গাজার শাসনভার তদারকিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গঠিত তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’ বা শান্তি পর্ষদের মূল লক্ষ্য ছিল হামাসসহ অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ। তবে প্রাথমিক আলোচনার পরই সেই সম্ভাবনা ফিকে হয়ে আসছে; নিরস্ত্রীকরণ ইস্যুতে এখন ইসরায়েল ও প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলোর পাল্টাপাল্টি শর্তের মুখে পড়ে থমকে গেছে সমঝোতার প্রক্রিয়া।
ইসরায়েল সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের ‘প্রকৃত’ অস্ত্রসমর্পণ ছাড়া গাজা থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করা হবে না।
অন্যদিকে হামাস জানিয়েছে, ইসরায়েলকে আগে সব ধরনের হামলা ও আগ্রাসন বন্ধ করে গাজা থেকে সেনা সরাতে হবে; তবেই কেবল ভারী অস্ত্র হস্তান্তর করা হবে।
বিবিসি লিখেছে, শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভা বৈঠকে ট্রাম্প জানান, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত নতুন প্রস্তাবে ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের একটি ‘বোঝাপড়া’ হয়েছে এবং “ইসরায়েল এতে অত্যন্ত সন্তুষ্ট”। ট্রাম্পের ভাষ্য, এটি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি বড় পদক্ষেপ।
তবে ট্রাম্পের এই দাবির পরপরই ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রী ইতামার বেন গভির খসড়া প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
সমঝোতা অনুযায়ী আগে কে পদক্ষেপ নেবে, হামাস কি আগে অস্ত্র জমা দেবে নাকি ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করবে, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প সরাসরি কিছু না বলে গাজাকে ‘অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতি’ বলে বর্ণনা করেন।
ট্রাম্প জানান, সংগৃহীত অস্ত্র ‘বোর্ড অব পিস’-এর কাছে হস্তান্তর করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় গত সেপ্টেম্বরে ঘোষিত ২০ দফা শান্তিপরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন প্রস্তাব নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরাসরি মন্তব্য না করলেও দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, হামাসের প্রকৃত অস্ত্রসমর্পণ ছাড়া ‘ইয়েলো লাইন’ থেকে ইসরায়েলি বাহিনী পিছু হটবে না।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র-মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তির অধীনে গাজার যে নির্দিষ্ট সীমানা পর্যন্ত ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করতে সম্মত হয়েছিল, তা ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত। চুক্তি অনুযায়ী ইয়েলো লাইনের পেছনের এলাকা, যা গাজার মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৫৩ শতাংশ—ইসরায়েলের সাময়িক নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা ছিল।
তবে সম্প্রতি নেতানিয়াহু বলেন, বর্তমানে আইডিএফ গাজার ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং মে মাসে তিনি প্রকাশ্যেই এই নিয়ন্ত্রণ ৭০ শতাংশে উন্নীত করার নির্দেশনা দেন।
এক বিবৃতিতে হামাস বলেছে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের নিশ্চয়তার পাশাপাশি ইসরায়েলি হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়াই আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পূর্বশর্ত।
গাজার ২০ লাখের বেশি মানুষের চরম মানবিক বিপর্যয় বিবেচনা করে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতেই তারা এই আলোচনায় সাড়া দিয়েছে।
এদিকে ‘বোর্ড অব পিস’ পর্যায়ক্রমে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা বাহিনী মোতায়েনের একটি রূপরেখা প্রকাশ করেছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস একে ‘আশাব্যঞ্জক খবর’ বললেও জাতিসংঘে ইসরায়েলের প্রতিনিধি ড্যানি ড্যানন বলেছেন, “হামাসের মুখের কথা নয়, তারা বাস্তবে কী করছে তা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড চুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি গাজায় অবিলম্বে ত্রাণ সরবরাহের বাধা তুলে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এ পর্যন্ত গাজায় ৭৩ হাজার ২৯০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









