যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক পদক্ষেপের জবাবে নতুন করে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ, সাতটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং প্রথমবারের মতো বৈদেশিক বাণিজ্য–সংক্রান্ত জাতীয় নিরাপত্তা তদন্ত শুরু করেছে চীন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এতে স্পষ্ট হয়েছে যে বাণিজ্যযুদ্ধে পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের আইনি ও নীতিগত কাঠামো আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বুধবার এসব পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ড্রোন ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির রপ্তানিতে নতুন নিয়ন্ত্রণ, সাতটি মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং বৈদেশিক বাণিজ্য আইনের আওতায় প্রথম জাতীয় নিরাপত্তা তদন্ত।
চীনের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কয়েকটি পদক্ষেপের জবাব হিসেবেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জোরপূর্বক শ্রম আইনের আওতায় ৪৩টি চীনা প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশনের (এফসিসি) নতুন চীনা ড্রোন, রোবট ও বিদ্যুৎ ইনভার্টার আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা।
এক বিবৃতিতে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের পদক্ষেপ ‘সংযত’। চীন দুই দেশের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্রও একইভাবে এগিয়ে আসবে বলে তারা আশা করে।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ওয়েন্ডি কাটলার বলেন, চীনের সর্বশেষ পদক্ষেপগুলো বিবেচনা করলে দেখা যায়, দেশটির পাল্টা ব্যবস্থার পরিধি ও সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। তার ভাষায়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় এবার চীন প্রতিক্রিয়া জানাতে অনেক বেশি প্রস্তুত।
নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনাভিত্তিক কমপ্লায়েন্স টেস্টিং এলএলসির প্রধান মাইকেল শ্যাফার বলেন, চীনের সিদ্ধান্ত তার কাছে কিছুটা অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে তিনি দাবি করেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের কাজ যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
এফসিসি অনুমোদিত এই প্রতিষ্ঠানটি ইলেকট্রনিক পণ্যের পরীক্ষা ও সনদ দিয়ে থাকে। চীনের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি এমন নীতিমালা বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে, যা দেশটির নিরাপত্তা ও উন্নয়ন স্বার্থের ক্ষতি করে।
এপ্রিল মাসে এফসিসি চীনের পরীক্ষাগারগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইলেকট্রনিক পণ্য পরীক্ষা করা থেকে বিরত রাখার একটি প্রস্তাব দেয়। এফসিসির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবহৃত প্রায় ৭৫ শতাংশ ইলেকট্রনিক পণ্য চীনে পরীক্ষা করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২০ সালের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার জবাব দিতে চীন ধারাবাহিকভাবে নতুন আইন ও নীতিমালা চালু করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইন, অবিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান তালিকা, বিদেশি নিষেধাজ্ঞাবিরোধী আইন এবং বৈদেশিক বাণিজ্য আইন।
ইনস্টিটিউট ফর চায়না–আমেরিকা স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক সৌরভ গুপ্ত বলেন, এসব আইন প্রমাণ করে, চীনের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কাঠামো এখন পরিপক্ব ও কার্যকর।
২০২৫ সালের এপ্রিলে চীন সাত ধরনের বিরল খনিজের (রেয়ার আর্থ) রপ্তানির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। এতে বিশ্বব্যাপী সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে এবং বিভিন্ন কারখানায় সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরে গত বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে হওয়া সমঝোতার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়।
যুক্তরাষ্ট্র–চীন বিজনেস কাউন্সিলের সহসভাপতি কাইল সুলিভান বলেন, চীন দেখিয়ে দিচ্ছে যে তাদের হাতে এখন আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক হাতিয়ার রয়েছে। তবে তারা একই সঙ্গে উত্তেজনা কমানোর সুযোগও খোলা রেখেছে। তাঁর মতে, এবারের পদক্ষেপগুলো আগের তুলনায় বেশি পরিকল্পিত ও সমন্বিত।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা চীনের নতুন পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেন, এতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি বলেন, পাল্টাপাল্টি নিষেধাজ্ঞা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের শ্রমিক ও উৎপাদনকারীদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া অব্যাহত রাখবে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও বলেছে, চীনের এসব পদক্ষেপে মার্কিন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কর্মীরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্ক, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও নিষেধাজ্ঞা বাড়লেও সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে। গত সপ্তাহে চীনের উপপ্রধানমন্ত্রী হে লিফেং ভিডিও বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ও বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ারের সঙ্গে সফর–সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন।
ওয়েন্ডি কাটলারের মতে, চীনের সর্বশেষ পদক্ষেপের জবাবে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো তাৎক্ষণিকভাবে নতুন কোনো বড় ব্যবস্থা নেবে না। তবে তিনি বলেন, দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান স্থিতিশীলতা নিশ্চিত ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
কাইল সুলিভানের ভাষায়, চীনের হাতে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু তারা আপাতত তা ব্যবহার করেনি। এতে বোঝা যায়, বেইজিং এখনো উত্তেজনা আরও বাড়ানোর পথ বেছে নিতে চায় না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









