ইন্টারনেটের বড় একটি অংশ চালানোর পেছনে রয়েছে এমন একটি প্রযুক্তি, যার নিরাপত্তাত্রুটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে অজানা ছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সাহায্যে সেই ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সরকারি ওয়েবসাইট থেকে শুরু করে অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্ম—বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দ্রুত নিরাপত্তা হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ত্রুটিটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘পিএইচপি২শেল’। এখন পর্যন্ত এটির সুযোগ নিয়ে সফল সাইবার হামলার খবর পাওয়া যায়নি। তবে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল সেবা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
পিএইচপি কী, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
পিএইচপি একটি জনপ্রিয় প্রোগ্রামিং ভাষা, যা ওয়েবসাইটের পেছনের কাজগুলো পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়। এর পূর্ণ নাম পিএইচপি: হাইপারটেক্সট প্রিপ্রসেসর। ওয়েবসাইটে তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ এবং ব্যবহারকারীর সামনে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠা তুলে ধরার মতো কাজে এটি ব্যবহৃত হয়।
উইকিপিডিয়া, অনলাইন দোকান এবং ওয়ার্ডপ্রেসের মতো বহু পরিচিত প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে পিএইচপির সম্পর্ক রয়েছে। ওয়েবসাইট তৈরির জন্য ব্যবহৃত লারাভেল, সিমফনি ও ড্রুপালের মতো কাঠামোও এই ভাষার ওপর নির্ভরশীল। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান উইজের হিসাবে, বিশ্বের প্রায় ৭০ শতাংশ ওয়েবসাইটে পিএইচপি ব্যবহৃত হয়।

ফলে এই প্রযুক্তির একটি গুরুতর নিরাপত্তাত্রুটি শুধু কয়েকটি ওয়েবসাইটের সমস্যা নয়; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে ইন্টারনেটের বিস্তৃত পরিসরে।
কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে?
সাইবার নিরাপত্তা গবেষকেরা পিএইচপিতে দুটি গুরুতর ত্রুটি শনাক্ত করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে প্রকাশিত পিএইচপির বিভিন্ন সংস্করণে এই ত্রুটি ছিল। নিরাপত্তাঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণের প্রচলিত স্কেলে এর একটি মূল্যায়ন করা হয়েছে ১০-এর মধ্যে ৯ দশমিক ২।
গবেষকদের আশঙ্কা, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হ্যাকাররা এই ত্রুটি কাজে লাগিয়ে আক্রান্ত ওয়েব সার্ভারের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে এবং সেখান থেকে সংবেদনশীল তথ্য চুরি করতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব অ্যাডিলেডের সাইবার নিরাপত্তা গবেষক জিল স্লে সতর্ক করেছেন, কোনো হ্যাকারগোষ্ঠী বা রাষ্ট্র এই ত্রুটিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
২১ অক্টোবর সতর্কতা জারির পর বিভিন্ন দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তৎপরতা শুরু হয়। উইকিপিডিয়ার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান উইকিমিডিয়া সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নিজেদের কয়েকটি ব্যবস্থা বন্ধ রাখে। ফিনল্যান্ড সরকার, এডিনবরা কাউন্সিল এবং বিবিসির কিছু ওয়েবপৃষ্ঠাও সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়। যুক্তরাজ্য সরকার জানায়, সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ৩২টি ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। ফরাসি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান অরেঞ্জও নিরাপত্তা হালনাগাদ চালু করার সময় বিশ্বজুড়ে কিছু সেবায় প্রবেশ সাময়িকভাবে স্থগিত করে।
জাপানে সফটব্যাংক তাদের মোবাইল ফোনে ভূমিকম্প, সুনামি ও অন্যান্য দুর্যোগের সতর্কবার্তা পাঠানোর ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। গ্রাহকদের বিকল্প উপায়ে দুর্যোগের সতর্কবার্তা পাওয়ার ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে।
এআই কীভাবে ত্রুটি খুঁজে পেল?
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের তৈরি উন্নত এআই সরঞ্জাম ব্যবহার করে গবেষকেরা পিএইচপির ত্রুটিগুলো শনাক্ত করেন। এসব সরঞ্জাম বিপুল পরিমাণ কোড দ্রুত বিশ্লেষণ করে এমন দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারে, যা মানুষের চোখ এড়িয়ে যেতে পারে বা প্রচলিত পদ্ধতিতে শনাক্ত করতে দীর্ঘ সময় লাগে।
নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সালিল কানহেরে বলেন, ত্রুটিগুলো নতুন ছিল না; পরিবর্তন এসেছে সেগুলো খুঁজে বের করার সক্ষমতায়।

তবে এআইয়ের এই ক্ষমতার উল্টো দিকও রয়েছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আক্রমণকারীরাও দ্রুত দুর্বলতা কাজে লাগানোর কৌশল তৈরি করতে পারে। ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ প্রিন্স জানান, ত্রুটির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর তাদের নেটওয়ার্কে হামলার প্রচেষ্টা দ্রুত বেড়ে যায়—প্রথমে হাজারের ঘরে, পরে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখ ছাড়িয়ে যায়।
ওয়েবসাইট পরিচালকদের কী করণীয়?
পিএইচপি ফাউন্ডেশন বুধবার ত্রুটি সংশোধনের জন্য নিরাপত্তা হালনাগাদ প্রকাশ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি সব পিএইচপি ব্যবহারকারীকে দ্রুত হালনাগাদ ইনস্টল করার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাসহ বিভিন্ন দেশের সাইবার নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষও একই নির্দেশ দিয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত ত্রুটি সংশোধন করতে পারবে না, তাদের সাময়িকভাবে আক্রান্ত ব্যবস্থা বন্ধ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ওয়েবসাইট যদি কোনো হোস্টিং প্রতিষ্ঠান বা ওয়েব ডেভেলপার পরিচালনা করেন, তাহলে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পিএইচপির নিরাপত্তা হালনাগাদ প্রয়োগ করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু ওয়ার্ডপ্রেস বা এর প্লাগইন হালনাগাদ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের অধিকাংশের জন্য সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে সংশ্লিষ্ট সেবার নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ করা এবং এ ঘটনা ঘিরে ছড়ানো ভুয়া বার্তা বা ফিশিং লিংক থেকে সতর্ক থাকা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে ত্রুটিগুলো কাজে লাগানোর আরও চেষ্টা হতে পারে। কারণ, দুর্বলতা সম্পর্কে প্রযুক্তিগত তথ্য এখন প্রকাশ্যে এসেছে। ফলে ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং নিরাপত্তা হালনাগাদ করার কাজ দ্রুত শেষ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









