সোনিয়া গান্ধীর বহুল প্রতীক্ষিত স্মৃতিকথা ‘বিলংগিং: এ জার্নি অব লাভ’ ভারতে প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। রাজস্থানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলটসহ কংগ্রেসের কয়েকজন নেতা অভিযোগ করেছেন, বইয়ের কিছু অংশ—বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) এবং মোদি সরকারের সময়ে চীনের ভারতীয় ভূখণ্ড দখলসংক্রান্ত বিষয়—বাদ দেওয়ার জন্য প্রকাশনা সংস্থা পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়ার ওপর চাপ ছিল।
এসব অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছে পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া (পিআরএইচআই)।
সোমবার (৩১ আগস্ট) পিআরএইচআই দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, স্মৃতিকথাটি প্রকাশ না করার পেছনে কোনো ‘বাইরের চাপ’ ছিল না। বরং সম্পাদনা-সংক্রান্ত আলোচনার সময় একটি ‘নির্দিষ্ট বিষয়ে’ লেখকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ায় প্রকাশনা প্রক্রিয়া থেমে যায়।
পিআরএইচআইয়ের মুখপাত্র পল্লবী নারায়ণ বার্তা সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিলংগি’ প্রকাশ করতে প্রতিষ্ঠানটি ‘খুবই আগ্রহী’ ছিল। এটি তাদের জন্য একটি ‘কষ্টসাধ্যভাবে অর্জিত অধিগ্রহণ’ ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রকাশনা সংস্থাটি বলেছে, পাণ্ডুলিপিটি তাদের স্বাভাবিক সম্পাদকীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে। এ সময় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়। কিছু বিষয়ে লেখকের পক্ষ পরিবর্তনে সম্মত হয়েছিল, আবার কিছু বিষয়ে প্রকাশক লেখকের অবস্থান মেনে নিয়েছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়নি।
পিআরএইচআইয়ের ভাষ্য, এরপর লেখকের দল জানিয়ে দেয় যে তারা আর প্রকাশনার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে চান না। প্রকাশনা সংস্থাটি তাদের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেছে।
কোন বিষয়টি নিয়ে এই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা অবশ্য জানায়নি পিআরএইচআই। তাদের যুক্তি, এ বিষয়ে চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে এবং লেখকের গোপনীয়তা রক্ষা করা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সোনিয়া গান্ধীর বই প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক মহলে মূল প্রশ্ন উঠেছে, প্রকাশকের ওপর কি সরকারের পক্ষ থেকে কোনো চাপ এসেছিল?
পিআরএইচআই স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, এমন কোনো চাপ ছিল না। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বইটির বিষয়বস্তু প্রকাশের আগে থেকেই গোপনীয় এবং তা প্রকাশনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে ‘বাইরের চাপের’ অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
প্রকাশক আরও বলেছে, একজন প্রকাশক হিসেবে কোনো পাণ্ডুলিপি নিয়ে প্রশ্ন তোলা, প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পরামর্শ দেওয়া, তথ্য যাচাই করা এবং স্বাধীন সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া তাদের দায়িত্বের অংশ। ‘বিলংগিং’–এর ক্ষেত্রেও তারা সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াই অনুসরণ করেছে।
পিআরএইচআইয়ের ব্যাখ্যার আগে বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। সাবেক রাজস্থান মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট অভিযোগ করেন, সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথার কিছু অংশ বাদ দেওয়ার জন্য পেঙ্গুইন ইন্ডিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল।
গেহলটের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, আরএসএস এবং মোদি সরকারের সময়ে চীনের ভারতীয় ভূখণ্ড দখলের মতো বিষয়গুলোর উল্লেখ ছিল।
সাবেক মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কমল নাথও প্রশ্ন তুলেছিলেন, পেঙ্গুইনের সিদ্ধান্তের পেছনে অন্য কোনো পক্ষের চাপ ছিল কি না।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সমালোচনা শুরু হয়। বিরোধী দলের নেতারা বিষয়টিকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রকাশনার স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত করে প্রশ্ন তোলেন।
বিতর্কের সূত্রপাত আরও জোরালো হয় যখন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আলফ্রেড এ. নফ, যা পেঙ্গুইন র্যান্ডম হাউসের একটি ইমপ্রিন্ট, ঘোষণা করে যে সোনিয়া গান্ধীর স্মৃতিকথাটি বিশ্বব্যাপী আগামী ১০ নভেম্বর প্রকাশিত হবে।
অর্থাৎ, ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তটি বইটির আন্তর্জাতিক প্রকাশ বন্ধ করছে না। তবে ভারতে প্রকাশনা নিয়ে পেঙ্গুইন র্যান্ড হাউস ইন্ডিয়া ও লেখকের পক্ষের মধ্যে ঠিক কোন বিষয় নিয়ে মতবিরোধ হয়েছিল, সেটি এখনো অজানা।
কী থাকছে স্মৃতিকথায়
সোনিয়া গান্ধীর এই স্মৃতিকথা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আগ্রহ রয়েছে। সাধারণত জনসমক্ষে খুব বেশি ব্যক্তিগত কথা না বলা এই কংগ্রেস নেত্রী বইটিতে তার জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
শৈশবের ইতালি, যুদ্ধ-পরবর্তী ইউরোপে বেড়ে ওঠা, রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তার বিয়ে, নেহরু-গান্ধী পরিবারের অংশ হয়ে ওঠা, স্বামী রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী সময়ে তার সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ—এসব বিষয় বইটিতে স্থান পাওয়ার কথা।
সোনিয়া গান্ধীর রাজনৈতিক জীবন এবং নেহরু-গান্ধী পরিবারের আধুনিক ভারতের রাজনীতিতে ভূমিকার কারণে স্মৃতিকথাটি প্রকাশের আগেই ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে।
পেঙ্গুইন র্যান্ড হাউস ইন্ডিয়া বলেছে, তারা বইটি প্রকাশ করতে আগ্রহী ছিল এবং শেষ পর্যন্ত প্রকাশনা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত তাদের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি। বরং একটি নির্দিষ্ট সম্পাদকীয় বিষয়ে সমঝোতা না হওয়ায় লেখকের পক্ষই প্রকাশনা এগিয়ে না নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়।
তবে সেই ‘নির্দিষ্ট বিষয়’ কী, তা প্রকাশ না করায় বিতর্ক পুরোপুরি থামছে না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









