ফ্রান্স থেকে ভারত—বাড়তে থাকা বৈষম্য, ভেঙে পড়া জনসেবা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে তরুণেরা। তাদের ক্ষোভ কেবল সরকারের বিরুদ্ধে নয়; এই ক্ষোভ এমন এক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যে ব্যবস্থা তাদের কাছ থেকে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি কেড়ে নিচ্ছে।
ইউরোপসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে এখন বিক্ষোভের ঢেউ। অনেক জায়গায় এসব আন্দোলনকে বলা হচ্ছে ‘জেন–জি বিক্ষোভ’। আনুমানিক ১৩ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণেরা এসব প্রতিবাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁদের দাবি আলাদা হতে পারে, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এক নয়। কিন্তু ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সাধারণ প্রশ্ন: যে সমাজে তাঁরা বড় হচ্ছেন, সেই সমাজ তাঁদের জন্য কী রেখে যাচ্ছে?
ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ আগে স্কুলের দুরবস্থা ও দীর্ঘদিনের অর্থসংকটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু হয়। ক্রমেই তা ছড়িয়ে পড়ে। গত সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে পাঁচ লাখ থেকে আট লাখ মানুষ এতে অংশ নিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সবচেয়ে জোরালো চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ‘ককরোচ আন্দোলন’। ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি মানুষের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ বাড়ার মধ্যে গত সপ্তাহে আন্দোলনটির নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
স্পেনে তরুণদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে আবাসনসংকট। বাড়িভাড়া সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, অথচ উচ্ছেদের হাত থেকে পরিবারগুলোকে রক্ষার আইনও যথেষ্ট কার্যকর নয়। ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে জোর করে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার ঘটনা মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়। এরপর পার্লামেন্টে এমন একটি আইন পাসের প্রস্তাব নাকচ হয়, যা পরিবারগুলোকে উচ্ছেদের হাত থেকে সুরক্ষা দিতে পারত। এর পরিপ্রেক্ষিতে আগাম নির্বাচনের ডাক দেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। উচ্ছেদের দুই সপ্তাহ পর মারা যান মারিকারমেন।
দেশভেদে ঘটনাগুলোর পটভূমি আলাদা। কিন্তু এসব আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে বৈষম্য। এই বৈষম্যের দুটি দিক আছে—একটি শ্রেণিগত, অন্যটি প্রজন্মগত।
২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পর ইউরোপে বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আয়বৈষম্য বাড়ছে, সম্পদের ব্যবধান আরও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একসময় গর্বের বিষয় হয়ে থাকা ইউরোপের কল্যাণরাষ্ট্রের ক্রমাগত দুর্বল হয়ে পড়া।
একসময় ইউরোপের কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা ছিল, প্রত্যেক মানুষ মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা পাবে। এতে অন্তত একটি ন্যূনতম জীবনমান নিশ্চিত হবে। মানুষ নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রম দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। কিন্তু বছরের পর বছর ব্যয় সংকোচনের নীতিতে রাষ্ট্রের সেই সক্ষমতা ক্ষয়ে গেছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, সামাজিক সুরক্ষা—সব ক্ষেত্রেই সরকারি সেবার মান ও পরিধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাষ্ট্র যখন পিছু হটে, তখন তার জায়গা নেয় বাজার। যাদের টাকা আছে, তারা বেসরকারি স্কুলে সন্তানকে পড়াতে পারে, ভালো চিকিৎসা কিনতে পারে, নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে পারে। যাদের সামর্থ্য নেই, তাদের ভাগ্যে জোটে দুর্বল সেবা আর দীর্ঘ অপেক্ষা। এভাবেই আয় ও সম্পদের বৈষম্য আরও গভীর হয়।

এই বাস্তবতা তরুণদের জীবনে বিশেষভাবে আঘাত হানে। একের পর এক ক্ষেত্রে তাঁরা এমন রাষ্ট্রের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা নাগরিকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ। ফলে তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যাশা কমছে। বাবা-মা কিংবা দাদা-দাদির প্রজন্মের তুলনায় অনেক তরুণের সামনে এখন সুযোগ কম, অনিশ্চয়তা বেশি।
শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালেই এর একটি চিত্র পাওয়া যায়। অর্থের অভাবে দুর্বল হয়ে পড়া শিক্ষাব্যবস্থা যে সংকটে আছে, তা সাম্প্রতিক পিসা (পিআইএসএ) পরীক্ষার ফলেও স্পষ্ট। বিভিন্ন দেশে শিক্ষার্থীদের পড়া ও গণিতের দক্ষতা কমেছে। এর ব্যাখ্যা হিসেবে প্রায়ই বলা হয়, তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে, স্কুলে অনুপস্থিতি বাড়ছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই সমস্যার একটি কারণ।
