দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কূটনীতিতে মালয়েশিয়া বরাবরই ভারসাম্যের রাজনীতি অনুসরণ করে এসেছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাঝেও দেশটি কোনো পক্ষের সঙ্গে পুরোপুরি না গিয়ে নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।
কিন্তু সম্প্রতি তাইওয়ান নিয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মন্তব্য সেই পুরোনো নীতির প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে। তার বক্তব্যে চীনের প্রতি অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত দেখছেন কেউ কেউ। তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ বলছে, মালয়েশিয়ার নীতিতে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসেনি।
সম্প্রতি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আনোয়ার বলেন, ‘‘তাইওয়ানকে তিনি ‘চীনের অংশ’ হিসেবেই দেখেন।’’ শান্তিপূর্ণভাবে পুনরায় একত্রীকরণ সম্ভব না হলে চীন শক্তি প্রয়োগ করলে তিনি সেটির নিন্দা করবেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার মালয়েশিয়ার একটি রাজ্য বিচ্ছিন্ন হতে চাইলে দেশটির অখণ্ডতা রক্ষায় শক্তি প্রয়োগের উদাহরণ দেন।
আনোয়ারের বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে বেইজিং। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবারও বলেছে, তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং চীন অবশ্যই পুনরায় একত্রীকরণ করবে।
অন্যদিকে তাইওয়ান তার মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাইওয়ানের সরকারের আশঙ্কা, চীনের প্রতি আনোয়ারের একতরফা সমর্থন মালয়েশিয়ায় তাইওয়ানের ব্যবসায়িক বিনিয়োগের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মালয়েশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে তাইওয়ানের বড় বিনিয়োগ রয়েছে।
পরে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে আনোয়ার কিছুটা অবস্থান নরম করে বলেন, ‘‘মালয়েশিয়া চীনের অবস্থানকে সম্মান করে, তবে তাইওয়ান প্রণালির উত্তেজনার শান্তিপূর্ণ সমাধানই চায়।’’
চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা, পশ্চিমের সঙ্গেও সম্পর্ক
মালয়েশিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এখন চীন। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভসহ বিভিন্ন চীনা বিনিয়োগও দেশটিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতেও আনোয়ার সরকার পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে।
তবু মালয়েশিয়ার পশ্চিমের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্কও বেশ শক্তিশালী। দেশটি ফাইভ পাওয়ার্স ডিফেন্স অ্যারেঞ্জমেন্টসের (এফপিডিএ) গুরুত্বপূর্ণ সদস্য; এর অন্য সদস্য সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য। প্রতিবছর এ জোটের অধীনে সামরিক মহড়াও হয়।
অর্থনীতিতেও মালয়েশিয়া একই ধরনের ভারসাম্য বজায় রাখছে। চীনের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের বিনিয়োগ দেশটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে তাইওয়ানের প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে।
তাই আনোয়ারের সাম্প্রতিক মন্তব্য যতই চীনঘেঁষা শোনাক, মালয়েশিয়া যে রাতারাতি কোনো এক পক্ষের শিবিরে ঢুকে পড়ছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি। বরং কুয়ালালামপুরের পুরোনো কৌশলই হয়তো চলছে—চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করা, আবার পশ্চিমের সঙ্গে নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের দরজাও খোলা রাখা। আসন্ন সেপ্টেম্বরে আনোয়ারের চীন সফর সেই ভারসাম্যের রাজনীতিকে আরও স্পষ্ট করতে পারে।
সূত্র: আল জাজিরা


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









