জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ঝড়ের গতির সফরটি যেন একটি বিষয়ই স্পষ্ট করে দিল—ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এখন প্রায় সর্বত্রই একঘরে। এমনকি তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রদের কাছেও তিনি ক্রমে বোঝা হয়ে উঠছেন।
জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর ভাষণের সময় ৭৭টি দেশের প্রতিনিধিরা সভাকক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যান। তাদের আপত্তি ছিল, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) কাঙ্ক্ষিত একজন ব্যক্তিকে কেন বিশ্বের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক মঞ্চে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
তবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে মঞ্চের বাইরে। নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন মাত্র আট ঘণ্টা। এরপরই ইসরায়েলে ফিরে যান। এমন তাড়াহুড়ো তার নিজের ইচ্ছায় হয়েছিল বলে মনে করা কঠিন। হোয়াইট হাউসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার সেই বহুল প্রচারিত সাক্ষাৎ হয়নি। এমনকি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গেও দেখা করার সুযোগ পাননি তিনি। মার্কিন কংগ্রেসেও ভাষণ দেওয়ার আমন্ত্রণ আসেনি। ফলে সেখানে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়া আইনপ্রণেতাদের পুরোনো দৃশ্যও দেখা গেল না।
ওয়াশিংটনে ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেন রয়টার্সকে বলেছেন, তিনি এমন সময়ের কথা মনে করতে পারেন না যখন ইসরায়েলের কোনো প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করেননি। নেতানিয়াহুর এই উপেক্ষা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিনপিংয়ের অভ্যর্থনার সঙ্গে তুলনা করলে। তাকে বিমানবন্দরে নিজে গিয়ে স্বাগত জানান ট্রাম্প। ছিল লালগালিচা এবং সামরিক বিমানের বিশেষ প্রদর্শন।
সতর্কবার্তা উপেক্ষা
জাতিসংঘে নেতানিয়াহুর সফর দুই পক্ষই নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছে। ইসরায়েলি নেতৃত্ব চেয়েছে তাকে এখনও শক্তিশালী নেতা হিসেবে দেখাতে। পশ্চিমা নেতারা চাইছেন ঠিক তার উল্টো ছবি তুলে ধরতে—নেতানিয়াহু এখন ব্যর্থ, তার সময় শেষ, ইসরায়েলের জন্য তাকে সরিয়ে দেওয়াই ভালো। নেতানিয়াহুর সামনে আরও একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা। এক মাস পর ইসরায়েলে সাধারণ নির্বাচন। এবার তাঁর রাজনৈতিক জীবনে প্রথমবারের মতো ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ঠেকাতে তাঁর ব্যর্থতা বড় নির্বাচনী প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাসের ওই হামলার আগে মিসর ও উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা নেতানিয়াহুকে গাজা থেকে আসতে থাকা বড় ধরনের হামলার ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। কেউ কেউ একে ‘ভূমিকম্প’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। কিন্তু সেই সতর্কবার্তার পরও তিনি যথেষ্ট ব্যবস্থা নেননি—এমন অভিযোগ এখন নতুন করে সামনে এসেছে।
নেতানিয়াহু জাতিসংঘে ভাষণের সময়ও বেছে নিয়েছিলেন এমনভাবে, যাতে ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি মানুষ তা দেখতে পারে। তিনি অন্য বিশ্বনেতাদের ‘নৈতিক কাপুরুষ’ ও ‘ভণ্ড’ বলে আক্রমণ করেন। ইসরায়েলি বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, ভাষণে তিনি এমন একটি বাইবেলীয় শব্দবন্ধও ব্যবহার করেছেন, যার ভেতরে ইসরায়েলি দর্শকদের জন্য একটি রাজনৈতিক সংকেত লুকিয়ে ছিল—যুদ্ধ ও ধ্বংসকে শেষ সীমা পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার আহ্বান।
নেতানিয়াহুর লক্ষ্য ছিল ভোটারদের বোঝানো—বিশ্বের বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনিই সেই নেতা, যিনি ইসরায়েলকে নিরাপদ রাখতে পারেন। বিশ্ব তার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও তিনি এখনও শক্তিশালী। পশ্চিমা নেতাদের উদ্দেশ্য ছিল বিপরীত। তারা ইসরায়েলিদের বোঝাতে চাইছেন—নেতানিয়াহু আর আগের মতো শক্তিশালী নন। তিনি অনেক দূর চলে গেছেন। এখন তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার সময়। কিন্তু এখানেই সমস্যা। নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক খেলোয়াড়দের একজন। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদে আছেন—এমনকি দেশটির প্রতিষ্ঠাতা নেতা ডেভিড বেন-গুরিয়নের চেয়েও বেশি সময়। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ইসরায়েলি সমাজের বড় একটি অংশকে ক্রমেই আরও উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দিকে ঠেলে দিয়েছেন।