কিন্তু সংকটের আরেকটি দিকও রয়েছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিস্তার। শিক্ষা ও প্রযুক্তির এই পরিবর্তন সামাল দেওয়ার মতো নীতিমালা তৈরি করতে সরকারগুলো পিছিয়ে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআই নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগও ধীরগতির। প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শক্তিশালী লবিং সেই উদ্যোগকে আরও বাধাগ্রস্ত করছে।
কর্মজীবনে প্রবেশের সময়ও তরুণেরা নতুন এক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছেন। এআইয়ের কারণে চাকরির বাজারে কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় ইতিমধ্যে বোঝা যাচ্ছে: নতুন কর্মীদের জন্য থাকা প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক কাজ ক্রমেই যন্ত্রের হাতে চলে যাচ্ছে। যেসব চাকরি একসময় তরুণদের কর্মজীবনের প্রথম ধাপ ছিল, সেগুলোর সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
আবাসনও একই সংকটের আরেকটি দিক। আগের যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় আজকের তরুণেরা আয়ের অনেক বড় অংশ বাড়িভাড়ায় ব্যয় করছেন। নিজের বাড়ি কেনা তো দূরের কথা, অনেকের জন্য নিয়মিত ভাড়া দেওয়া এবং অন্যান্য মৌলিক খরচ সামলানোই কঠিন হয়ে উঠছে। এটিও কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতার ফল।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে জলবায়ু সংকট—সম্ভবত রাষ্ট্র ও সরকারের ব্যর্থতার সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণ। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক আন্তসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) সর্বশেষ প্রতিবেদন দেখিয়েছে, ২০২০ সালে জন্ম নেওয়া শিশুদের জীবন তাদের বাবা-মা ও দাদা-দাদির জীবনের তুলনায় কত বেশি অনিশ্চিত হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সমতাভিত্তিক সমাজের সক্ষমতা বেশি থাকে। সেখানে মানুষ একে অন্যের পাশে দাঁড়াতে পারে, রাষ্ট্রের সহায়তা পায়, সম্মিলিতভাবে অভিযোজনের পথ খুঁজতে পারে। কিন্তু বৈষম্য বাড়তে থাকলে সেই দায়িত্ব চাপানো হয় ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর। যার অর্থ আছে, সে নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে পারে। বাকিরা দুর্যোগের সামনে আরও অসহায় হয়ে পড়ে।
এভাবেই একের পর এক ব্যর্থতা জমে উঠছে। দুর্বল জনসেবা, বৈষম্য, আবাসনসংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং জলবায়ু বিপর্যয়—সব মিলিয়ে তরুণদের জীবনে তৈরি হয়েছে বিস্ফোরক পরিস্থিতি। প্যারিস, নয়াদিল্লি, রোম ও মাদ্রিদের রাস্তায় যে ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে, তার উৎস এখানেই।
কিন্তু এই ক্ষোভের জবাবে সরকারগুলোর প্রধান প্রতিক্রিয়া কী? দমন-পীড়ন। প্রতিবাদকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, বিক্ষোভবিরোধী আইন, গ্রেপ্তার এবং পুলিশের সহিংসতা—বিশ্বজুড়েই এসব প্রবণতা বাড়ছে।
কখনো দমন-পীড়নে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যায়। আবার কখনো তা মানুষের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয়। ফ্রান্স ও ভারতে এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি সেই দ্বিতীয় দিকেই এগিয়েছে।
অথচ প্রয়োজন ছিল অন্য কিছুর। তরুণেরা কেন রাস্তায় নামছেন, তাঁদের ক্ষোভের পেছনে কোন বৈষম্য ও নীতিগত ব্যর্থতা কাজ করছে, তা স্বীকার করে সেগুলোর সমাধানে আন্তরিক উদ্যোগ নেওয়া। শুধু বিক্ষোভ থামিয়ে দিলেই সংকটের অবসান হবে না। যে সমস্যাগুলো মানুষকে রাস্তায় নামাচ্ছে, সেগুলো অমীমাংসিত থাকলে রাজনৈতিক সংকট আরও গভীর হবে।
জেন–জির প্রতিবাদ তাই কেবল তরুণদের অসন্তোষ নয়। এটি এমন এক সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা, যেখানে সম্পদ ও সুযোগ ক্রমেই অল্প কিছু মানুষের হাতে জমা হচ্ছে, আর বিপুলসংখ্যক তরুণের সামনে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সম্ভাবনার দরজা। তাঁদের প্রশ্ন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কারা? আর সেই ভবিষ্যৎ যদি ক্রমেই অন্ধকার হয়ে আসে, তবে এর দায় নেবে কে?
সরকারগুলো যদি এই প্রশ্নের উত্তর না দেয়, তাহলে রাস্তায় ফিরে আসবে প্রতিবাদ। কারণ, যে প্রজন্মের কাছ থেকে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা কেড়ে নেওয়া হয়, সেই প্রজন্মের কাছে নীরব থাকার প্রত্যাশা করা যায় না।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









