বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক ‘প্রথম’ এসেছে। প্রথম টেস্ট জয়, প্রথম বিদেশের মাটিতে সিরিজ জয়, বড় দলের বিপক্ষে অবিশ্বাস্য সব সাফল্য। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো—সেই তালিকার পাশে বোধ হয় অন্য কোনো জয়কে দাঁড় করানো কঠিন। নাজমুল হোসেন শান্ত অন্তত সে তুলনায় কোনো দ্বিধাই রাখলেন না। তার চোখে ডারউইনের জয়টি বাংলাদেশের ‘যেকোনো সংস্করণে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জয়।’
“এটা বাংলাদেশের যেকোনো সংস্করণে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জয়,’’ ম্যাচ শেষে বললেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। ‘‘সামনে আমরা বিশেষ কিছু করব। আমি নিজে এবং ছেলেরা যেভাবে খেলেছে, তাতে খুব খুশি ও গর্বিত। আমরা অনেক পরিশ্রম করেছি, জিততে পেরে খুব ভালো লাগছে।’’
অস্ট্রেলিয়া যে শুধু অস্ট্রেলিয়া—তা নয়। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকার শীর্ষ দল, টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের এক নম্বর দল, আর নিজেদের মাঠে পূর্ণশক্তির দল। সেই দলকে বাংলাদেশ হারিয়েছে ৯ উইকেটে। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে এসে তৃতীয় ম্যাচেই এমন জয়। দুই ম্যাচের সিরিজে ১-০ এগিয়ে গিয়ে এখন সিরিজ জয়েরও হাতছানি।
তবে শান্তর কাছে এই জয়ের সবচেয়ে বড় বার্তা সম্ভবত অন্য জায়গায়—বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ে।
যে বদলকে সবচেয়ে বড় বলছেন শান্ত
বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে পেসারদের নিয়ে কত আক্ষেপই না ছিল। বিদেশের মাটিতে গেলেই প্রশ্ন উঠত, স্পিনের ওপর কতটা ভরসা করা যাবে? পেসাররা টেস্ট খেলতে কতটা আগ্রহী? পাঁচ-ছয় বছর আগেও উত্তরগুলো খুব আশাব্যঞ্জক ছিল না।
ডারউইনে সেই গল্পটা বদলে গেল।
প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ১০ উইকেটই নিয়েছেন বাংলাদেশের পেসাররা। হাসান মাহমুদ একাই নিয়েছেন ছয়টি। পরে দ্বিতীয় ইনিংসে মেহেদী হাসান মিরাজের পাঁচ উইকেট অস্ট্রেলিয়াকে থামিয়ে দিয়েছে ২৮৪-তে। বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান।
‘‘বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো পেস বোলারদের উত্থান,’’ শান্ত বললেন।
এর পেছনের কারণও ব্যাখ্যা করেছেন অধিনায়ক। পাঁচ-ছয় বছর আগে বাংলাদেশের পেসাররা টেস্ট খেলতে চাইতেন না, কারণ টেস্ট ক্রিকেটই খেলা হতো কম। গত দুই-তিন বছরে নিয়মিত টেস্ট খেলার ফলে মানসিকতাতেও বদল এসেছে।
এখন তারা টেস্ট খেলতে চান। পারফর্ম করতে চান। শুধু ভালো নয়, বিশ্বমানের হতে চান।
শান্তর ভাষায়, ‘মানসিকতার এই পরিবর্তনটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’
আর এই বদলের পেছনে সিনিয়রদের অবদানও ভুলছেন না তিনি। মুশফিকুর রহিম ও মুমিনুল হকের মতো সিনিয়র ক্রিকেটাররা তরুণদের টেস্ট ক্রিকেট খেলতে উৎসাহ দিয়েছেন। ডারউইনে সেই উৎসাহের ফলটা যেন স্কোরবোর্ডেই লেখা হয়ে গেল।
তানজিদের ব্যাটে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত
বাংলাদেশের জয়টা অবশ্য শুধু পেসারদের গল্প নয়। প্রথম ইনিংসে ৪২৬—অস্ট্রেলিয়ার ১৯৮-এর জবাবে ২২৮ রানের লিড—ম্যাচের ভিতটা তৈরি করে দিয়েছিল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরাই।
সেই ভিতের ওপর সবচেয়ে বড় ইটটি বসিয়েছেন তানজিদ হাসান। ক্যারিয়ারের মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই সেঞ্চুরি। ১০১ রান।
সাদা বলের ক্রিকেটে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের জন্য পরিচিত তানজিদ এবার দেখালেন, টেস্ট ক্রিকেটে শুধু হাত চালালেই হয় না; মাথাটাও ঠান্ডা রাখতে হয়।
‘‘ও রোমাঞ্চকর একজন ক্রিকেটার,’’ তানজিদকে নিয়ে শান্তর মূল্যায়ন। ‘‘সাদা বলের ক্রিকেটে ও সব সময় আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলে। কিন্তু এই টেস্টে ও নিজের চরিত্র দেখিয়েছে। খুব শান্ত ছিল, বলের মেরিট অনুযায়ী খেলেছে।’’
