কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে ভয় পাওয়ার কারণ আছে। এআই অনেক কাজ খুব দ্রুত করতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ কারণে কি আমাদের এআইকে থামিয়ে দিতে হবে? নাকি নিজেদের আরও ভালোভাবে প্রস্তুত করার জন্য কিছু সময় দরকার?
জ্ঞান ও নতুন প্রযুক্তিকে মানুষ সব সময় সহজভাবে নেয়নি। বহু হাজার বছর ধরেই মানুষ নতুন জ্ঞান নিয়ে ভয় পেয়েছে।
গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর ফেড্রাস গ্রন্থেও নতুন প্রযুক্তি নিয়ে এমন একটি গল্প আছে। সেখানে রাজা থামুস মনে করতেন, লেখার প্রচলন হলে মানুষ নিজের স্মৃতিশক্তির ওপর কম নির্ভর করবে। তারা অনেক কিছু জানে বলে মনে করবে, কিন্তু আসলে গভীরভাবে বুঝবে না।
আজ সেখানে ‘লেখা’র জায়গায় ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ বসিয়ে দিলেও কথাটি অনেকের কাছে পরিচিত মনে হবে।
এরপর পৃথিবীতে ছাপাখানা এসেছে। বই ছাপা হয়েছে, আবার অনেক বই নিষিদ্ধও করা হয়েছে। এসেছে সিনেমা, রেডিও ও টেলিভিশন। এসব মাধ্যমকেও কখনো কখনো নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। পরে এসেছে ইন্টারনেট। শুরুতে ইন্টারনেটকে অনেক বেশি স্বাধীন মনে হলেও ভুল তথ্য ও অপপ্রচারের কারণে সেটিকেও নিয়ন্ত্রণ করার দাবি উঠেছে।
তবে নতুন প্রযুক্তির ইতিহাসকে শুধু ‘ভালো মানুষ বনাম খারাপ মানুষ’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। কারণ নতুন প্রযুক্তি এলে আমরা প্রায় সবাই কিছুটা ভয় পাই। নতুন প্রযুক্তি চাকরি বদলে দিতে পারে, পুরোনো নিয়ম ভেঙে দিতে পারে এবং আমাদের পরিচিত পৃথিবীকে অচেনা করে তুলতে পারে। তাই প্রথমে আমরা প্রায়ই বলি—‘একটু থামো, আগে বুঝে নিই।’
এআইয়ের ক্ষেত্রেও এমনটা হচ্ছে।
তবে এআই নিয়ে কিছু বাস্তব সমস্যাও আছে। এর একটি হলো ‘অ্যালাইনমেন্ট’। সহজ ভাষায় এর অর্থ হলো—আমরা যেভাবে চাই, এআই যেন ঠিক সেভাবেই কাজ করে। আমরা যা বলছি, তার ভুল অর্থ ধরে যেন এমন কিছু না করে বসে, যা আমরা চাইনি।

আরেকটি সমস্যা হলো—এআই কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, তা অনেক সময় আমরা পুরোপুরি বুঝতে পারি না। একটি কম্পিউটার আমাদের আচরণ সম্পর্কে অনেক কিছু বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পথটি মানুষের কাছে সব সময় পরিষ্কার থাকে না।
অর্থাৎ আমরা এআইকে কিছু কাজ করতে দিতে পারি, কিন্তু তার কাজ কীভাবে হচ্ছে, সেটাও আমাদের বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
তাই বলে এআইয়ের উন্নয়ন বন্ধ করে দিতে হবে—এমন নয়। বরং যদি যন্ত্রের ক্ষমতা মানুষের বোঝার ক্ষমতার চেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে আমাদেরও দ্রুত শিখতে হবে।
কিন্তু সেটাই সবচেয়ে কঠিন কাজ।
