মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বহ্নিশিখা আরও ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার জবাবে এবার প্রতিবেশী বাহরাইন ও কুয়েতে পাল্টা আঘাত হেনেছে তেহরান। মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ইরানের সামরিক বাহিনী কুয়েত ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন এবং কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুগুলোতে এই পাল্টা হামলা চালায়। পাল্টাপাল্টি এই আক্রমণের ফলে পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনাকে উদ্ধৃত করে আল জাজিরা জানিয়েছে, ইরানশাহর বিমানবন্দরে হামলায় একজন দমকলকর্মী নিহত হয়েছেন।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে মার্কিন বাহিনী ইরানে নতুন করে হামলা শুরু করেছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতায় ইরান যেন বাধা দিতে না পারে, সেজন্য তাদের সামরিক শক্তি কমিয়ে আনাই এই হামলার লক্ষ্য।
সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানায়, তারা ইরানের উপকূলের প্রায় ৯০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। তারা ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র রাখার গুদাম এবং নৌবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংস করার দাবি করেছে।
ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি এর আগে জানায়, বন্দর আব্বাসে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শত্রুপক্ষের হামলা প্রতিহত করছে। এরপরই সেন্টকমের পক্ষ থেকে হামলার কথা জানানো হয়।
পরে ইরানি কর্মকর্তারা ফারস নিউজ এজেন্সিকে জানান, চাবাহারে হামলায় একটি মেরিটাইম কন্ট্রোল টাওয়ার ও একটি ডিপোতে হামলা হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরও জানায়, আক কালায় একটি রেল সেতুতেও হামলা হয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজায়ি এই হামলার কড়া জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি এক্সে লেখেন, ইরানিদের কঠিন আঘাতের জন্য প্রস্তুত থাকো।
মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা পর বাহরাইনে বিমান হামলার সাইরেন বেজে ওঠে। একইসঙ্গে কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রকেট ও ড্রোন হামলা ঠেকানোর কথা জানায়।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) কুয়েত ও বাহরাইনের মার্কিন ঘাঁটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে। তারা বলেছে, আমেরিকার সাম্প্রতিক হামলার জবাব দিতেই পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি জানায়, মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আইআরজিসি-র নৌ ও বিমানবাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন ব্যবহার করে এই যৌথ অভিযান চালায়।
আইআরজিসি জানিয়েছে, এই অভিযানে কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান ও আলি আল সালেম এবং বাহরাইনের জাফায়ের ও শেখ ঈসা—এই মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র গত মঙ্গলবারও ইরানে হামলা চালিয়েছিল। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা ওই হামলা চালায়। তারা ৮০টি স্থানে হামলার কথা জানায়। ইরানের সেনাবাহিনী জানায়, মঙ্গলবারের ওই হামলায় তাদের বিমান ও নৌবাহিনীর ৮ জন সদস্য নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরান বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালায়।
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান গত মাসে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল। এর মাধ্যমে আগের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল এবং ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছিল। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সমুদ্রপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জটিল বিষয়গুলো সমাধানের জন্য ৬০ দিন সময় রাখা হয়েছিল।
মূল ঝামেলা শুরু হয় চুক্তির ৫ নম্বর ধারা নিয়ে। সেখানে বলা হয়েছিল, পারস্য উপসাগর দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান সবরকম নিরাপত্তা দেবে এবং আগামী ৬০ দিন পর্যন্ত কোনো চার্জ বা ফি নেবে না। এখন দুই পক্ষই সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে।
ইরান মনে করে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ কীভাবে যাতায়াত করবে তা ঠিক করার একমাত্র অধিকার তাদের। এই দাবি তুলে তারা তাদের অনুমতি ছাড়া চলাচল করা বিভিন্ন জাহাজে হামলা চালাচ্ছে।
পেন্টাগনের সাবেক এক কর্মকর্তা জানান, সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, কথা ছিল আমেরিকা অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে আর ইরান জাহাজে হামলা বন্ধ করবে। আমেরিকা তাদের কথা রাখলেও ইরান তা করছে না।
হামলার পর ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাব বলেছেন, আমেরিকার হুমকিতে কিছু হবে না। সমুদ্রপথ ইরানের নিয়মেই চলবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









