ইন ডায়েরি অব আ সিটিজেন উইদাউট আ কান্ট্রি , আরবীতে প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭১। ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় ‘বাই ফিফথ অব জুন সোসাইটি অ্যান্ড অ্যারাব উইমেন’স ইনফরমেশন কমিটি’, বৈরুত, লেবানন থেকে। দীর্ঘ লেখাটির অংশ বিশেষ আমরা এখানে পাঠকের জন্য তুলে ধরলাম। পড়ে অবশ্য ‘ফিলিস্তিনি চাক সার্কেল’ নামে একটি ছোট পুস্তিকা হিসাবে প্রকাশিত হয়।
—জন্মদিনে আমাকে একটা ট্যাংক উপহার দাও, প্রিয়। একটা কামান হলেও চলবে। অথবা যেকোনো অস্ত্র।
—ট্যাংকই দেব, ভালোবাসা। নতুন কিছু চেষ্টা করব। তার ভেতরেই তোমার সঙ্গে ঘুমাব।
—না। সুয়েজ খালের তীরে খোলা আকাশের নিচে তোমার সঙ্গে ঘুমাব।
—হা হা হা।
—হা হা হা।
তুমি রাস্তায় হাঁটো। ক্যাফেতে বসো। বাসে ওঠো। আর চুপ করে থাকো।
কেউ তোমার পরিচয়পত্রের গোপন কথাগুলো জানতে চায় না। তোমার নীরবতাই যথেষ্ট পরিচয়। ওই ধরনের ইসরায়েলি প্রেমের কথা শুনলে তোমার করার আর কিছু নেই। নীরব থাকাই তোমার অনুমোদিত একমাত্র ভঙ্গি।
মিষ্টি কথার সময় শেষ।
একসময় প্রেমিক বলত—তোমাকে চাঁদ এনে দেব, গোলাপ এনে দেব, মরুভূমির বাতাস এনে দেব।
এখন বলে—তোমাকে একটি ট্যাংক দেব।
মরুভূমির কল্পনা একসময় আকাশের দিকে উঠত। তার কোনো সীমানা ছিল না। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি, যুদ্ধ আর বিজয় সেই কল্পনার চারপাশে দেয়াল তুলে দিয়েছে। এখন প্রেমের কথাও খবরের কাগজের সঙ্গে মিশে যায়। নতুন অস্ত্রের নাম এসে বসে ভালোবাসার শব্দের পাশে।
প্রকৃতি থেকে যে আনন্দ একদিন জন্ম নিত, তার জায়গায় এসেছে যন্ত্র।
আর ইসরায়েলের আরব মানুষটি হঠাৎ আবিষ্কার করে—প্রেম করতেও সে যেন পিছিয়ে পড়েছে।
গোলাপ দিয়ে ভালোবাসার কথা বলতে শিখতে তার কত যুগ লেগেছিল!
এখন তাকে শিখতে হবে নতুন ভাষা।
প্রিয়তমা, তোমাকে আমি একটি ট্যাংক দেব।
আর কত যুগ লাগবে তাকে এই ভাষায় কথা বলতে শেখাতে?
এক.
তুমি কী ভাবছ?
ট্যাংকের ভেতরে তারা কীভাবে সন্তান জন্ম দেয়?
ট্যাংকের ভেতরে কীভাবে তারা আনন্দ করে?
এই হলো নিরাপদ ইসরায়েলি ঘর।
এই হলো প্রেমের বাসা।
এই হলো ভবিষ্যৎ।
দুই.
ভোর চারটায় দরজার ঘণ্টি বাজে।
তুমি জানো কে এসেছে।
কিন্তু ঘুম কখনো কখনো পুলিশের চেয়েও শক্তিশালী। তুমি ঘুমিয়ে থাকো।
সকাল নয়টায় কাজে যাও। কফির কাপ হাতে নিয়ে খবরের কাগজ খুলতে যাও। তখন সেই পরিচিত মানুষটি আসে।
আমার সঙ্গে চলুন।
তুমি জিজ্ঞেস করো, গ্রেপ্তার?