টপ অর্ডারের একজন ব্যাটসম্যানের কাছে অধিনায়ক যে জিনিসটা চান, তানজিদ সেটিই করেছেন—দলের হয়ে প্রভাব ফেলেছেন।
দ্বিতীয় টেস্টের আগে বাংলাদেশের জন্য এটাই হয়তো সবচেয়ে বড় আশাবাদের জায়গা। একটি জয় এসেছে, কিন্তু সেই জয়ের মধ্যে ভবিষ্যতের আরও কয়েকটি সম্ভাবনাও দেখা গেছে।
হাসান মাহমুদ: ফল নয়, প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস
ম্যাচসেরার পুরস্কারটা গিয়েছে হাসান মাহমুদের হাতে। দুই ইনিংস মিলিয়ে ৯ উইকেট, প্রথম ইনিংসে ৬ উইকেট—অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার প্রধান কারিগর তিনি।
কিন্তু ম্যাচসেরার বক্তব্য শুনলে মনে হবে, এত বড় জয় যেন খুব স্বাভাবিকভাবেই এসেছে।
ম্যাচের আগে প্রতিটি অনুশীলন সেশনে নিজেদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন তারা। ফল কী হবে, সেটি নিয়ে ভাবেননি। বরং প্রক্রিয়ার ওপর বিশ্বাস রেখেছেন।
‘‘যা-ই হোক, আমাদের পাঁচ দিন খেলতে হবে। তারপর ফল আসবে,’’ বলেছেন হাসান।
বোলাররা ধৈর্য ধরেছেন। লাইন-লেন্থ ঠিক রেখেছেন। ফল আসবেই—এই বিশ্বাস ছিল।
ডারউইনে ফল এসেছে। এবং এমন ফল এসেছে, যা হয়তো বাংলাদেশের ক্রিকেটের পরবর্তী প্রজন্মকে আরও একটু বড় স্বপ্ন দেখতে শেখাবে।
মিরাজের কাছে বিশ্বাসটাই ছিল আসল
চতুর্থ দিনের নায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। দ্বিতীয় ইনিংসে পাঁচ উইকেট। এর মধ্যে স্টিভ স্মিথের উইকেটটি নিয়েছিলেন আগের দিন। শেষ উইকেটটিও তার—আর সেটি নেওয়ার পরই বাংলাদেশ ডাগআউটে শুরু হয় উৎসব।
মিরাজের কথায় অবশ্য সেই উৎসবের আগেও ছিল বিশ্বাসের গল্প।
২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় এসে, প্রস্তুতি ম্যাচে হেরে গিয়েও বিশ্বাস হারায়নি বাংলাদেশ। বরং মনে হয়েছে, এই কন্ডিশনে নিজেদের প্রমাণ করার এটাই সুযোগ।
‘‘ওরা বিশ্বমানের দল। অনেক ভালো খেলোয়াড় আছে। আমরা যদি ওদের হারাতে পারি, সেটা আমাদের দেশ ও ক্রিকেটের জন্য অনেক বড় ব্যাপার হবে,’’ বলেছেন মিরাজ।
তারপর? বিশ্বাস রাখতে হবে।
কারণ, তার কথায়, ‘বিশ্বাস ছাড়া এটা করা সম্ভব নয়।’
প্রথম ১০ ওভারে তানজিম হাসান সাকিব ও শাদমান ইসলাম যে ব্যাটিং করেছেন, এরপর মুমিনুল হকের অবদান, হাসান-তাসকিন-তাইজুলদের জুটি—সব মিলিয়ে মিরাজের চোখে বাংলাদেশের আসল শক্তি ছিল দল হিসেবে একসঙ্গে থাকা।
অস্ট্রেলিয়ার বোলিং আক্রমণে কে আছে, সেটি না ভেবে বল দেখে খেলা। ইতিবাচক থাকা। উইকেটে টিকে থাকা।
ডারউইনে বাংলাদেশের ক্রিকেট যেন এই সহজ কথাগুলোরই কঠিন পরীক্ষায় পাস করেছে।
২-০? শান্তর উত্তর—প্রমাণ আছে, কিন্তু...
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সিরিজ কি ২-০ হবে?
শান্তর কাছে প্রমাণ আছে, কিন্তু নিশ্চয়তা নেই।
‘‘আমাদের সেই প্রমাণ আছে। কিন্তু ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে,’’ অধিনায়ক বললেন।
প্রথম টেস্টের আগে যেমন বলেছিলেন, পাঁচ দিন ভালো ক্রিকেট খেলতে হবে—দ্বিতীয় টেস্টেও তার পরিকল্পনা একই। সেশন ধরে ধরে এগোনো। বোলারদের নিজেদের কাজটা করতে দেওয়া। ব্যাটসম্যানদের অবদান রাখা। বিশেষ করে লোয়ার মিডল অর্ডার ও লোয়ার অর্ডার যেভাবে প্রথম টেস্টে রান যোগ করেছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ম্যাকেতে ছয় দিন পর শুরু হবে দ্বিতীয় টেস্ট। তার আগে বাংলাদেশের হাতে এখন সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটি আছে—বিশ্বাস। আর অস্ট্রেলিয়ার হাতে? সম্ভবত একটা কঠিন প্রশ্ন—ডারউইনে যা ঘটেছে, সেটি কি নিছক এক ম্যাচের দুর্ঘটনা, নাকি বাংলাদেশ সত্যিই বদলে গেছে?
শান্তর উত্তরটা অবশ্য ইতিমধ্যেই পাওয়া গেছে।
‘‘এটা বাংলাদেশের যেকোনো সংস্করণে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জয়।’’
কথাটা শুধু আনন্দের মুহূর্তের আবেগ বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ডারউইনের স্কোরবোর্ডও যেন একই কথাই বলছে।
সূত্র:ক্রিকইনফো


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









