
তবে পশ্চিমবঙ্গের জমি অধিগ্রহণ আইন অনুযায়ী, কৃষকদের অসম্মতিতে চাষের জমি অধিগ্রহণ করার এই চেষ্টা সম্পূর্ণ বেআইনি ও অসাংবিধানিক।
এপিডিআরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জমি নিতে গিয়ে যেভাবে বিএসএফ ও পুলিশ যৌথভাবে প্রতিবাদী কৃষকদের সন্ত্রস্ত করছে, তা চরম অন্যায় ও বেআইনি।
প্রতিবেদনে এপিডিআরের তরফে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশি তকমা’ দেওয়ার ভয় দেখিয়ে এই জমি অধিগ্রহণের চেষ্টা চলছে।
এপিডিআরের প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অংশে বলা হয়েছে, সীমান্ত থেকে ১৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরবর্তী এলাকা কার্যত বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার বিজ্ঞপ্তি জারির সঙ্গে সঙ্গে মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সীমান্তে ‘হোল্ডিং’ বা ‘ডিটেনশন সেন্টার’(আটক কেন্দ্র) নির্মাণের আসল উদ্দেশ্য চাষের জমি নেওয়া। এই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কৃষকেরা যাতে মুখ খুলতে না পারেন, সেই লক্ষ্যেই ভয় দেখাতে “বাংলাদেশি তকমা”দেওয়ার ভয়ংকর জনবিরোধী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে’।
এই পরিস্থিতিতে এপিডিআরের দাবি, কৃষকদের অসম্মতিতে কোনোভাবেই জলঙ্গীর সর্বপল্লী ভূতগাড়ি মাঠের তিন ফসলি জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া যাবে না এবং সাধারণ মানুষকে বাংলাদেশি বলে ঠেলে পাঠানো যাবে না।
এ প্রসঙ্গে এপিডিআরের বক্তব্য, ‘সংবাদমাধ্যম সূত্রে আমরা জানতে পেরেছি, মুর্শিদাবাদ থেকে বাংলাদেশি সন্দেহে বেশ কিছু মানুষকে বিএসএফের মাধ্যমে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে। মানবতাবিরোধী, বেআইনি ও অসাংবিধানিক এই ঠেলে পাঠানো অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এ পর্যন্ত ঠেলে পাঠানো সব মানুষের পরিচয় প্রকাশ করতে হবে। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে মানুষকে হেনস্তা বন্ধ করতে হবে। কেবল আদালতে বাংলাদেশি প্রমাণিত হলেই কাউকে বাংলাদেশ সরকারের মাধ্যমে সে দেশে পাঠানো যাবে।’
একই সঙ্গে এপিডিআরের তরফে দাবি করা হয়েছে, মুর্শিদাবাদে তৈরি সব ‘আটক কেন্দ্র’ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
মানবাধিকার সংগঠনটির চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের আইন অনুযায়ী সন্দেহ হলেই কাউকে দিনের পর দিন আটক রাখা যায় না। হোল্ডিং সেন্টারে বাংলাদেশি সন্দেহে যে সব নাগরিকদের রাখা হয়েছে তাদের সঙ্গে মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমকে দেখা করতে দিতে হবে। আটক কেন্দ্রে রাখা নাগরিকদের সব তথ্য জনসমক্ষে আনতে হবে এবং তাঁদের মুক্তি দিতে হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









