পাকিস্তানের পেশোয়ারে একটি বেসরকারি স্কুলের ছাদ ধসে ৩২ শিক্ষার্থী ও এক শিক্ষিকাসহ অন্তত ৩৩ জন নিহত হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সকালে শহরের আফ্রিদি আবাদ এলাকায় আল-খায়ের স্কুলে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত শিশুদের বয়স সাত থেকে ১৪ বছরের মধ্যে। আহত হয়েছে আরও অন্তত ২০ শিশু। তাদের বেশির ভাগকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া তিন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।
পেশোয়ারের লেডি রিডিং হাসপাতালের মুখপাত্র মুহাম্মদ আসিম জানান, প্রথমে ২৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেলেও পরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৩৩ হয়েছে। দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়।
উদ্ধারকারী সংস্থা রেসকিউ ১১২২-এর মুখপাত্র বিলাল আহমদ ফয়জির ভাষ্য অনুযায়ী, ওপরের একটি ছাদ ধসে নিচের ছাদের ওপর পড়ে। এতে নিচের শ্রেণিকক্ষটি চাপা পড়ে এবং শিশুরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে। উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে শিশুদের উদ্ধারে অভিযান শুরু করেন।
পেশোয়ারের ডেপুটি কমিশনার আফাক ওয়াজির জানান, উদ্ধারকাজ শেষ হয়েছে এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে আর কেউ আটকে নেই। দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে প্রাথমিকভাবে ভবনটির কাঠামোগত দুর্বলতার কথা বলেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা।
পেশোয়ারের ক্যাপিটাল সিটি পুলিশ কর্মকর্তা (সিসিপিও) ড. মিয়ান সাঈদ আহমদের মতে, দুর্বল কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত নির্মাণের ভার পড়ায় ছাদটি ধসে থাকতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তদন্ত চলছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে স্কুলে ছুটে আসা অভিভাবকদের কাছে উদ্ধারকাজের দৃশ্য ছিল ভয়াবহ।
সামিউল্লাহ নামের এক অভিভাবক ডন-কে বলেন, ‘‘খবর পেয়ে তিনি প্রায় ১০ মিনিটের মধ্যে স্কুলে পৌঁছান। তার ছয় সন্তান ওই স্কুলে পড়ত। ভবনটি দেখে প্রথমে তার মনে হয়েছিল, নিচতলার শ্রেণিকক্ষে থাকা ছেলেটিও হয়তো মারা গেছে। পরে জানতে পারেন, পানি পান করতে শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হওয়ায় সে বেঁচে গেছে।’’
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সোহেলের ভাষ্য, তার ভাগনি ভবন থেকে বেরিয়ে বাড়িতে গিয়ে দুর্ঘটনার খবর দিলে সবাই আতঙ্কিত হয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে তিনি ১০ থেকে ১৫ শিশুকে ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকতে দেখেন। দ্রুত তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন তারা।
তদন্ত ও নিরাপত্তা নিরীক্ষার নির্দেশ
দুর্ঘটনায় শিশুদের প্রাণহানিতে শোক প্রকাশ করেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এবং রাজনৈতিক নেতারা। প্রধানমন্ত্রী নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন চেয়েছেন তিনি।
খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দিও ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং প্রদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিরীক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। তার মতে, শিশুদের নিরাপত্তা কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। প্রাদেশিক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগ ঘটনার তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছে। বৃহস্পতিবারের মধ্যেই প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা কমিটির।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানিয়েছে, স্কুলটির মালিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফও দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
পাকিস্তানে সংস্থাটির প্রতিনিধি পার্নিল আয়রনসাইড বলেছেন, ‘‘নিহত শিশুদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানোর পাশাপাশি আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছে ইউনিসেফ।’’ ক্ষতিগ্রস্ত শিশু, পরিবার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে মানসিক সহায়তা দিতে সংস্থাটি প্রস্তুত বলেও জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি সব স্কুলের ভবনে নিরাপত্তার মানদণ্ড কার্যকর করা এবং নিয়মিত পরিদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
বারবার ঘটছে ভবনধস
পাকিস্তানে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী, দুর্বল কাঠামো এবং নিরাপত্তাবিধি না মানার কারণে ভবন ও ছাদ ধসের ঘটনা প্রায়ই ঘটে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতেও একাধিক দুর্ঘটনায় শিশুদের প্রাণ গেছে।
জুনের ৩০ তারিখে লাহোরের কাহনা এলাকায় একটি বেসরকারি কোচিং সেন্টারের ছাদ ধসে ১৪ শিশু নিহত হয়। এর দুই মাসেরও কম সময় আগে ডেরা গাজি খানে একটি বেসরকারি স্কুলের শ্রেণিকক্ষের ছাদ ধসে চার শিশু নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছিল। ওই ঘটনায় তদন্তে দেখা যায়, ভবনটির সম্প্রসারণের কাজ চলছিল।
জুলাইয়ে উমরকোটের কাছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরের দেয়াল ধসে তিন শিশুর মৃত্যু হয়। একই মাসে লাহোরের বাগবানপুরায় নির্মাণাধীন একটি বেসরকারি স্কুলের ছাদ ধসে এক শিশু নিহত এবং অন্তত পাঁচজন আহত হয়।
পেশোয়ারের ঘটনাটি তাই শুধু একটি ভবনধসের দুর্ঘটনা নয়। এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা তদারকি, নির্মাণের মান এবং দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিয়ে পুরোনো প্রশ্ন আবার সামনে এনেছে। সকালে সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়ে বিকেলে তার ফিরে আসার অপেক্ষা—পরিবারের কাছে এটাই স্বাভাবিক জীবন। অথচ একটি শ্রেণিকক্ষের দুর্বল ছাদ সেই প্রত্যাশাকে মুহূর্তেই শোকে পরিণত করতে পারে। তদন্তে দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন মৃত্যু ঠেকাতে নিরাপত্তাবিধি কার্যকর করা এখন পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষের জন্য জরুরি পরীক্ষা।
সূত্র: ডন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