সে বলে, জানি না।
দাঁত মাজার জিনিস নেব? জামাকাপড়?
সময় নেই!
তুমি অফিসারের সামনে বসো। তার পেছনে হার্জেলের প্রতিকৃতি। সে অত্যন্ত ভদ্রভাবে বলে,
আপনাকে গ্রেপ্তার করতে পেরে আমি সম্মানিত বোধ করছি।
তুমিও ভদ্রতা ফিরিয়ে দাও।
আপনাকে সম্মান জানাতে পারাও আমার জন্য সম্মানের। তবে যদি দয়া করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগটা কী?
সে বলে,
সার্কাসের প্রবেশপথে একটি তরমুজ বিস্ফোরণের অভিযোগ আছে আপনার বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিপন্ন করার অভিযোগও আছে।
তরমুজ। রাষ্ট্র। সার্কাস।
কী আশ্চর্য সমন্বয়!

তিন.
আইনসম্মত আটক রাখার সময় শেষ হয়েছে। সবকিছুই এখানে আইনসম্মত।
তুমি আদালতে যাওয়ার অপেক্ষা করো। পুলিশের গাড়ির লোহার শিকের ফাঁক দিয়ে তোমার সুন্দর শহরটিকে আরেকবার দেখতে চাও। তোমার ভেতরে এখনও সামান্য বিশ্বাস বেঁচে আছে—হয়তো এবার তোমাকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
একটু অপেক্ষা করুন, তুমি বলো।
তারা বলে, আটকের নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টাও বেশি আমরা আপনাকে রাখব না। কী ভাবছেন? আমরা আইনের সীমার মধ্যেই থাকি। এটি ইসরায়েল, আরব জগত নয়।
তুমি কিছুক্ষণ আরব জগতের কথা ভাবো। তোমার দমবন্ধ করা দুর্দশার সঙ্গে সেখানে মিশে যায় কিছু স্বপ্ন।
তুমি অপেক্ষা করো। কিসের জন্য? তদন্ত কর্মকর্তার? নাকি আরব জগতের জন্য?
শেষ পর্যন্ত তোমাকে আরেকটি ঘরে নেওয়া হয়। সেখানে কয়েকজন অফিসার এবং এক বৃদ্ধা।
একজন অফিসার জিজ্ঞেস করে, আপনি কি সাবলীল হিব্রু বলতে পারেন?
তারপর সে অভিযোগের তালিকা পড়ে শোনায়। তুমি নাকি ইসরায়েল রাষ্ট্র ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করেছ।
তুমি জিজ্ঞেস করো, রাষ্ট্রের কথা বলছেন, না তরমুজের?
বৃদ্ধা চিৎকার করে ওঠে, আদালতকে সম্মান করুন!
তুমি অবাক হয়ে বলো, কোন আদালত? তার কণ্ঠ যেন বহুদিনের জমে থাকা কাদামাটি থেকে উঠে আসে—এটাই আদালত। আর আমি বিচারক।
তখন প্রথমবার তুমি বুঝতে পারো, তোমার প্রতি তাদের সম্মান এতই গভীর যে তারা আদালতটিকেই তোমার কাছে, কারাগারের ভেতর নিয়ে এসেছে।
কিন্তু তুমি এই বিরল সম্মান প্রত্যাখ্যান করো। তোমার কাছে আদালত এখনও কারাগারই।
বিচার শেষ হয়। তোমাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়।
চার.
তুমি চালকের সঙ্গে সাবলীল হিব্রুতে কথা বলো। তোমার চেহারা তোমার জাতিসত্তার কোনো পরিচয় দেয় না।
চালক জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় যাবেন, সাহেব?’
