আসিয়ান আবারও অং সান সু চির নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানিয়েছে। কিন্তু সেই আহ্বান সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সু চির ‘পূর্ণ ও নিঃশর্ত মুক্তি’ কেবল দেশের আইন অনুযায়ীই দেওয়া হবে।
২০২১ সালে সু চির নেতৃত্বাধীন বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং। এরপর থেকেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে ব্যাপক বিরোধিতা ও সংঘাত চলছে। ক্ষমতা দখলের পর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এবং আসিয়ানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক ফেরানোর চেষ্টা করে আসছে মিন অং হ্লাইংয়ের সরকার।
সংকট সমাধানে ২০২১ সালের এপ্রিলে আসিয়ান একটি পাঁচ দফা শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল সহিংসতা বন্ধ করা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে সংলাপ শুরু করা। এই প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করার জন্য মিয়ানমার বিষয়ে একজন বিশেষ দূতও নিয়োগ করে আসিয়ান।
তবে শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মিয়ানমার কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় মিন অং হ্লাইংকে আসিয়ানের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে।
এর মধ্যেই গত সপ্তাহে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটির একজন প্রতিনিধি সু চির সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান। পাঁচ বছর আগে আটক হওয়ার পর এটিই ছিল কোনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার প্রতিনিধির সঙ্গে সু চির প্রথম জানা সাক্ষাৎ।
৮১ বছর বয়সী সু চি বর্তমানে রাজধানী নেপিডোর একটি অজ্ঞাত স্থানে গৃহবন্দি অবস্থায় সাজা ভোগ করছেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন তাঁর সমর্থক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো।
আসিয়ানের বর্তমান চেয়ারম্যান ফিলিপাইনস রেডক্রসের এই সাক্ষাৎকে স্বাগত জানিয়েছে। দেশটি এটিকে সংলাপ ও সমঝোতার পথে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক বন্দিদের কাছে আরও বেশি মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ এবং সু চির ‘পূর্ণ ও নিঃশর্ত মুক্তি’র দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে ফিলিপাইনস।
কিন্তু মিয়ানমার সরকার সেই আহ্বানে সাড়া দেওয়ার বদলে তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
শনিবার রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, মানবিক বিবেচনায় সু চির সাজা কমানো হয়েছে। তবে তাকে সম্পূর্ণ ও নিঃশর্তভাবে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি দেশের আইন অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
আসিয়ানের বিশেষ দূতের সঙ্গেও মিয়ানমারের অবস্থান কিছুটা বদলেছে। বর্তমান বিশেষ দূত ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারিয়া থেরেসা লাজারোর সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে মিয়ানমার। তবে ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি সিঙ্গাপুর আসিয়ানের চেয়ারম্যান হওয়ার পর একই প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন তারা দেখছে না।
মিয়ানমার সরকার দাবি করেছে, বহুদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ‘প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিফলন’ ঘটেছে এবং নতুন সরকার এখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে।
তবে এই নির্বাচন নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে। গত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের সমালোচকেরা এটিকে সাজানো নির্বাচন বলে অভিহিত করেছেন। তাদের অভিযোগ, বেসামরিক শাসন ফেরানোর নামে আসলে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা আরও শক্ত করার জন্যই এই নির্বাচন আয়োজন করা হয়েছে।
ক্ষমতা গ্রহণের তিন মাসেরও বেশি সময় পর এক ভাষণে মিন অং হ্লাইং আসিয়ানের শান্তি পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তার অভিযোগ, আসিয়ানের কয়েকটি সদস্য দেশ মিয়ানমারের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে। তাই দেশটি পরিস্থিতি অনুযায়ী আলাদাভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে।
সু চির মুক্তি, রাজনৈতিক বন্দিদের ভবিষ্যৎ এবং চলমান সংঘাত—সব মিলিয়ে মিয়ানমারের সংকটের সমাধান এখনো অনেক দূরে। আসিয়ান সংলাপ ও রাজনৈতিক সমঝোতার পথ খুঁজছে, কিন্তু সামরিক-সমর্থিত সরকারের অবস্থান বলছে, তারা নিজেদের শর্তের বাইরে যেতে এখনো প্রস্তুত নয়।
ফলে মিয়ানমারে শান্তি ফেরানোর আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা যেমন কঠিন হয়ে উঠছে, তেমনি সু চির মুক্তির দাবিও আপাতত অনিশ্চিতই রয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউকে


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









