চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জাতিসংঘে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়েছেন এবং হোয়াইট হাউসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ব মঞ্চে নিজের অবস্থান আরও শক্ত করা। কিন্তু বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, এসব কূটনৈতিক তৎপরতা সত্ত্বেও ট্রাম্পের সমস্যাগুলো এখনও কাটেনি—দেশে ও বিদেশে দুই দিকেই।
ওয়াশিংটন থেকে পাওয়া খবরে জানা যায়, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে, যার কারণে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবং ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে। একই সঙ্গে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কেও চিড় ধরছে, আর প্রযুক্তি খাতে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে।
নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পাওয়ায় ট্রাম্প এখন বিশ্বনেতাদের কাছ থেকে প্রতিরোধের মুখে পড়ছেন—মধ্যপ্রাচ্য সংকট থেকে শুরু করে ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ পর্যন্ত নানা বিষয়ে। মনে হচ্ছে, তার পররাষ্ট্রনীতি এখন থমকে গেছে। নভেম্বরে হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে, যা তাকে রাজনৈতিকভাবে আরও চাপে ফেলতে পারে।
তা সত্ত্বেও মঙ্গলবার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন, গত বছর ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে তিনি যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার নিয়মকানুন কীভাবে ওলটপালট করে দিয়েছেন।
শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য গড়া এই আন্তর্জাতিক সংস্থার মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি নতুন করে হুমকি দেন, ইরান যদি চুক্তিতে রাজি না হয় তবে দেশটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে।
ভেনেজুয়েলার প্রতি তার কঠোর নীতির পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলেন, বিজয়ীরই সবকিছুর অধিকার। পাশাপাশি ইঙ্গিত দেন, আন্তর্জাতিক লক্ষ্য পূরণে সামরিক শক্তি প্রয়োগ তিনি আরও করতে পারেন।

শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে সীমিত ফল
এত কড়া অবস্থানের পরও বৃহস্পতিবার শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্পকে তুলনামূলক দুর্বল অবস্থানে দেখা গেছে। কারণ, ইরান সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি যখন চাপে, তখন চীনের বাণিজ্য বিশ্বজুড়ে বাড়ছে। শি জিনপিংয়ের এই সফরে আনুষ্ঠানিকতা ছিল অনেক, কিন্তু বাস্তব ফলাফল সামান্য। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বাণিজ্য, তাইওয়ান ও ইরান—এ সব জটিল বিষয় আলোচনায় থাকলেও মূল অর্জন বলতে ছিল দুই মাসের জন্য বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানো, যা নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
প্রকাশ্যে দুই পক্ষের মতভেদ নিয়ে ট্রাম্প তেমন আগ্রহ দেখাননি। তবে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বন্ধ দরজার আড়ালে শি জিনপিং তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করতে ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছেন।
চীনের দাবি করা এই গণতান্ত্রিক দ্বীপটি ওয়াশিংটন-বেইজিং সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয় হয়েই আছে।
ট্রাম্পের এই নমনীয় ভঙ্গি আগের কঠোর শুল্কনীতির তুলনায় বেশ আলাদা। এর একটি কারণ, প্রযুক্তি ও গাড়ি শিল্পের জন্য জরুরি কাঁচামাল বিরল মৃত্তিকা খনিজের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ, যা প্রতিশোধ হিসেবে আটকে দেওয়ার সক্ষমতা বেইজিং আগেই দেখিয়েছে।
সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক ব্রেট ব্রুয়েন বলেন, ট্রাম্প নিজেকে এমন একটি বিশ্বে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চান, যেখানে শক্তিই সঠিকতার মাপকাঠি। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, শি জিনপিং ও ক্রমবর্ধমান চীনা শক্তির সামনে এসে তিনি অনেকটাই নমনীয় হয়ে পড়েন।
রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা অবশ্য বলেছেন, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি থমকে গেছে—এই ধারণা ঠিক নয়।
তার মতে, জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় নিজের সাফল্যগুলোই তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে আছে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকিয়ে রাখা। যদিও তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে অচলাবস্থা
