অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে আবারও প্রবেশ করেছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের একটি দল।
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) সকালে তারা মসজিদের আঙিনায় ইহুদি ধর্মীয় প্রার্থনা ও বিভিন্ন আচার পালন করে।
ইহুদি ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে পবিত্র দিন ইয়োম কিপ্পুর সামনে রেখে গত কয়েক দিনে এমন একাধিক ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে দেশটির রাজনীতিতেও উত্তাপ বাড়ছে। বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরসহ কয়েকজন আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেন। শনিবার রাতে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুও অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের পুরোনো শহরের নিচে থাকা সুড়ঙ্গপথে যান।
রবিবার ভোরে নেতানিয়াহু তার সরকারি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে কয়েকটি ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করেন। সেখানে তাকে মুসলিমদের কাছে বুরাক প্রাচীর নামে পরিচিত পশ্চিম প্রাচীরের কাছে ইহুদি ধর্মীয় ‘সেলিখত’ প্রার্থনায় অংশ নিতে দেখা যায়।
এই সুড়ঙ্গগুলো অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের ব্যস্ত পুরোনো শহর এবং আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণের নিচ দিয়ে বিস্তৃত। এ কারণে এসব স্থানে ইসরায়েলি রাজনীতিক ও বসতি স্থাপনকারীদের উপস্থিতি ফিলিস্তিনিদের কাছে বিশেষভাবে সংবেদনশীল।
শনিবার সন্ধ্যায় নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় নেতানিয়াহু কয়েকজন মন্ত্রী এবং হাজার হাজার ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীকে সঙ্গে নিয়ে বুরাক প্রাচীরের চত্বরে যান। সামনে ছিল ইয়োম কিপ্পুর।
প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ করা ভিডিওতে তাকে বুলেটপ্রুফ কাচের আড়াল থেকে ধর্মীয় আচার পালন করতে দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে নেতানিয়াহু ও তার স্ত্রী সারা পশ্চিম প্রাচীরের নিচ দিয়ে যাওয়া একটি খনন করা সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে হাঁটছিলেন। তখন সেখানে ইহুদি ধর্মীয় প্রার্থনা চলছিল।
ভিডিওতে নেতানিয়াহুকে বলতে শোনা যায়, তারা বুরাক প্রাচীরের নিচের সুড়ঙ্গে রয়েছেন এবং প্রাচীন পাথর স্পর্শ করার বিষয়টি তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। তিনি আরও বলেন, তারা তথাকথিত ‘হোলি অব দ্য হলিজ’-এর খুব কাছে এবং তারা সেখানে থাকবেন।
নেতানিয়াহুর এই ভূগর্ভস্থ সফরের সময়ই আল-আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে বসতি স্থাপনকারীদের প্রবেশ চলতে থাকে।
ফিলিস্তিনের জেরুজালেম গভর্নরেট রবিবার তাদের ফেসবুক পেজে জানায়, স্থানীয় সময় সকাল ১০টা পর্যন্ত প্রায় ৫৭০ জন বসতি স্থাপনকারী আল-আকসার প্রাঙ্গণে প্রবেশ করেছে। গভর্নরেটের দাবি, ইয়োম কিপ্পুর উপলক্ষে তারা সেখানে তালমুদভিত্তিক ধর্মীয় আচার এবং মাটিতে উপুড় হয়ে প্রার্থনা করেছে।

ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস। সংগঠনটি তাদের সরকারি টেলিগ্রাম চ্যানেলে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা অবস্থায় নেতানিয়াহুর আল-আকসা ও বুরাক প্রাচীরের নিচের সুড়ঙ্গ ও খনন এলাকায় প্রবেশ এবং তথাকথিত ‘হোলি অব দ্য হলিজ’ নিয়ে তার বক্তব্য আল-আকসার পরিচয় ও অবস্থানের ওপর সরাসরি আঘাত। হামাসের মতে, এটি ফিলিস্তিনি জনগণ এবং আরব ও মুসলিম বিশ্বের অনুভূতিতে উসকানি দেওয়ার শামিল।
হামাস আল-আকসার ইসলামী পরিচয়ের ওপর জোর দিয়ে মসজিদের নিচে ইসরায়েলের চলমান খননকাজও প্রত্যাখ্যান করেছে। অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের খননকাজ বহু বছর ধরে চলছে। প্রত্নতাত্ত্বিকদের একটি অংশ এবং জাতিসংঘ এ ধরনের কাজ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব খননের মাধ্যমে দ্বিতীয় মন্দিরের প্রতিরক্ষা প্রাচীরের প্রমাণ খোঁজা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলেছেন, এই দাবির পক্ষে এখনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এসব কাজের মাধ্যমে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ওপর ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
২০২২ সালে নেতানিয়াহু এই সুড়ঙ্গের ভেতর মন্ত্রিসভার বৈঠক করেছিলেন। সে সময় তিনি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুজালেমকে ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দাবি করে আসছে।
শনিবারের নেতানিয়াহুর সফরের সময়টিও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইয়োম কিপ্পুরের আগের এই সফর এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতে তার অবস্থান নিয়ে আলোচনা চলছে। আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মধ্যপ্রাচ্য ও আরব-ইসরায়েল সংঘাতবিষয়ক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আহমেদ আল-হিলা বলেন, অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহু ধর্মীয় প্রতীক ও আল-আকসাকে ঘিরে রাজনৈতিক বার্তা ব্যবহার করছেন।
আল-হিলার মতে, এই সফরের মাধ্যমে নেতানিয়াহু নিজেকে ডানপন্থী রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থানের একজন নেতা হিসেবে তুলে ধরতে এবং নির্বাচনে সমর্থন বাড়াতে চাইছেন। তবে এটি তার বিশ্লেষণ; নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকে সফরের উদ্দেশ্য হিসেবে এমন বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
নেতানিয়াহুর সফরের সময় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়টিও আল-হিলা তুলে ধরেছেন। তার মতে, নেতানিয়াহুকে বুলেটপ্রুফ কাচের আড়ালে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিতে হওয়া এবং বিপুল নিরাপত্তা মোতায়েনের ঘটনা দেখায় যে পূর্ব জেরুজালেমের ওপর ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণের দাবি থাকলেও শহরটির রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এখনও বিরোধপূর্ণ।
এই সফরের আরেকটি প্রেক্ষাপট হলো ‘ই১’ নামে পরিচিত বিতর্কিত বসতি প্রকল্প। প্রকল্পটির মাধ্যমে পূর্ব জেরুজালেম ও অধিকৃত পশ্চিম তীরের মধ্যকার ভৌগোলিক সংযোগ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আপত্তি রয়েছে। ইসরায়েলি সরকার এই এলাকায় বসতি নির্মাণের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে।
আল-হিলার মতে,‘ই১’ প্রকল্প পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশের মধ্যে সংযোগকে আরও দুর্বল করার পাশাপাশি পূর্ব জেরুজালেমকে তার ফিলিস্তিনি পারিপার্শ্বিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে। তাঁর বিশ্লেষণে, এই প্রেক্ষাপটে নেতানিয়াহুর বুরাক প্রাচীর এলাকায় সফরকে শুধু ধর্মীয় ঘটনা হিসেবে দেখলে এর রাজনৈতিক দিকটি বাদ পড়ে যায়। বরং এটি জেরুজালেমের ওপর ইসরায়েলি সার্বভৌমত্বের দাবিকে সামনে আনার একটি রাজনৈতিক প্রতীক হিসেবেও দেখা যেতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









