ইউরোপের বাসিন্দারা কয়েকদিনের তীব্র দাবদাহে হাঁসফাঁস করছেন। চলতি বছর পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে এটি তৃতীয় দফার তাপপ্রবাহ। নজিরবিহীন তাপপ্রবাহে একের পর এক দেশে তাপমাত্রার রেকর্ড ভাঙছে। আগামী কয়েকদিনে তাপপ্রবাহ কমার কোনো লক্ষণ নেই বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বায়ুমণ্ডলীয় ও বায়ুপ্রবাহজনিত এমন কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা কয়েক দিন ধরে উষ্ণ বায়ুকে একটি নির্দিষ্ট এলাকায় আটকে রাখছে। ফলে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বাড়ছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এ পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে তুলছে।
তীব্র গরম মোকাবিলায় অভ্যস্ত নয় এবং পর্যাপ্ত প্রস্তুতিও নেই এমন এক মহাদেশে প্রকৃতির এমন আচরণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সের জাতীয় তাপমাত্রা সূচক, যা দেশটির ৩০টি কেন্দ্রের দিন ও রাতের গড় তাপমাত্রার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয় তা মঙ্গলবার ২৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। ১৯৪৭ সালে পরিমাপ শুরু হওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ।
বুধবার (২৪ জুন) ফ্রান্সের আরও চারটি বিভাগকে সর্বোচ্চ তাপ সতর্কতার আওতায় আনা হয়েছে। এএফপির হিসাব অনুযায়ী, এতে প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ মানুষ প্রভাবিত হচ্ছেন। আগে থেকেই ৩১টি বিভাগ কমলা সতর্কতার আওতায় রয়েছে। ফলে দেশটির ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষ চরম তাপপ্রবাহের ঝুঁকিতে পড়েছেন।
বুধবার (২৪ জুন) ব্রিটানি থেকে প্যারিস অঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় ৩৯ থেকে ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
৪৫ বছর বয়সী মার্কিন প্রকৌশলী জন বেলার বলেন, ‘‘তিনি এবং তার স্ত্রী প্যারিসে প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন।’’
জেলেদের ব্যবহৃত টুপি পরে ও হাতে ছোট একটি ফ্যান নিয়ে তিনি এএফপিকে বলেন, ‘‘এ গরমে প্যারিস ভ্রমণ করা ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। আমদের দম বন্ধ হয়ে আসছে। রাস্তায় দম বন্ধ হয়ে আসছে, মেট্রোতে দম বন্ধ হয়ে আসছে, এমনকি ভাড়া বাসাতেও দম বন্ধ হয়ে আসছে। তারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত একটি হোটেল কক্ষে চলে যাবেন।’’
ইতালির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বুধবার মিলান ও রোমসহ ১৬টি শহরে সর্বোচ্চ ‘রেড’ তাপপ্রবাহ সতর্কতা জারি করেছে। আগামী কয়েক দিনে পূর্ব ইউরোপেও তাপপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পোল্যান্ডের আবহাওয়া বিভাগ বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত দেশের পশ্চিমাঞ্চলে উচ্চমাত্রার তাপ সতর্কতা জারি করেছে। তারা জানায়, তাপমাত্রা ১৯২১ সালে স্থাপিত ৪০ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ক্রোয়েশিয়ার জনপ্রিয় অ্যাড্রিয়াটিক উপকূলেও শুক্রবার ও শনিবারের জন্য উচ্চমাত্রার তাপের রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে।
হাঙ্গেরি ইতোমধ্যে দ্বিতীয় স্তরের তাপ সতর্কতার আওতায় রয়েছে। তাপমাত্রা আরও বাড়তে থাকায় শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটি।
এ সপ্তাহে প্রকাশিত একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বলা হয়েছে, বর্তমান তাপপ্রবাহ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উল্লেখযোগ্যভাবে তীব্র হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন না হলে, বর্তমান তাপমাত্রা ২ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম হতে পারত।
তবে বুধবার থেকে পশ্চিম দিক হতে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে।
স্পেনের জাতীয় আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দেশের বেশিরভাগ এলাকায় তাপমাত্রা কমতে শুরু করবে। বুধবার বিকেল নাগাদ শুধু উত্তরাঞ্চলের বাস্ক অঞ্চলের কিছু এলাকা রেড সতর্কতায় থাকবে। বৃহস্পতিবার স্পেনের কোনো অঞ্চলই রেড বা অরেঞ্জ সতর্কতার আওতায় থাকবে না।
তবে পশ্চিম ইউরোপের বাকি অংশে দ্রুত স্বস্তির কোনো লক্ষণ নেই। বুধবার থেকে অন্তত শুক্রবার পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসের মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল চরম গরমের জন্য ‘কোড অরেঞ্জ’ সতর্কতা জারি থাকবে।
আমস্টারডামের যেসব বাসিন্দার সিটি পাস রয়েছে, তারা শহরের ছয়টি উন্মুক্ত সুইমিং পুলে বিনা মূল্যে সাঁতার কাটতে পারবেন। অন্যদিকে প্রত্যাশিত তাপপ্রবাহের কারণে বুধবার থেকে কয়েকটি রুটে ট্রেন চলাচল কমানোর ঘোষণা দিয়েছে দেশটির জাতীয় রেল কোম্পানি এনএস।
ব্রিটেনে ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব হেড টিচার্সের সহকারী মহাসচিব জেমস বোয়েন এএফপিকে বলেন, ‘‘চরম গরমের কারণে এ সপ্তাহে যুক্তরাজ্যের প্রায় প্রতিটি স্কুলকেই কোনো না কোনো ধরণের সমন্বয় করতে হবে।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘এ মাত্রার তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যের শিক্ষা অবকাঠামো যথেষ্ট প্রস্তুত নয় বললে ভুল হবে না। ফ্রান্সের সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীসমৃদ্ধ কয়েকটি স্থাপনা যেমন ল্যুভর জাদুঘর ও আইফেল টাওয়ার দর্শনার্থীদের জন্য সময় সীমিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’’
একইভাবে বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের অন্যতম পরিচিত স্থাপনা অ্যাটোমিয়ামের কর্তৃপক্ষ জানায়, বুধবার থেকে শুক্রবার পর্যন্ত তারা স্বাভাবিক সময়ের আগেই দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে।
সূত্র: এএফপি


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









