ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম মঙ্গলবার দেশের গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোর ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে কয়েক দশকের বেসরকারিকরণের ধারা উল্টে দিয়ে ব্রিটেনকে নতুন করে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছেন তিনি। লেবার পার্টির বার্ষিক সম্মেলনে দলের নেতা হিসেবে দেওয়া প্রথম ভাষণে আবেগাপ্লুত বার্নহাম এসব কথা বলেন।
লিভারপুল থেকে এএফপি জানায়, ৫৬ বছর বয়সী সাবেক ম্যানচেস্টার মেয়র বার্নহাম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ১০ সপ্তাহের মাথায় দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টার ভাষণে তার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
এ সময় প্রয়াত বাবার কথা বলতে গিয়ে কয়েকবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তার পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বিনামূল্যে সামাজিক সেবা চালু, ব্রিটেনের নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার এবং বিতর্কিতভাবে পেনশন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা।
লিভারপুলে কানায় কানায় পূর্ণ সম্মেলনকক্ষে উপস্থিত দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বার্নহাম বলেন, ‘আমি স্বীকার করছি, এর প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গে সবাই একমত হবেন না। তবে আমি বিশ্বাস করি, এটি ব্রিটেনকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করতে পারে।’
ভাষণের একপর্যায়ে তিনি কান্না সামলে কিছুক্ষণ থামেন। এরপর এ মাসের শুরুতে আলঝেইমার রোগে মারা যাওয়া বাবার কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘আমি এই দায়িত্বকে এমন একটি ব্রিটেন গড়তে কাজে লাগাব, যেমনটি আমার বাবা দেখতে চেয়েছিলেন। আর এটিকে একসঙ্গে ধরে রাখতে আমার সর্বস্ব দিয়ে লড়াই করব।’
এরপর অসুস্থতা বা প্রতিবন্ধকতার কারণে দৈনন্দিন জীবনযাপনে সহায়তা প্রয়োজন এমন ইংল্যান্ডের মানুষের জন্য বিনামূল্যে সামাজিক সেবা চালুর পরিকল্পনার পক্ষে আবেগঘন বক্তব্য দেন তিনি।
বার্নহাম বলেন, ‘আমি স্বীকার করছি, এর জন্য আমাকে রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। কিন্তু কাউকে না কাউকে কঠিন বাধা অতিক্রম করে এই পরিবর্তন আনতেই হবে।’
নতুন ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে সম্ভাব্য কঠিন পরিস্থিতির কথাও স্বীকার করেন তিনি।
জুলাইয়ে এমপিরা বার্নহামকে ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়ে আসার পর কেন্দ্র-বামপন্থী লেবার পার্টিতে নতুন উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কিয়ার স্টারমারের দুই বছরের প্রধানমন্ত্রিত্বের অবসান ঘটে। স্টারমারের মেয়াদে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ নীতিগত ভুল ও দলীয় কোন্দল ছিল বলে এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে দেশের পুনঃশিল্পায়ন, রাস্তায় বসবাসকারীদের সংখ্যা কমিয়ে আনা এবং হাজার হাজার নতুন কাউন্সিল বাড়ি নির্মাণসহ উচ্চাভিলাষী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে অর্থের সংস্থান কীভাবে করবেন, তা স্পষ্ট করার জন্য বার্নহামের ওপর চাপ রয়েছে।
এদিকে ইউরোপের অনেক দেশের মতো ব্রিটেনের অর্থনীতিও দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও ঋণ নেওয়ার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধের কারণে জ্বালানির উচ্চমূল্য ব্রিটিশ নাগরিকদের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
ন্যাটোর প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা খাতে অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন পাউন্ডের সংস্থানও করতে হবে প্রধানমন্ত্রীকে।
ভাষণে বার্নহাম লেবার পার্টির এমপি ও কর্মীদের বলেন, আবাসন, জ্বালানি ও পানির ওপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় নেতাদের আরও ক্ষমতা দেওয়া হলে তা ব্রিটেনের দুর্বল অর্থনীতিকে চাঙা করতে সহায়তা করবে।