ট্রাম্পের ব্যস্ত কূটনৈতিক সপ্তাহের ওপর সবচেয়ে বড় ছায়া ছিল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ। ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথভাবে এই যুদ্ধ শুরু করেছিলেন ট্রাম্প। প্রায় সাত মাস ধরে চলা সংঘাত এরই মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটিয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। সর্বশেষ ইয়েমেন ও লোহিত সাগরের নৌপথও এই সংঘাতের প্রভাবের মধ্যে পড়েছে।
ইরানের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও তেহরান পিছু না হটায় বিষয়টি ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অন্যতম জটিল পররাষ্ট্রনীতি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প ইরানে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন এবং বলেন, ‘আমেরিকা ফিরে এসেছে’—আরও শক্তিশালী হয়ে।
তবে দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে গাজায় যুদ্ধবিরতি এবং ভেনেজুয়েলার নেতাকে আটক করার মতো কয়েকটি সাফল্যের পর এখন ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে অচলাবস্থার বিষয়টি বেশি সামনে আসছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও মতভেদ রয়েছে। এর প্রভাব নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ওপর পড়তে পারে। ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা দলটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মিত্রদের মধ্যেও বাড়ছে আপত্তি
যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ইউরোপীয় ও এশীয় মিত্রই ইরানের সঙ্গে ট্রাম্প শুরু করা যুদ্ধে সহায়তার জন্য তার আহ্বানে সাড়া দেয়নি। জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনেও কয়েকটি দেশের নেতা ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করেছেন, যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সরাসরি তার নাম উল্লেখ করেননি।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বিশ্বকে আবারও ‘জঙ্গলের আইনে’ ফিরে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেন। তিনি বলেন, ‘‘বিশ্ব এখন এমন এক ব্যবস্থার মধ্যে বেছে নেওয়ার অবস্থায় আছে, যেখানে শক্তি ও চাপ প্রয়োগই নিয়ামক হবে, অথবা এমন একটি ‘সভ্য আন্তর্জাতিক সমাজ’ গড়ে উঠবে যেখানে নিয়মের ভিত্তিতে সম্পর্ক পরিচালিত হবে।’’
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাও তার দেশের নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘‘অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্র ও অর্থের প্রবাহ বন্ধ করতে সহযোগিতা দরকার; জলসীমায় বিমানবাহী রণতরীর টহল প্রয়োজন নেই।’’
হোয়াইট হাউসের ওই কর্মকর্তা অবশ্য বলেন, ট্রাম্প অন্য নেতাদের সামনে নিজেকে জাহির করার চেয়ে ফলাফল অর্জনেই বেশি গুরুত্ব দেন। তার দাবি, অনেক নেতা প্রকাশ্যে যা বলেন, ব্যক্তিগত বৈঠকে তাদের অবস্থান সবসময় তা নয়।
ট্রাম্পকে ‘না’ বলছে আরও বেশি দেশ
ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে অন্তত জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে একটি সীমিত যুদ্ধবিরতি করানোর জন্য ট্রাম্পের প্রচেষ্টাও খুব বেশি অগ্রগতি পায়নি।
গ্রিনল্যান্ডে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর বিষয়ে ডেনমার্কের সঙ্গে একটি সমঝোতার কথাও ট্রাম্প তুলে ধরেছেন। তবে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়ে তার আগের দাবি এবং প্রয়োজনে ন্যাটোর সদস্য ডেনমার্কের কাছ থেকে শক্তি প্রয়োগ করে ভূখণ্ডটি নেওয়ার হুমকির তুলনায় এই সমঝোতা অনেক সীমিত।
ইউরেশিয়া গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ইয়ান ব্রেমার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এক বছর আগে খুব কম দেশই ট্রাম্পের বিরোধিতা করার সাহস দেখাত। এখন কানাডা, ইউরোপ, চীন, ইরান ও রাশিয়াসহ আরও অনেক দেশ তাঁকে ‘না’ বলতে বেশি আগ্রহী।
ট্রাম্পের নিজের বক্তব্যেও শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁর প্রভাব কতটা—সে প্রশ্নের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জাতিসংঘে ভাষণের সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ নামে পরিচিত করার প্রস্তাব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দেখা যাক আমার কতটা ক্ষমতা আছে। হয়তো আছে, হয়তো নেই। খুব শিগগিরই আমরা তা জানতে পারব।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