নেতানিয়াহু এখন রাজনৈতিক বোঝা
পশ্চিমা রাজধানীগুলোর নেতানিয়াহু বিরোধিতা ইসরায়েলের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের নৈতিক মূল্যায়ন থেকে এসেছে—এমন ভাবার কারণ নেই। গাজায় দীর্ঘদিনের ধ্বংসযজ্ঞ, পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতির বিস্তার, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ, দক্ষিণ লেবাননে হামলা এবং ইরানের বিরুদ্ধে বিপর্যয়কর যুদ্ধ—এসবের কোনোটিই পশ্চিমা সরকারগুলোকে এতদিন ইসরায়েল থেকে দূরে সরায়নি। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য এবং কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে ইসরায়েলকে সহযোগিতা করেছে।
সমস্যা হলো, নেতানিয়াহু এখন রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছেন। ট্রাম্পের নিজের জনপ্রিয়তাও দ্রুত কমছে। ফলে তার একজন দায়ী ব্যক্তি দরকার। নেতানিয়াহু সেই ভূমিকায় সবচেয়ে সুবিধাজনক প্রার্থী। এর পেছনে ব্যক্তিগত ক্ষোভও আছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নেতানিয়াহু মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের আপত্তি উপেক্ষা করে ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে রাজি করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
ট্রাম্পকে বোঝানো হয়েছিল—ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত বিজয় তাকে ইতিহাসে এমন প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে, যিনি মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলে দিয়েছেন। ইরানকে নিষ্ক্রিয় করা গেলে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসম্পদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণও আরও শক্তিশালী হবে। কিন্তু সেই হিসাব মেলেনি।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এখন ওয়াশিংটনের জন্য কঠিন এক ফাঁদে পরিণত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের প্রভাব কতটা শক্তিশালী, তা স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনে ইরানের মিত্র আনসার আল্লাহ বাব আল-মানদাব প্রণালিতেও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। দুটি পথই বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে জ্বালানির দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তার প্রভাব পড়ছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য এটি বড় রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছেও আরেকটি শিক্ষা পরিষ্কার হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি থাকলেও ইরান বা ইয়েমেন থেকে আসা প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে তাদের পুরোপুরি রক্ষা করার ক্ষমতা ওয়াশিংটনের নেই।
গাজার সত্য আর লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না তবে নেতানিয়াহুর ওপর চাপের কারণ শুধু ইরান যুদ্ধ নয়। গত তিন বছরে গাজায় যা ঘটেছে, সেটিও পশ্চিমা জনমতকে বদলে দিচ্ছে। বহু বছর ধরে রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের নানা স্তর চেষ্টা করেছে গাজার ধ্বংসযজ্ঞকে আড়াল করতে বা অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে। কিন্তু এখন তা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সংস্কৃতি ও জনপ্রিয় সংস্কৃতির জগতে পরিবর্তনটি স্পষ্ট।
ইসরায়েলি নির্মাতাদের তৈরি গাজা নিয়ে নতুন চলচ্চিত্র ‘নাজা’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে রেকর্ডসংখ্যক দীর্ঘ করতালি পেয়েছে। চলচ্চিত্রটিতে পরিচয় গোপন রাখা ইসরায়েলি সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা গাজায় সংঘটিত ধ্বংসযজ্ঞ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। আয়ারল্যান্ডের ফুটবল দলও গাজার প্রতি সংহতি জানিয়েছে। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে খেলায় তারা কালো বাহুবন্ধনী পরেছিল এবং প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে করমর্দন করেনি। অধিনায়ক দারা ও'শিয়া ম্যাচের পারিশ্রমিক গাজার মানবিক সহায়তায় দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সঙ্গীতজগতেও একই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গাজায় গণহত্যার বিরুদ্ধে কথা বলা র্যাপার ম্যাকলমোরের সঙ্গে প্রকাশ্যে দাঁড়াতে না পারায় এড শিরানও সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ইসরায়েলপন্থী প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চাপের মুখে ম্যাকলমোরকে সফর থেকে বাদ দেওয়া হলেও জনমতের প্রতিক্রিয়া শিরানকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। ব্রিটেনেও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন ও ডেভিড ল্যামির গাজার বিষয়ে ভূমিকা নিয়ে মূলধারার গণমাধ্যমে এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রশ্ন উঠছে।