তুমি বলো, ‘মুতানাব্বি স্ট্রিট।’
তুমি নিজের জন্য এবং চালকের জন্য একটি সিগারেট ধরাও। মানুষটি ভদ্র।
হঠাৎ সে বলে, ‘বলুন তো, এই নোংরা পরিস্থিতি আর কতদিন চলবে? আমরা ক্লান্ত।’
তুমি ভাবো, সে হয়তো যুদ্ধের কথা বলছে। আয়কর বেড়ে যাওয়া, দুধের দাম, জীবনযাত্রার খরচ—এসব নিয়েও হয়তো তার ক্লান্তি।
তুমি বলো, ‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। আমরা সবাই ক্লান্ত।’
সে বলে, ‘কতদিন আমাদের রাষ্ট্র ওই নোংরা আরব নামগুলো রেখে দেবে? তাদের নাম, তাদের চিহ্ন—সব মুছে ফেলা উচিত।’
তুমি জিজ্ঞেস করো, ‘কারা?’
সে বিস্মিত হয়ে বলে, ‘আরবরা, অবশ্যই।’
‘কেন?’
‘কারণ তারা নোংরা’
তার উচ্চারণে তুমি বুঝতে পারো, সে মরক্কো থেকে আসা অভিবাসী।
তুমি জিজ্ঞেস করো, ‘আমি কি সত্যিই এত নোংরা? ধরুন, আপনি—আপনি কি আমার চেয়ে পরিষ্কার?’
সে হতবুদ্ধি।
‘আপনি কী বলতে চাইছেন?’
‘আপনার বুদ্ধিটা একটু ব্যবহার করুন।’
সে যেন তোমার প্রশ্নের অর্থই বুঝতে পারে না।
‘দয়া করে সিরিয়াস হোন’
তোমার পরিচয়পত্র দেখার পর সে নিশ্চিত হয়—তুমি আরব।
তখন সে বলে,
‘আমি খ্রিষ্টানদের কথা বলিনি। আমি মুসলমানদের কথা বলেছি।’
তুমি বলো,
‘আমি মুসলমান।’
সে আবার পিছু হটে।
‘আমি সব মুসলমানের কথা বলিনি। গ্রামের লোকদের কথা বলেছি।’
তুমি তাকে বলো, তুমি এমন একটি পশ্চাৎপদ গ্রামের মানুষ, যে গ্রাম তার রাষ্ট্র বুলডোজার দিয়ে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। মানচিত্র থেকেও মুছে দিয়েছে।
সে বলে,
‘রাষ্ট্রের জয় হোক!’
তুমি গাড়ি থেকে নেমে যাও। হেঁটে বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নাও। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার নামগুলো পড়তে শুরু করো। যেন নিজের শহরের স্মৃতি পরীক্ষা করছ। সত্যিই তারা নামগুলো বদলে দিয়েছে। সালাদিন হয়ে গেছে শ্লোমো।
তুমি অবাক হয়ে ভাবো, মুতানাব্বির নামটি তারা রেখে দিয়েছে কেন? তারপর প্রথমবার হিব্রুতে নামটি পড়ো। এটি মুতানাব্বি নয়। এটি ‘মাউন্ট নেবো’। তুমি এতদিন যে নামটিকে নিজের ইতিহাস ভেবেছিলে, অন্যের ভাষায় সেটিও অন্য কিছু। নামেরও কি নির্বাসন হয়?
মানুষের মতো?
