সাত বছর পর ভারতে আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ১২-১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে তার এই সফর দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মোড় আনতে পারে বলে মনে করছেন কূটনীতিকরা। ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাবাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর থেকে সম্পর্কে যে বরফ জমেছিল, তা ধীরে ধীরে গলতে শুরু করেছে। এই পটভূমিতেই শি জিনপিংয়ের সফরকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বড় প্রত্যাশা
সম্মেলনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে শি জিনপিংয়ের। গত বছর প্রধানমন্ত্রী মোদীর চীন সফরে যে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, এই সফর তারই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে।
চীনে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত বিক্রম দোরাইস্বামী চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসে লেখা এক নিবন্ধে বলেছেন, বিশ্বের দুই বৃহত্তম উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে ভারত ও চীনের মধ্যে স্থিতিশীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক শুধু ২৮০ কোটি মানুষের স্বার্থেই নয়, গোটা এশিয়া তথা বিশ্বের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্যও জরুরি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রয়টার্সকে জানিয়েছে, এ মাসেই কিরগিজস্তানে এক আঞ্চলিক সম্মেলনে শি ও মোদীর সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ হয়েছিল। দুই নেতাই মনে করেন, ভারত ও চীন একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং অংশীদার—একে অপরের উন্নয়নের জন্য তারা হুমকি নয়, সুযোগ।
গত মাসে বেইজিংয়ে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর মধ্যে এক বৈঠকেও উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের সাক্ষাতের ইতিবাচক প্রভাবের কথা তুলে ধরা হয়।
সীমান্ত প্রশ্ন
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের প্রকৃত উন্নতির জন্য সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যে অত্যন্ত জরুরি, তা ফের স্পষ্ট করবেন বলে আশা করা হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী মোদী।
পূর্ব লাদাখে সেনা প্রত্যাহার ও সমস্যা সমাধানের পর কাজানে দুই দেশ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ পুনরায় শুরু করতে সম্মত হয়েছিল।
দুই নেতা সীমান্ত বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধিদের সীমান্ত এলাকায় শান্তি রক্ষার তদারকি এবং ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজার দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
বাণিজ্য ঘাটতির সমস্যা
দুই দেশের আলোচনায় বাণিজ্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে চলেছে, বিশেষ করে ভারতের জন্য। ন্যায্য বাজার প্রবেশাধিকার, সরবরাহ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা এবং ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ঘাটতি মোকাবিলা নয়াদিল্লির মূল আলোচ্যসূচি হতে পারে।
চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বিশাল, এবং আমদানির ক্ষেত্রে ভারত এখনও এশিয়ার এই বৃহত্তম অর্থনীতির ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
চীন এখন ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত হিসাবে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ রেকর্ড ১৫,১১০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তবে চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতিও রেকর্ড ১১,২১৬ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ৯,৯২১ কোটি ডলার।
গত বছর ভারত ব্রিকস সদস্য দেশগুলোর কাছে বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল, এবং এবারও বাজারে বেশি প্রবেশাধিকারের দাবি আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সিজিটিএন-এর সাংবাদিক হুয়াং ইউয়ে এনডিটিভিকে বলেন, শি জিনপিংয়ের এই সফর দুই দেশের বাণিজ্য বাড়াতে সহায়ক হবে বলে তিনি আশাবাদী। তার ভাষায়, একটি বড় চীনা ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল শি-র সঙ্গে নয়াদিল্লি যাচ্ছে, এবং চীনা কোম্পানিগুলো ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোতে ব্যবসার সুযোগ খুঁজতে আগ্রহী।
ইতিবাচক লক্ষণ
সম্পর্কে বরফ গলার বেশ কিছু স্পষ্ট লক্ষণ ইতিমধ্যেই দেখা গেছে।
গত বছর ভারত ও চীন সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় চালু করে, পাশাপাশি চীনা ব্যবসায়ীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করে নয়াদিল্লি।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ছয় বছর বন্ধ থাকার পর এ বছর ভারত-চীন সীমান্ত বাণিজ্যও পুনরায় শুরু হয়েছে। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এই বাণিজ্য স্থগিত হয়েছিল।
লিপুলেখ গিরিপথ দিয়ে ভারত-চীন সীমান্ত বাণিজ্য শুরু হয়েছিল ১৯৯২ সালে এবং তা চলেছিল ২০১৯ সাল পর্যন্ত। ১ আগস্ট চীনা কর্তৃপক্ষ ১৬ জন ব্যবসায়ী ও চারজন সহায়ক কর্মীকে পণ্য ছাড়াই তিব্বতে প্রবেশের অনুমতি দেয়, যার মধ্য দিয়ে দুই পক্ষ বাণিজ্য কার্যক্রম পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করে।
সিকিমের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নাথুলা গিরিপথ দিয়েও ছয় বছর বন্ধ থাকার পর সীমান্ত বাণিজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরায় চালু হয়েছে। ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের অন্যতম প্রধান এই বাণিজ্যপথ এখন আবার সচল।
তবে এই বরফ গলা এখনও সতর্ক পর্যায়ে রয়েছে। দুই পক্ষই অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে আগ্রহী হলেও, সীমান্ত সমস্যাই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে—এই সম্পর্ক কৌশলগত বরফ গলানো থেকে সত্যিকারের স্থায়ী স্বাভাবিকতার দিকে এগোতে পারবে কি না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