পশ্চিমা বিশ্ব কথার দিক বদলাচ্ছে
পশ্চিমা সরকারগুলো বুঝতে পারছে, গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে মানুষের ক্ষোভ আর সহজে থামানো যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রে জুলাইয়ের এক জরিপে ৬২ শতাংশ মানুষ নেতানিয়াহু সরকারের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। এমনকি মার্কিন ইহুদিদের মধ্যেও বড় একটি অংশ তাকে আগামী নির্বাচনে ক্ষমতার বাইরে দেখতে চান। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমা নেতারা এখন আলোচনার কেন্দ্র বদলাতে চাইছেন। গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের জন্য নেতানিয়াহুকে দায়ী করা তুলনামূলক সহজ। কারণ এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিজেদের ভূমিকার প্রশ্নটি আড়ালে রাখা যায়।
তাই মনোযোগ সরানো হচ্ছে পশ্চিম তীরে। সেখানে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ে পশ্চিমা নেতারা এখন বেশি সরব। ব্রিটেনসহ ১২টি পশ্চিমা দেশ পশ্চিম তীরের অবৈধ ইসরায়েলি বসতির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার কথা ঘোষণা করেছে। ব্রিটেনের নতুন সরকার এমনকি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘জাতিগত নির্মূল’ বলেও উল্লেখ করেছে। কিন্তু এখানেও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন আছে। গাজায় আরও ব্যাপক উচ্ছেদ ও ধ্বংসের ক্ষেত্রে একই ভাষা ব্যবহার করতে পশ্চিমা সরকারগুলো এত সতর্ক কেন?
আরেকটি প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ—নেতানিয়াহুকে সরিয়ে দিলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
নেতানিয়াহু কি আসল সমস্যা?
পশ্চিমা রাজনীতিকদের নতুন বয়ান যেন এমন—সমস্যার নাম নেতানিয়াহু। তাকে সরিয়ে দিলে ইসরায়েল আবার স্বাভাবিক পথে ফিরবে। নতুন কোনো নেতা আসবেন, যাঁর সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলো বসতে পারবে এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের দিকে এগোতে পারবে।
কিন্তু ইতিহাস এত সরল নয়। ইসরায়েলে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও বসতি সম্প্রসারণ নেতানিয়াহুর আবিষ্কার নয়। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে একের পর এক ইসরায়েলি সরকার পশ্চিম তীরে বসতি বাড়িয়েছে। ফিলিস্তিনিদের জমি দখল ও উচ্ছেদ সেই দীর্ঘ নীতিরই অংশ। নেতানিয়াহু হয়তো সেই প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করেছেন। কিন্তু তিনি একা এর স্রষ্টা নন। বরং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর আন্তর্জাতিক সহানুভূতির সুযোগ নিয়ে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ আরও ত্বরান্বিত হয়েছে। আর এখানেই পশ্চিমা বয়ানের সীমাবদ্ধতা। নেতানিয়াহুকে সমস্যার একমাত্র মুখ বানালে বহু দশকের রাষ্ট্রীয় নীতি, পশ্চিমা সমর্থন এবং রাজনৈতিক দায়—সবই আড়ালে চলে যায়।
বিভ্রান্তির রাজনীতি
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম জাতিসংঘে বলেছেন, রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। দুই রাষ্ট্রের সমাধানের কথা শুধু বললে হবে না; কথার সঙ্গে কাজও থাকতে হবে।
কথাটি সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই আস্থার সংকট তৈরি করেছে কে? ব্রিটেনসহ পশ্চিমা সরকারগুলো বছরের পর বছর ইসরায়েলকে সমর্থন করেছে। গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চলার সময়ও তারা অস্ত্র, গোয়েন্দা সহায়তা ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। এমনকি গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের কেউ কেউ সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। অন্যদিকে এখন একই রাজনীতিকেরা বলছেন, যারা গাজার ধ্বংসের বিরুদ্ধে কথা বলেছিল, তারা ‘সঠিক ছিল’।
এ যেন একই সঙ্গে দুই দিকে হাঁটার চেষ্টা। একদিকে জনগণের ক্ষোভকে স্বীকার করা, অন্যদিকে সেই ক্ষোভের রাজনৈতিক কারণগুলো বদলানোর কোনো বাস্তব পদক্ষেপ না নেওয়া। এটাই পশ্চিমা রাজনীতির নতুন নাটক—বিভ্রান্তির নাটক।
‘আপনারা ঠিক ছিলেন’, ‘আমরা আপনাদের কষ্ট বুঝি’, ‘আমরা নিষেধাজ্ঞা দেব’, ‘দুই রাষ্ট্রের সমাধান চাই’—এই ঘোষণাগুলো জনরোষকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা বলেই মনে হয়। ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের নীতির দায় থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে সবকিছুর দায় নেতানিয়াহুর ওপর চাপানো হচ্ছে।
আবার আগের মতো?