এখন শুধু প্রযুক্তিবিদরাই এআই নিয়ে চিন্তিত নন। সরকারগুলো চিন্তিত, কারণ আইন তৈরি হচ্ছে প্রযুক্তির চেয়ে ধীরে। শিক্ষকরা চিন্তিত, কারণ তাঁরা এখনও বুঝে উঠছেন কীভাবে এআইকে শিক্ষার কাজে ব্যবহার করবেন। শ্রমিকরা চিন্তিত, কারণ তাঁদের অনেকেই জানেন না ভবিষ্যতে তাঁদের কাজের কতটা থাকবে। বাবা-মায়েদেরও প্রশ্ন—তাদের সন্তানদের এমন কী শেখানো উচিত, যা ভবিষ্যতেও কাজে লাগবে?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। এআই শুধু আমাদের কাজ করার পদ্ধতি বদলাচ্ছে না; এটি শেখার পদ্ধতিও বদলাতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, অভিজ্ঞ মানুষ এআইকে ব্যবহার করে নতুন বিষয় আরও ভালোভাবে শিখতে পারে। কারণ তাদের আগে থেকেই কিছু জ্ঞান আছে। সেই জ্ঞান তাদের নতুন তথ্য বুঝতে সাহায্য করে। কিন্তু যার কোনো ভিত্তিই নেই, সে এআইকে ব্যবহার করে শেখার পরিবর্তে শেখার কষ্টটাই এড়িয়ে যেতে পারে।
ধরো, তুমি একটি অঙ্ক বুঝতে পারছ না। এআইকে দিয়ে যদি শুধু উত্তরটি লিখিয়ে নাও, তাহলে হয়তো আজকের অঙ্কটি হয়ে যাবে। কিন্তু অঙ্কটি কীভাবে করতে হয়, তা শেখা হবে না। পরের দিন একই ধরনের অঙ্ক এলে আবার সাহায্য লাগবে।
অন্যদিকে, তুমি যদি এআইকে বলো, ‘আমাকে ধাপে ধাপে বুঝিয়ে দাও, কিন্তু সরাসরি উত্তর দিও না’, তাহলে সেটি তোমার শেখার কাজে সহায়তা করতে পারে।
এ কারণেই আমাদের সামনে আসল প্রশ্ন শুধু ‘এআই কত দ্রুত শিখছে?’ নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—‘আমরা নিজেরা কতটা ভালোভাবে শিখছি?’
বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক পিআইএসএ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অনেক বছর ধরেই শিক্ষার্থীদের শেখার মান নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এই সমস্যার জন্য এআইকে দায়ী করা যাবে না। কারণ সমস্যাটি এআই আসার আগেই ছিল।

বরং এআই আমাদের পুরোনো সমস্যাগুলো আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
আমরা যদি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করতে না পারি যেখানে একজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে শেখে, ভুল করতে শেখে, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে শেখে এবং নিজের উত্তর যাচাই করতে শেখে, তাহলে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিও খুব বেশি কাজে আসবে না।
এআইয়ের সমস্যা আছে। এর অপব্যবহার হতে পারে। ভুল তথ্য ছড়াতে পারে। মানুষের চাকরির ধরন বদলে দিতে পারে। আবার সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি শিক্ষা, বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও আরও অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কাজে লাগতে পারে।
তাই এআইকে শুধু ভয় পাওয়া বা অন্ধভাবে বিশ্বাস করা—কোনোটিই ঠিক পথ নয়।
হাজার বছর ধরে মানুষ নতুন জ্ঞানকে ভয় পেয়েছে। কিন্তু জ্ঞানকে থামিয়ে রাখা যায়নি। প্রতিবারই নতুন প্রযুক্তি এসেছে, মানুষ তার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এবারও হয়তো আমাদের সামনে একই প্রশ্ন।
এআইকে ধীরে চলতে বলার আগে আমাদের নিজেদের জিজ্ঞেস করা উচিত—আমরা কি যথেষ্ট দ্রুত শিখছি?
কারণ ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়তো এমন নয় যে যন্ত্র খুব দ্রুত শিখছে। বরং সমস্যা হতে পারে, মানুষ শেখার সুযোগ পেয়েও যথেষ্ট ভালোভাবে শিখছে না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









