মধ্যপ্রাচ্য যখন একের পর এক সংঘাত, যুদ্ধ আর অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন নতুন এক প্রতিরক্ষা সমীকরণের ইঙ্গিত দিল তুরস্ক। দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি সই হওয়া যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ভবিষ্যতে মিসরও যোগ দিতে পারে। তার ভাষায়, এই চুক্তি আরো দেশের জন্য উন্মুক্ত এবং মিসরের অংশগ্রহণও সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর একটি।
আল-জাজিরার আরবি চ্যানেলের বিশেষ অনুষ্ঠান ‘আল মুকাবালা’তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটি রোববার সন্ধ্যায় প্রচার হওয়ার কথা।
‘একজন আক্রান্ত হলে সবাই আক্রান্ত’
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে শুক্রবার পবিত্র নগরী মক্কায় এই প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। চুক্তিটি ‘মক্কা চুক্তি’ নামেও পরিচিত। এতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটি দেশ বাইরের কোনো পক্ষের সশস্ত্র হামলার শিকার হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এর ফলে তিন দেশ একসঙ্গে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিতে পারবে। এই বিধানকে অনেক বিশ্লেষক ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তবে পাকিস্তানের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এটিকে ন্যাটোর সমতুল্য কোনো জোট বা নির্দিষ্ট কোনো দেশের বিরুদ্ধে গঠিত ব্যবস্থা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
এরদোয়ান বলেন, চুক্তিটি বিশ্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিয়েছে। ভবিষ্যতে এতে আরো দেশ যুক্ত হতে পারে এবং মিসরের যোগ দেওয়া সেই সম্ভাবনার মধ্যে রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে চায় তুরস্ক
সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা, সিরিয়া, গাজা ও লেবাননের যুদ্ধসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে তিনি বলেন, এটি আবার খুলে দেওয়া তুরস্কের অন্যতম অগ্রাধিকার। তার মতে, প্রণালিটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে কারও লাভ হবে না। এই সংকট নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার জন্য কাতারের ভূমিকাকেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন।

সিরিয়া, গাজা ও লেবানন নিয়ে তুরস্কের অবস্থান
এরদোয়ান বলেন, আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে তুরস্ক তার প্রতিবেশীদের একা ছেড়ে যাবে না। বিশেষ করে সিরিয়া, গাজা ও লেবাননের পরিস্থিতির দিকে তুরস্ক নজর রাখছে।
সিরিয়ার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে তুরস্ক তার সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে কাজ করবে বলে জানান তিনি। সিরিয়া সফরের পরিকল্পনার কথাও বলেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট।
সিরিয়ার কুর্দিদের প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, শান্তি ও স্থিতিশীলতায় তাদেরও অংশ থাকবে। একই সঙ্গে পুরো অঞ্চলের কুর্দি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তুরস্ক সম্পর্ক আরো জোরদার করবে এবং তাদের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে বলেও জানান তিনি।
গাজা প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, তুরস্ক গাজাকে একা ছেড়ে যেতে পারে না। প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। তার দাবি, হামাস নিজেদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো আন্তরিকভাবে পালন করছে, অন্যদিকে ইসরায়েল এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।
লেবাননে ইসরায়েলের হামলা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন এরদোয়ান। তিনি বলেন, লেবাননের যুদ্ধ বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তার মতে, সংঘাত বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
সুদানের পাশে থাকবে তুরস্ক
সুদানের ক্ষেত্রেও তুরস্ক তার সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে জানান এরদোয়ান। দেশটির সার্বভৌম পরিষদের প্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
লিবিয়া প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, দেশটির সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক স্থিতিশীল রয়েছে এবং তুরস্ক লিবিয়াকে ছেড়ে যাবে না।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে হতাশা
তুরস্কের দীর্ঘদিনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়েও কথা বলেন এরদোয়ান। তার মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন তুরস্ককে সদস্য হিসেবে গ্রহণ করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না।
তবে এখন ইইউর সদস্য হওয়া আর তুরস্কের অগ্রাধিকার নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। এরদোয়ান বলেন, শেষ পর্যন্ত তুরস্ককে দূরে রাখার কারণে ইউরোপই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এফ-৩৫ নিয়ে ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় এরদোয়ান
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান নিয়েও আশাবাদী এরদোয়ান। তিনি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এখন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছেন তিনি।
রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার পর ২০১৯ সালে তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা ছিল, এস-৪০০ ব্যবস্থার কারণে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের গোপন প্রযুক্তি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে এস-৪০০ কেনার কারণে তুরস্কের ওপর মার্কিন আইন অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞাও দেওয়া হয়।
তবে গত মাসে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের সময় এরদোয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, তার প্রশাসন তুরস্কের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে। একই সঙ্গে তুরস্ককে আবার এফ-৩৫ কর্মসূচিতে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানান তিনি।
তবে পথটি এখনো পুরোপুরি সহজ নয়। মার্কিন কংগ্রেসে এ নিয়ে বিরোধিতা রয়েছে। ২০২০ সালের একটি আইনে বলা হয়েছে, তুরস্কের কাছে এস-৪০০ ব্যবস্থা থাকা পর্যন্ত দেশটিকে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেওয়া যাবে না।
ফলে তুরস্কের সামনে একদিকে যেমন নতুন প্রতিরক্ষা জোটের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এফ-৩৫ নিয়ে পুরোনো টানাপোড়েনও পুরোপুরি কাটেনি। মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত বদলে যাওয়া রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতায় আঙ্কারা এখন কোন পথে এগোয়, সেটিই দেখার বিষয়।
সূত্র: আল জাজিরা


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









