স্পেনে আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেস। ভোট হবে ২৯ নভেম্বর।
দেশের আবাসন সংকট নিয়ে জনরোষের মধ্যে তার সংখ্যালঘু সরকারের আনা জরুরি আইন ডানপন্থী দলগুলো সংসদে ভোটে নাকচ করে দেওয়ার তিন দিন পর এই ঘোষণা এল।
সোমবার সকালে টেলিভিশন ভাষণে সানচেস বলেন, এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা জনগণের। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন আগামী বছরের গ্রীষ্মের মধ্যে হওয়ার কথা ছিল। ২০১৮ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা সমাজতান্ত্রিক নেতা সানচেস আবারও নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাজি ধরলেন।
ভাষণে কী বললেন সানচেস
ভাষণে সানচেস তার সরকারের সামাজিক, পরিবেশগত ও মানবিক ক্ষেত্রের কাজের পক্ষে সাফাই গান। একই সঙ্গে স্বীকার করেন, সরকারের কিছু ভুলও হয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্ব এখন জটিল রূপান্তরের যুগে আছে। এ সময় জলবায়ু জরুরি অবস্থা, সামাজিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো বড় পরিবর্তন চলছে। এতে যেমন বড় বিপদ আছে, তেমনি সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বড় সম্ভাবনাও আছে। এই যুগে স্পেন ও স্পেনের মানুষ কী ভূমিকা নেবে, তা জনগণকেই ঠিক করতে হবে।
তার পুরোনো বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে সানচেস বলেন, লড়াইটা প্রগতিশীল সরকার আর এমন এক ডানপন্থী শক্তির মধ্যে, যারা স্বাধীনতা খর্ব করবে ও কষ্টে পাওয়া অগ্রগতি পিছিয়ে দেবে।
ভোটারদের তিনি প্রশ্ন করেন, তারা কি সেই চরম ডানপন্থী ঢেউয়ে শামিল হবেন, যা যেখানে ক্ষমতায় যায় সেখানেই অগ্রগতি উল্টে দেয়, নাকি স্পেনকে খোলামেলা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও পরিবেশ রক্ষার দুর্গ হিসেবে ধরে রাখবেন।
কেন ভেস্তে গেল আবাসন আইন
আবাসন সংকট মোকাবিলায় সরকার দুটি ডিক্রি এনেছিল। এতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত উচ্ছেদ নিষিদ্ধ করা এবং স্বল্পমেয়াদি ও কক্ষভিত্তিক ভাড়া নিয়ন্ত্রণের মতো নানা ব্যবস্থা ছিল।
শুক্রবার কংগ্রেসে রক্ষণশীল পিপলস পার্টি (পিপি), চরম ডানপন্থী ভক্স এবং ডানপন্থী কাতালান স্বাধীনতাপন্থী দল জুন্টস ভোট দিয়ে ডিক্রি দুটি নাকচ করে দেয়।
জরিপে এগিয়ে থাকা পিপি বলছে, সংকট সামলাতে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং নির্মাণই সবচেয়ে ভালো পথ। জাতীয় সরকার গঠনে দলটিকে ভক্সের সমর্থনের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
ভোটের পর কংগ্রেসের বাইরে জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীরা দুয়ো দেন এবং লজ্জা ও তোমাদের মুনাফা, আমাদের দুর্দশা বলে স্লোগান দেন।
বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া
আগাম নির্বাচনের খবরকে স্বাগত জানিয়েছে পিপি। দলটির নেতা আলবের্তো নুনেস ফেইখো বলেন, অবশেষে জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে।
তার ভাষায়, এটা আগের নির্বাচনের মতো নয়, এবার লক্ষ্য সানচেসকে হারানো।
ভক্সও সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। দলটি ইতিমধ্যে চারটি আঞ্চলিক সরকারে পিপির সঙ্গে ক্ষমতায় আছে। দলের নেতা সান্তিয়াগো আবাসকাল বলেন, আবাসন ও সরকারি সুবিধার ক্ষেত্রে স্প্যানিশরা যেন নিজের দেশে বৈষম্যের শিকার না হয়, সেটা নিশ্চিত করতেই তারা লড়বেন। তিনি রিমাইগ্রেশন বা অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে জোর দেওয়ার কথাও বলেন এবং অভিবাসনকে অভিবাসী আগ্রাসন বলে আখ্যা দেন।
উচ্ছেদে ক্ষোভের বিস্ফোরণ
বাড়িভাড়ার চড়া দাম ও অনিশ্চিত ভাড়াচুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ফেটে পড়ে গত মাসের শেষ দিকে। মাদ্রিদে ৭০ বছর ধরে বসবাস করা ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে তখন বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়।
তার অ্যাপার্টমেন্ট কেনা বিনিয়োগ তহবিল ২৩০ শতাংশ ভাড়া বাড়াতে চেয়েছিল, যা দেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব ছিল।
এই ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামেন। মাদ্রিদের কেন্দ্রীয় পুয়ের্তা দেল সোল চত্বরে ২০১১ সালের ইন্দিনিয়াদোস আন্দোলনের মতো বিশাল তাঁবুশিবির গড়ে ওঠে। সপ্তাহান্তে সারা দেশে বড় বড় বিক্ষোভ হয়।
শনিবার মাদ্রিদের সমাবেশে কর্তৃপক্ষের হিসাবে অংশ নেন ৭০ হাজার মানুষ, আয়োজকদের হিসাবে ৫ লাখ।
আবাসন ইস্যুতে ডানপন্থীদের বাধা সানচেসকে ভোটারদের সক্রিয় করতে সাহায্য করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সানচেসের সামনে কী কী চাপ
২০২৩ সালের অমীমাংসিত আগাম নির্বাচনের পর কাতালান স্বাধীনতাপন্থী দলগুলোর সঙ্গে বিতর্কিত সমঝোতা করে সানচেস ক্ষমতায় ফিরেছিলেন।
এরপর থেকে ক্ষুদ্র বামপন্থী জোট সুমারের সঙ্গে তার সংখ্যালঘু সরকার সংসদে অশান্ত সময় পার করছে।
২০২৩ সালের পর তিনি বাজেট পাস করাতে পারেননি। তার দল ও ঘনিষ্ঠ বৃত্ত দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত।
এ ছাড়া গ্রীষ্মে উত্তর আফ্রিকায় স্পেনের ছিটমহল সেউতায় গণ-অনুপ্রবেশ সামলানোর ধরন নিয়েও সরকার চাপে আছে। ওই ঘটনায় ৪৮ ঘণ্টায় প্রতিবেশী মরক্কো থেকে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ ওই এলাকায় ঢুকে পড়েছিলেন। আবাসন ইস্যু সেই সংকট থেকে কিছুটা নজর সরিয়েছে।
গত জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রীর ভাই ডেভিড সানচেসকে নয় বছরের জন্য সরকারি পদে নিষিদ্ধ করা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমের এক্সট্রেমাদুরা অঞ্চলে সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্বাধীন পরিষদে নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অনিয়মে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন।
অন্যদিকে দুই বছরের তদন্ত শেষে এক বিচারক সানচেসের স্ত্রী বেগোনিয়া গোমেসের বিরুদ্ধে তহবিল আত্মসাৎ, প্রভাব খাটানো, ব্যবসায়িক লেনদেনে দুর্নীতি ও অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগ গঠন করেছেন। তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
ডেভিড সানচেস ও বেগোনিয়া গোমেস দুজনই অন্যায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আগে বলেছেন, তার পরিবারকে হয়রানি ও হেনস্তা করতে রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের বিরোধীরা অভিযান চালাচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









