অস্ট্রেলিয়ার আকাশটা বাংলাদেশের জন্য সব সময়ই একটু কঠিন। ২৩ বছর পর সেই আকাশের নিচে আবার টেস্ট খেলতে নামছে বাংলাদেশ। সামনে অস্ট্রেলিয়া, কন্ডিশন কঠিন, প্রস্তুতি আশাব্যঞ্জক নয়। এর মধ্যেই দলের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গাটিও যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—নাজমুল হোসেন শান্ত।
শুধু ব্যাট হাতে নয়, অধিনায়ক হিসেবেও শান্তকে এখন অনেক কিছু সামলাতে হবে। কারণ অস্ট্রেলিয়া সফরের শুরুতেই বাংলাদেশ পেয়েছে ধাক্কা। একমাত্র প্রস্তুতি ম্যাচে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের কাছে ইনিংস ও ৩৮ রানে হেরেছে তারা। দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৪ রানে অলআউট হওয়া সেই ধাক্কা নিশ্চয়ই অধিনায়ক শান্তর ঘুম কেড়ে নেওয়ার মতো।
তবে ক্রিকেটে এমন রাতের পরই আসে ঘুরে দাঁড়ানোর সকাল।
প্রস্তুতি ম্যাচে শান্তর নিজের ব্যাটও কথা বলেনি—করেছেন ৩৭ ও শূন্য। কিন্তু গত দেড় বছরে টেস্টে বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ব্যাটারদের একজন তিনি। চার নম্বরে তাঁর ব্যাটিংয়ে আছে আক্রমণাত্মক মানসিকতা, আবার দলের প্রয়োজনে সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সেই ভারসাম্যই হবে বড় পরীক্ষা।
বাংলাদেশের ওপেনিং নিয়ে অনিশ্চয়তা নতুন নয়। গত তিন বছরে নিয়মিতই বদলেছে ওপেনিং জুটি। ফলে অনেক সময় চার নম্বরে নামার আগেই নতুন বল সামলানোর দায়িত্ব এসে পড়ে শান্তর ওপর। অস্ট্রেলিয়াতেও সেটি হতে পারে। তাই তাঁর ব্যাটিং শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়, দলের ইনিংসের ভিত্তি গড়ার প্রশ্নও।
মাঝের সারিতে অবশ্য অভিজ্ঞতা আছে। মুশফিকুর রহিমের সঙ্গে শান্তর বোঝাপড়া ও বড় জুটি বাংলাদেশকে বহুবার পথ দেখিয়েছে। লিটন দাসের ফেরাও ব্যাটিংয়ে বাড়াবে স্বস্তি।
তবু এই সফরে শান্তর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা অধিনায়ক হিসেবে।
সম্প্রতি তিনি হয়েছেন বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল টেস্ট অধিনায়ক। ১৯ টেস্টে তার নেতৃত্বে আট জয়। মুশফিকুর রহিমের ৩৪ টেস্টে সাত জয়ের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন তিনি। সংখ্যার বাইরে শান্তর নেতৃত্বের আলাদা একটি পরিচয়ও তৈরি হয়েছে—সাহস।
পাকিস্তানের বিপক্ষে অল্প লিড নিয়েও ইনিংস ঘোষণা করেছিলেন শান্ত। ঝুঁকি ছিল, কিন্তু সেই ঝুঁকিই শেষ পর্যন্ত এনে দিয়েছিল জয়। পেসারদের আক্রমণাত্মক ব্যবহার, ফিল্ডিংয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত—সব মিলিয়ে বোঝা গেছে, শান্ত শুধু নিরাপদ পথের অধিনায়ক নন।
মাঠের বাইরে আবার তিনি অন্য মানুষ। শান্ত, মনোযোগী, সতীর্থদের নিয়ে ভাবেন। সাবেক অধিনায়ক খালেদ মাহমুদের ভাষায়, মাঠের বাইরে তিনি শান্ত, আর মাঠে সম্পূর্ণ উল্টো—আক্রমণাত্মক ও জিততে মরিয়া।
এই মানসিকতাটাই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
কারণ অস্ট্রেলিয়ায় নেই নাহিদ রানা। শরিফুল ইসলামও চোটের কারণে অনিশ্চিত। প্রস্তুতি ম্যাচের ৫৪ রানের লজ্জাও দলের আত্মবিশ্বাসে আঘাত করেছে। এমন অবস্থায় অধিনায়ককে শুধু দল সাজালেই হবে না, দলকে বিশ্বাসও করাতে হবে—একটি খারাপ দিন মানেই খারাপ সফর নয়।

শান্তর নিজের জন্যও বার্তাটি পরিষ্কার। অধিনায়কত্ব যত ভালোই হোক, রান করতে হবে। ব্যাট হাতে তাঁকেই সামনে দাঁড়াতে হবে, আর মাঠে সতীর্থদের কাঁধে হাত রেখে বলতে হবে—‘আমরা পারি।’
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের সামনে কঠিন পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় শান্ত একা নন, তাঁর পাশে থাকবে পুরো দল। কিন্তু পথ দেখানোর আলোটা জ্বালাতে হবে তাঁকেই।
ব্যাট হাতে রান, মাঠে সাহস, আর মাঠের বাইরে সতীর্থদের আস্থা—এই তিনটিই যদি একসঙ্গে মেলে, অস্ট্রেলিয়ার কঠিন আকাশের নিচেও বাংলাদেশের গল্পটা অন্য রকম হতে পারে।
সেই গল্পের কেন্দ্রেই থাকবেন শান্ত।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