তিনি বলেন, ‘আমি গত ৪০ বছরের ধারা থেকে বেরিয়ে ব্রিটেনকে একটি নতুন পথে নিয়ে যাব, একটি নতুন অর্থনীতি ও নতুন রাজনীতি গড়ে তুলব।’
এক দশকের মধ্যে ব্রিটেনের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী বার্নহাম বলেন, তার সরকার শিগগিরই একটি বিল আনবে, যার মাধ্যমে ১৯৭৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকা মার্গারেট থ্যাচারের পানির কোম্পানিগুলোর সরকারি মালিকানার ওপর ‘আদর্শগত নিষেধাজ্ঞা’ বাতিল করা হবে।
বার্নহাম ‘ন্যাশনাল কেয়ার সার্ভিস’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন, যার আওতায় সেবা গ্রহণের সময় কোনো অর্থ দিতে হবে না। তবে ২০২৯ সালে অনুষ্ঠেয় বলে প্রত্যাশিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগে এটি চালু হবে না।
ব্যবসায়ী রালিতসা ভাসিলভস্কা, ৩৯, এএফপিকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে আমি সবসময় এমন কথাই শুনতে চেয়েছি। এতটা সৎ, এতটা উদ্যমী—জনপ্রিয় নয় এমন কথাও তিনি বলছেন।’
হেলথ ফাউন্ডেশন নামে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসাব করে বলেছে, ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের আদলে সামাজিক সেবা ব্যবস্থা চালু করতে বছরে প্রায় ১৯ বিলিয়ন পাউন্ড (২৫ বিলিয়ন ডলার) পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে।
এই পরিকল্পনার অর্থ সংস্থানের জন্য পরবর্তী নির্বাচনে পেনশন বৃদ্ধির পদ্ধতি পরিবর্তনের পক্ষে প্রচার চালাবেন বলে জানিয়েছেন বার্নহাম। ডানপন্থী দলগুলো তাৎক্ষণিকভাবে এই উদ্যোগকে প্রবীণদের ওপর আক্রমণ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
অভিবাসনবিরোধী রিফর্ম ইউকে পার্টির নেতা নাইজেল ফারাজ বলেন, ‘অ্যান্ডি বার্নহাম সম্ভাব্যভাবে ট্রিপল লক বাতিল করলে তিনি ব্রিটিশ পেনশনভোগীদের প্রতি তার দায়িত্ব পরিত্যাগ করবেন।’
২০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে বার্নহাম আরও আশাবাদী সুরে কথা বলার চেষ্টা করছেন, যা তার জনবান্ধব ভাবমূর্তি আরও জোরদার করেছে।
লেবার পার্টির সম্মেলনের স্লোগান ‘আবার আশা’। গত দুই বছরের তুলনায় সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরাও বেশি আশাবাদী। ওই সময়ে বিভিন্ন নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে দলের ভেতরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ছিল।
তবে মঙ্গলবার প্রকাশিত নতুন ইউগভ জরিপে দেখা গেছে, ভোট দেওয়ার অভিপ্রায় প্রকাশকারী ২৫ শতাংশ উত্তরদাতা রিফর্ম পার্টিকে এবং ২৪ শতাংশ লেবার পার্টিকে সমর্থনের কথা বলেছেন।
উচ্চ জ্বালানি ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে ব্রিটেনের বিদ্যুৎ গ্রিডে বিনিয়োগের জন্য একটি নতুন সরকারি সংস্থা গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন বার্নহাম।
এ ছাড়া বছরের শেষ দিকে অনুষ্ঠেয় একটি পরিকল্পিত শীর্ষ সম্মেলনকে সামনে রেখে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিষয়ে ‘বিভিন্ন বিকল্প’ উপস্থাপনের কথা বলেছেন তিনি। ২০১৬ সালের বিতর্কিত গণভোটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত 'লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি করেছে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
৫৬ বছর ধরে লেবার পার্টির সম্মেলনে অংশ নেওয়া লরা পার্কার বার্নহামের ভাষণ সম্পর্কে বলেন, ‘আমার মতে এটি ছিল অসাধারণ। তিনি ভাষণে তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত ও অকৃত্রিম।’
ট্রেড ইউনিয়নকর্মী মার্গারেট গ্রিয়ার এএফপিকে বলেন, ‘আমার কাছে এটি সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক মনে হয়েছে। আমার মনে হয়েছে, তিনি হৃদয় থেকে কথা বলেছেন।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









