কিন্ডারগার্টেনের দিনগুলোর মধ্যে একটি খরগোশের কথা রিউইচি সাকামোতোর মনে রয়ে গেছে। গ্রীষ্মের ছুটিতে শিশুদের বাড়ি বাড়ি ঘুরে খরগোশটির দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। একসময় সেটি সাকামোটোর বাড়িতেও আসে। এত ছোট বয়সে দরজার সামনে একটি জীবন্ত প্রাণীর উপস্থিতি ছিল এক বিশাল ঘটনা। প্রতিদিন তিনি তাকে তাজা শাকপাতা খাওয়াতেন, দেখতেন তার কোনো প্রয়োজন আছে কি না।
সেপ্টেম্বরে স্কুল খুললে শিক্ষক বললেন, গ্রীষ্মে খরগোশটির যত্ন নিতে কেমন লেগেছে, সেই অনুভূতি দিয়ে একটি গান লিখতে হবে। কথা ও সুর—দুটিই নিজেদের তৈরি করতে হবে। সাকামোতো প্রথমে লিখলেন, ‘খরগোশটির চোখ লাল।’ তারপর তার সঙ্গে জুড়ে দিলেন একটি সুর। সম্ভবত মা তাকে নোটেশন লিখতে সাহায্য করেছিলেন। সেই গান রেকর্ডও করা হয়েছিল। বয়স তখন চার কিংবা পাঁচ। সেটিই ছিল তার জীবনের প্রথম গান।
অভিজ্ঞতাটি তাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। খরগোশটির যত্ন নেওয়ার চেয়েও তাকে একটি গানে রূপ দেওয়া ছিল বেশি উত্তেজনাময়। মনে হয়েছিল, এমন কিছু করার অনুমতি তাকে দেওয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ তার নিজের।
কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেই ছিল এক অদ্ভুত প্রশ্ন।
খরগোশটি ছিল একটি বাস্তব প্রাণী। সে তার হাতে কামড়েছিল, তার মল তাকে পরিষ্কার করতে হয়েছিল। আর গানটি ছিল তার নিজের তৈরি। এই দুটি জগতের মধ্যে কোনো সরাসরি সম্পর্ক ছিল না। অথচ গানটি তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল। শিশু সাকামোতো তখন এসব নিয়ে দার্শনিকভাবে ভাবতে পারেননি। তবু তিনি বুঝেছিলেন—বাস্তব জীবন আর শিল্প এক জিনিস নয়। তাদের মধ্যে একটি দূরত্ব আছে। সেই দূরত্বই হয়তো সংগীতের জন্মস্থান।

সংগীতের সীমা, সংগীতের শক্তি
২০০৬ সালে যখন সাকামোটো এই স্মৃতি লিখছেন, তখন লেবাননে যুদ্ধ চলছে। ধরা যাক, লেবাননের একটি ছেলে বিমান হামলায় তার ছোট বোনকে হারাল। শোক তাকে প্রায় নিশ্চল করে দিল। তারপর সে একটি গান তৈরি করল। কিন্তু যে মুহূর্তে তার বোনের মৃত্যুর শোক সংগীতে পরিণত হলো, সেই মুহূর্তেই সেটি আর শুধু তার বোনের মৃত্যু রইল না। তা প্রবেশ করল সংগীতের জগতে। সেখানে শোকের বদলে সুর, ছন্দ, কাঠামো এবং সংগীতের নিজস্ব নিয়ম হয়ে উঠল প্রধান।
শব্দের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। অনুভূতিকে ভাষায় লিখে ফেললে সেটি ভাষার নিয়মের মধ্যে প্রবেশ করে। বাক্য কতটা স্পষ্ট, কতটা তীক্ষ্ণ, কতটা সুন্দর—এসব তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সংগীতও অনুভূতিকে নিজের জগতে নিয়ে যায়। সেখানে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ধীরে ধীরে একটি বিমূর্ত রূপ নেয়।
