ব্রাজিলে ৪ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোট। এবার লড়াইয়ে আছেন ১২ প্রার্থী। কেউ বৈধ ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি না পেলে ২৫ অক্টোবর হবে দ্বিতীয় দফার ভোট। মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর ছেলে, সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর মধ্যে। সাম্প্রতিক জরিপে দুজনের সমর্থন প্রায় কাছাকাছি।
লুলা জিতলে এটি হবে তার চতুর্থ প্রেসিডেন্টের মেয়াদ। তার ওয়ার্কার্স পার্টি দীর্ঘদিন ধরে দারিদ্র্য কমানো ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। তবে দলটি দুর্নীতির কেলেঙ্কারিতেও জড়িয়েছে। ‘কার ওয়াশ’ দুর্নীতি তদন্তের সময় একটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে উপকূলীয় সম্পত্তি নেওয়ার অভিযোগে লুলা ১৮ মাস কারাগারে ছিলেন। পরে তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায় বাতিল হয়। তার উত্তরসূরি দিলমা রুসেফও ২০১৬ সালে বাজেট-সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে অভিশংসিত হন।
ফ্লাভিও বলসোনারো দাঁড়িয়ে আছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ওপর। তার বাবা জইর বলসোনারো ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে যাওয়ার পর ক্ষমতা ধরে রাখতে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের মামলায় ২৭ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন এবং বর্তমানে গৃহবন্দী। ফ্লাভিওর নীতিতে বেসরকারীকরণ, সরকারি ব্যয় কমানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর জোর রয়েছে।
দুই প্রার্থীর পার্থক্য অর্থনীতি ছাড়িয়ে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও পররাষ্ট্রনীতিতেও পৌঁছেছে। লুলা ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব ও নীতিনির্ধারণে কৌশলগত স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। নিম্ন আয়ের মানুষের আয়কর কমানো, ছয় দিনের কর্মসপ্তাহ ছোট করা এবং পুলিশব্যবস্থার সংস্কারের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। অন্যদিকে ফ্লাভিওর অবস্থান তুলনামূলকভাবে বাজারমুখী—বেসরকারি খাতের ভূমিকা বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয় কমানোর পক্ষে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পার্থক্য স্পষ্ট। লুলার সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পর্ক টানাপোড়েনপূর্ণ। ২০২৫ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রাজিলের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন এবং জইর বলসোনারোর বিরুদ্ধে চলা বিচারকে ‘উইচ-হান্ট’ বলে আখ্যা দেন। ফ্লাভিও বরং তার বাবার মতোই ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পক্ষে।
এ কারণেই ব্রাজিলের এই নির্বাচন শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার পালাবদরের প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। চীন ব্রাজিলের প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। একই সঙ্গে ব্রাজিলের হাতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও বিরল মৃত্তিকার মজুত—যে সম্পদ নিয়ে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের প্রতিযোগিতা ক্রমেই বাড়ছে।
ব্রুকিংসের অর্থনীতিবিদ এবং ব্রাজিলের সাবেক আইএমএফ কর্মকর্তা ওতাভিয়ানো কানুতোর মতে, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের কারণে ব্রাজিল যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ফ্লাভিও ক্ষমতায় এলে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে ব্রাজিলের ঘনিষ্ঠতা বাড়তে পারে। আর লুলা ক্ষমতায় থাকলে চীনের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় থাকার সম্ভাবনা বেশি।
ব্রাজিলের সাবেক ব্রিকস নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট পাওলো নোগেইরা বাতিস্তা জুনিয়রও মনে করেন, নির্বাচনের ফল চীনের সঙ্গে ব্রাজিলের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। কারণ চীন শুধু প্রধান বাণিজ্য অংশীদার নয়, ব্রাজিলের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজারও।

এর ওপর আছে দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক চাপ। আগস্টে ব্রাজিলের সরকারি ঋণ জিডিপির ৮২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বাজেট ঘাটতি ৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৪ শতাংশের ওপরে এবং চলতি বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও কমেছে। ফলে যে-ই ক্ষমতায় আসুন, তাকে সরকারি অর্থব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরানোর পথ দেখাতে হবে।
তবে অর্থনীতির ছবিটি পুরোপুরি অন্ধকার নয়। ইরান যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় তেল রপ্তানিকারক ব্রাজিল বাণিজ্যিকভাবে কিছুটা লাভবান হয়েছে। কিন্তু সেই একই কারণে দেশের অভ্যন্তরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কাজ কঠিন হয়েছে।
ব্রাজিলের ১০ বছর মেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদ এখন প্রায় ১৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। উচ্চ সুদের পেছনে মূল্যস্ফীতি ও সরকারি অর্থব্যবস্থার দুর্বলতা বড় কারণ। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, ঋণের বোঝা বাড়তে থাকলে সরকারকে আরও বেশি সুদ দিতে হবে এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।
এখানেও সামনে কঠিন ভারসাম্যের প্রশ্ন। অর্থনীতিবিদ বাতিস্তা জুনিয়র সতর্ক করেছেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম বছরেই যদি ব্যাপক ব্যয়সংকোচনের পথে যায়, তাহলে দুর্বল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও সংকুচিত হতে পারে। চলতি বছর ব্রাজিলের প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের নিচে নেমে আসার পূর্বাভাস রয়েছে।
তাই ৪ অক্টোবরের ভোট শুধু প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোট নয়। এর মধ্য দিয়ে ব্রাজিলের অর্থনৈতিক নীতি, সরকারি ব্যয়ের ভবিষ্যৎ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক দক্ষিণে দেশটির অবস্থানের দিকও নির্ধারিত হবে। ভোটের ফলের প্রভাব ব্রাজিলের সীমানা পেরিয়ে লাতিন আমেরিকার বৃহত্তর ভূরাজনীতিতেও পড়তে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









