‘নোবেল পুরস্কার পাওয়ার অপেক্ষায় প্রতি অক্টোবরই বিষণ্ন হয়ে পড়তেন পদার্থবিদ ফ্রান্সিস হালজেন। এবার সেই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান হয়েছে। ৮২ বছর বয়সে নোবেল জয়ের পর তার সবচেয়ে বড় স্বস্তি—আর কোনো অক্টোবর তাঁকে ভাবতে হবে না, কেন তিনি পুরস্কারটি পেলেন না।’
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন–ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে হালজেন বলেন, “এটি আমার জন্য দারুণ স্বস্তির। যদিও পুরস্কারটি পাওয়া একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল না।” ইতালিতে একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে অংশ নিতে গিয়ে হোটেলকক্ষ থেকে ভিডিও সংযোগে তিনি সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন।
কথা বলতে গিয়ে নিজের দীর্ঘ অপেক্ষার কথাও মনে করলেন হালজেন। “বছরের এই সময়টায় আমি সব সময়ই বিষণ্ন হয়ে পড়তাম, কারণ পুরস্কারটি জিততে পারিনি। মনে হতো, আমার সহযোগীরা এর অনেক বেশি যোগ্য ছিলেন, আর প্রতি অক্টোবরেই যেন পুরো আইসকিউব দলের সবাইকে আমি হতাশ করছি,” বলেন তিনি। “সেই সমস্যার অবশেষে সমাধান হলো। এ জন্য আমি খুবই কৃতজ্ঞ।”
হালজেনের নোবেল পাওয়ার পেছনে রয়েছে এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক প্রকল্প—‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’। অ্যান্টার্কটিকার এক ঘনক কিলোমিটার বরফের গভীরে তৈরি এই বিশাল পর্যবেক্ষণকেন্দ্র মহাকাশ থেকে আসা নিউট্রিনো শনাক্ত করে।

নিউট্রিনো হলো এমন এক ধরনের অতিক্ষুদ্র কণা, যার ভর প্রায় নেই বললেই চলে এবং অন্য পদার্থের সঙ্গে খুব কমই মিথস্ক্রিয়া করে। এতটাই ক্ষীণ এই কণার উপস্থিতি যে প্রতি সেকেন্ডে সূর্য থেকে আসা প্রায় ৬৫ বিলিয়ন নিউট্রিনো আমাদের হাতের একটি ছোট নখের ওপর দিয়ে চলে যায়—আমরা টেরও পাই না। তবে মহাকাশের আরও দূর অঞ্চল থেকে আসা নিউট্রিনো বিজ্ঞানীদের কাছে অমূল্য। এগুলোর মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় ঘটনাগুলোর খবর—যেমন গ্যালাক্সির কেন্দ্রে থাকা অতিভারী কৃষ্ণগহ্বরের কার্যকলাপ।
বেলজিয়ামে বেড়ে ওঠা হালজেন একা এই কাজ করেননি। এক ডজনের বেশি দেশের প্রায় ৪৫০ বিজ্ঞানী ও গবেষক বছরের পর বছর তার সঙ্গে কাজ করেছেন। আশির দশকের শেষ দিকে যে ধারণা তিনি কল্পনা করেছিলেন, তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই তা বাস্তব রূপ পায়। নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাও বিশেষভাবে স্মরণ করেছেন হালজেন। তার ভাষায়, উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রকল্পটিতে “অবিশ্বাস্য ঝুঁকি” নিয়েছিল। কারণ আইসকিউব তৈরি করতে গিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পার হতে হয়েছে। প্রতিটি ধাপেই প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়ে যেতে পারত।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনও প্রকল্পটিকে অর্থায়ন করে বড় ধরনের ঝুঁকি নিয়েছিল বলে মনে করেন তিনি। “এখন পেছনে ফিরে তাকালে বিষয়টি আমাকে অবাক করে। আজকের দিনে এমন কিছু সম্ভব হতো কি না, আমি নিশ্চিত নই,” বলেন হালজেন। “কিন্তু তখন তা হয়েছিল। আমরা খুবই ভাগ্যবান ছিলাম।”
তার এই মন্তব্যের একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও আছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁটের প্রস্তাব দিয়েছে এবং মৌলিক গবেষণায় অর্থ দেওয়া এই প্রতিষ্ঠানকে প্রশাসনের প্রযুক্তিগত অগ্রাধিকারের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে বলেছে।
আইসকিউব তৈরির আগে বিজ্ঞানীরা জানতেন, নিউট্রিনো শনাক্ত করতে পানি ব্যবহার করা যায়। কোনো নিউট্রিনো যখন পরমাণুর কেন্দ্রকের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন একটি বৈদ্যুতিক আধানযুক্ত কণা তৈরি হতে পারে। সেই কণা নিউট্রিনোর প্রায় একই দিকে ছুটে গিয়ে নীল আলো তৈরি করে। পানি স্বচ্ছ হওয়ায় সেই আলো শনাক্ত করা সম্ভব। হালজেনের বড় ধারণাটি ছিল—পানির বদলে বরফ ব্যবহার করা। অ্যান্টার্কটিকার গভীর বরফে জীবন্ত প্রাণীর চলাচল নেই, ফলে সেখানে কোনো অপ্রত্যাশিত নড়াচড়া বা আলো-আঁধারির সমস্যা তৈরি হয় না। গভীর বরফের অন্ধকারও প্রায় স্থির।
তবে ধারণাটিকে বাস্তবে পরিণত করা মোটেই সহজ ছিল না। প্রকল্পের পরীক্ষামূলক পর্যায়ে প্রথমবার যখন নিউট্রিনোর ছবি পাওয়া গেল, সেটিই ছিল হালজেনের ভাষায় পুরো প্রকল্পের সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত।
“এটি ছিল অবিশ্বাস্য,” তিনি বলেন। “আমরা যে সত্যিই এটি করতে পারি—বিষয়টি ছিল সেটাই।”
২০১১ সাল থেকে আইসকিউব পুরোপুরি কাজ করছে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা দূরবর্তী একটি গ্যালাক্সির দিক থেকে আসা উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করেছেন। আমাদের নিজেদের গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ে থেকেও নিউট্রিনোর সন্ধান মিলেছে।
এখন সামনে আরও বড় প্রশ্ন—এই নতুন ‘মহাজাগতিক জানালা’ দিয়ে ভবিষ্যতে কী দেখা যাবে? হালজেনের উত্তর বেশ সংযত। মানবজাতি যখনই মহাবিশ্বকে দেখার নতুন কোনো পথ খুলেছে, তার পর কী আবিষ্কার হবে—তা নিয়ে করা পূর্বাভাস প্রায়ই ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
“এটি আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে, তা বলা অসম্ভব,” বলেন তিনি। “কিন্তু অতীতে এমন প্রতিটি নতুন জানালা দারুণ কিছু দেখিয়েছে। তাই এবারও দারুণ কিছু দেখাবে না—এমন ভাবার কোনো কারণ নেই।”
নোবেল পুরস্কারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসানের পর হালজেনের সামনে এখন তাই আরেক ধরনের অপেক্ষা—বরফের গভীরে ধরা পড়া পরবর্তী নিউট্রিনো বার্তাটির জন্য।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