পাঁচ
রাজনীতির দুঃখ কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যেতে তুমি বন্ধুকে একটি শুভেচ্ছা কার্ড পাঠাতে চাও।
হাইফার রাস্তায় বের হও। সমুদ্রের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা শহরটি—যার পা ভূমধ্যসাগরে, আর মুকুট আকাশে।
তুমি একটি সুন্দর কার্ড খুঁজছ। কিন্তু কোনো গোলাপ নেই। সমুদ্রের ছবি নেই। পাখি নেই। নারীর মুখ নেই। সবকিছুর জায়গা নিয়েছে ট্যাংক, বন্দুক, বিমান, বিলাপের দেয়াল, দখল করা শহর আর সুয়েজ খালের জল।
কখনো যদি জলপাইয়ের একটি ডাল চোখে পড়ে, দেখো—সেটি আঁকা হয়েছে একটি ফরাসি যুদ্ধবিমানের ডানায়। আর যদি কোনো সুন্দরী মেয়ের ছবি দেখো, তার শরীর অস্ত্রে ঢাকা। শহরের পেছনে সবসময় সৈনিকের বুট।
তোমার হৃদয় নেমে যায় মাটিতে।
তুমি ভিড়ের মধ্যে একটি সরু ফাঁক খুঁজে নাও। হাজার হাজার হাত রঙিন পোস্টকার্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ইতিহাসের পুনর্জন্মের কথা জানাতে, পৃথিবীর ইহুদিদের কাছে ফিরে যাওয়ার কিংবদন্তি পাঠাতে।
তুমি তোমার বন্ধুদের কিছুই পাঠাতে পারো না। শুধু হৃদয়ের নীরবতা। কিন্তু নীরবতারও তো ডাকঘর নেই। সে তোমার বন্ধুদের কাছে পৌঁছায় না।
হঠাৎ রাস্তার উৎসব তোমাকে ঘিরে ফেলে। আলো তোমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে—যেমন অন্ধকার কারাগার থেকে বের হওয়ার সময় আলো একদিন তোমার চোখে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল।
শিশুরা ছুটে বেড়ায়। তারা যেন কবুতর। কিন্তু তাদের শরীরেও অস্ত্রের ঝিলিক। খেলা এখন অস্ত্রের খেলা। আনন্দও অস্ত্রের।
আর তুমি?
তোমার শৈশব ও যৌবনে ছিল শুধু একটি কাঠের ঘোড়া।

পরিচিতি
মাহমুদ দারবিশ (১৯৪১–২০০৮) ছিলেন ফিলিস্তিনের অন্যতম প্রধান কবি এবং আধুনিক আরবি সাহিত্যের এক উজ্জ্বল কণ্ঠস্বর। তার কবিতায় দেশ, নির্বাসন, প্রেম, স্মৃতি, মৃত্যু ও মানুষের অস্তিত্ব—সবকিছু একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেছে। ফিলিস্তিনের ইতিহাস ও ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষত তার কবিতাকে দিয়েছে গভীর মানবিকতা ও রাজনৈতিক তাৎপর্য।
১৯৪১ সালে ফিলিস্তিনের আল-বিরওয়া গ্রামে তার জন্ম। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের সময় পরিবারসহ তিনি লেবাননে আশ্রয় নেন। পরে গোপনে ফিলিস্তিনে ফিরে এলেও তার পরিবার নিজ ভূমিতে আর আগের অবস্থান ফিরে পায়নি। কৈশোরেই কবিতা লেখা শুরু করেন। রাজনৈতিক সক্রিয়তার কারণে তাকে একাধিকবার আটক ও গৃহবন্দী করা হয়। পরবর্তী জীবনে বৈরুত, তিউনিস, প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে নির্বাসিত জীবন কাটাতে হয়েছে তাকে।
তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে অলিভ লিভস, এ লভার ফ্রম প্যালেস্টাইন, হোয়াই ডিড ইউ লিভ দ্য হর্স অ্যালোন? এবং মিউরাল । তার কবিতায় ‘দেশ’ কখনো শুধু একটি ভূখণ্ড নয়—এটি স্মৃতি, হারানো ঘর, ভাষা এবং মানুষের নিজের অস্তিত্বের আরেক নাম।
২০০৮ সালের ৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনে হৃদ্যন্ত্রের অস্ত্রোপচারের পর মাহমুদ দারবিশ মৃত্যুবরণ করেন। তার কবিতা আজও ফিলিস্তিনি অভিজ্ঞতার পাশাপাশি নির্বাসিত মানুষের সার্বজনীন বেদনা ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার ভাষা হয়ে আছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