কিন্তু নেতানিয়াহুকে সরিয়ে দিলেই কি ইসরায়েল বদলে যাবে? ইসরায়েলের মূলধারার প্রায় পুরো জায়নবাদী রাজনৈতিক পরিসরই ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে একই কঠোর কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করছে। গাজা ধ্বংসের গত তিন বছরে খুব কম রাজনৈতিক নেতা সেই রাষ্ট্রীয় নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।
এমনকি ইসরায়েলের নিজস্ব ফিলিস্তিনি নাগরিকদেরও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সীমিত করার চেষ্টা চলছে। দেশের জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জনগোষ্ঠীকে প্রতিনিধিত্বকারী কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তাহলে আগামী নির্বাচনে নেতানিয়াহু হারলেও কী বদলাবে? সম্ভবত খুব বেশি কিছু নয়। পশ্চিমা নেতারাও তা জানেন। ট্রাম্প জানেন, ব্রিটেনের নেতারা জানেন, ইউরোপের নেতারাও জানেন। তাদের আসল লক্ষ্য হয়তো ইসরায়েলে মৌলিক পরিবর্তন আনা নয়। বরং নেতানিয়াহুকে সরিয়ে এমন একটি নেতৃত্ব ফিরিয়ে আনা, যার সঙ্গে আবার আগের মতো সহজে কাজ করা যায়। অর্থাৎ গাজার ধ্বংসযজ্ঞের পর ইসরায়েলের সঙ্গে পশ্চিমের সম্পর্ককে নতুন করে সাজানো—কিন্তু পুরোনো কাঠামো না বদলে।
সেই পুরোনো কাঠামোয় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতা হয়তো একটু ধীর হবে, একটু কম দৃশ্যমান হবে, আন্তর্জাতিক ভাষায় তাকে অন্য নামে ডাকা হবে। কিন্তু জমি দখল, বসতি সম্প্রসারণ ও উচ্ছেদের রাজনীতি থেকে যাবে। গাজাকে আবারও একটি বিচ্ছিন্ন অধ্যায় হিসেবে দেখানো হবে—একজন নেতার ভয়াবহ ভুলের ফল হিসেবে। তারপর সামনে আসবে পুনর্গঠন, বিনিয়োগ, আবাসন প্রকল্প এবং বহুদিনের প্রতিশ্রুত ‘দুই রাষ্ট্রের সমাধান’।
কিন্তু অতীতের হিসাব তখন কোথায় যাবে? গাজায় ধ্বংস হওয়া দুই মিলিয়নের বেশি মানুষের ঘরবাড়ি, পশ্চিম তীরে উচ্ছেদ হওয়া পরিবার, এবং সেই ধ্বংসযজ্ঞে ব্যবহৃত অস্ত্র ও গোয়েন্দা সহায়তার জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর দায়—এসব প্রশ্ন যদি আড়ালে চলে যায়, তাহলে নেতানিয়াহুকে সরানো কেবল রাজনৈতিক মুখ বদল হবে।
আর সেই কারণেই আজকের আসল লড়াই শুধু নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নয়। প্রশ্ন হলো, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সম্পর্কের সেই পুরোনো কাঠামো আদৌ বদলাবে কি না। পশ্চিমা শক্তিগুলো যদি সত্যিই পরিবর্তন চায়, তবে তাদের সামনে পথ একটাই—শুধু একজন নেতাকে সরানো নয়, বরং যে রাজনীতিকে এতদিন তারা সমর্থন করেছে, তার দায়ও স্বীকার করা।
অন্যথায় নেতানিয়াহু চলে যাবেন, কিন্তু ব্যবস্থা থেকে যাবে। আর ফিলিস্তিনিদের জন্য সেই ব্যবস্থার অর্থ হবে—হয়তো একটু ধীর, একটু নীরব, কিন্তু একই পুরোনো বাস্তবতা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