একদিন সেই ছেলেটি থাকবে না। তার স্মৃতিও একসময় মুছে যাবে। কিন্তু যদি তার বোনকে হারানোর শোক একটি গানে রূপ নেয়, গানটি অন্য মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। একটি ব্যক্তিগত স্মৃতি তখন সময় ও স্থানের সীমা অতিক্রম করে।
এটাই সংগীতের শক্তি। তবে শিল্পের এই যাত্রায় কিছু হারিয়ে যায়। আমাদের আনন্দ, ভয়, শোক, ভালোবাসা—সবকিছুকে এমন একটি রূপ দিতে হয়, যা অন্য মানুষ বুঝতে পারে। সেই কারণে শিল্প ধীরে ধীরে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দূরে সরে যায়। অনুভূতি হয়ে ওঠে বিমূর্ত, সংক্ষিপ্ত, প্রায় নিরাসক্ত।
কিছু অবশ্যই হারায়। কিন্তু সেই হারানোর জায়গাতেই তৈরি হয় একটি সেতু। পৃথিবীর অন্য প্রান্তের একজন মানুষ, অন্য ভাষার একজন মানুষ, এমনকি অন্য সময়ের একজন মানুষও সেই সেতু পেরিয়ে এসে অনুভব করতে পারে—এই শোক আমি চিনি। এই আনন্দ আমারও ছিল।
ভাষা, সংগীত, সংস্কৃতি—শেষ পর্যন্ত হয়তো এই অসম্ভব কাজটিই করে। একজন মানুষের ভেতরের অন্ধকার থেকে আরেকজন মানুষের কাছে একটি ক্ষীণ আলো পৌঁছে দেয়।

বই: মিউজিক সেটস ইউ ফ্রি, লেখক: রিউইচি সাকামোতো, প্রকাশক: হারপারভায়, ৪৯৬ পৃষ্ঠার বইটির দাম ৩৫ ডলার।
পরিচিতি
রিউইচি সাকামোতো (১৯৫২–২০২৩) ছিলেন জাপানের প্রখ্যাত সুরকার, সংগীতশিল্পী, প্রযোজক ও পরিবেশক। টোকিওতে জন্ম নেওয়া সাকামোতো ছোটবেলা থেকেই পিয়ানো ও সংগীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করেন। পরে টোকিও ইউনিভার্সিটি অব দ্য আর্টসে পড়াশোনা করেন এবং জাপানের ইলেকট্রনিক সংগীতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
১৯৭৮ সালে তিনি ‘থাউজ্যান্ড নাইভস’ অ্যালবাম দিয়ে একক শিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। একই সময়ে ইয়েলো ম্যাজিক অর্কেস্ট্রা (ওয়াইএমও) গড়ে তোলেন হারুওমি হোসোনো ও ইউকিহিরো তাকাহাশির সঙ্গে। ইলেকট্রনিক সংগীত, পপ, শাস্ত্রীয় সুর ও নানা দেশের লোকসংগীতকে মিলিয়ে তাঁরা তৈরি করেছিলেন এক নতুন সংগীতভাষা।
সাকামোতো চলচ্চিত্রের সংগীতেও অসাধারণ সাফল্য পান। বার্নার্ডো বের্তোলুচ্চির ‘দ্য লাস্ট এমপেরর’-এর সংগীতের জন্য ১৯৮৮ সালে অস্কার, গোল্ডেন গ্লোব ও গ্র্যামি পুরস্কার অর্জন করেন। ‘মেরি ক্রিসমাস’, ‘মিস্টার লরেন্স’, ‘দ্য শেল্টারিং স্কাই’ , ‘লিটল বুদ্ধ’ ও ‘দ্য রেভেন্যান্ট’-এর মতো চলচ্চিত্রেও তার সুর বিশেষভাবে স্মরণীয়।
তার সংগীতে ছিল নিঃসঙ্গতা, প্রকৃতি, স্মৃতি ও সময়ের গভীর উপস্থিতি। জলবায়ু সংকট ও পারমাণবিক বিপদের বিরুদ্ধেও তিনি সোচ্চার ছিলেন। জীবনের শেষ বছরগুলোতেও সংগীতকে তিনি দেখেছেন পৃথিবী ও মানুষের অভিজ্ঞতার মধ্যে এক অদৃশ্য সেতু হিসেবে। ২০২৩ সালের ২৮ মার্চ টোকিওতে ৭১ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









