প্রথম দফার ভোটে পিছিয়ে পড়েছিলেন। নির্বাচনের আগে জনমত জরিপেও ব্যবধান ছিল সামান্য। শেষ পর্যন্ত নাটকীয় প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। ৮০ বছর বয়সী লুলা ৫১ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী, ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো পেয়েছেন প্রায় ৪৮ শতাংশ ভোট।
তবে এই জয় নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। ভোটের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বলসোনারো। তিনি নির্বাচনের ফল বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন। ফলে লুলার ঐতিহাসিক জয়ের পরও ব্রাজিলের রাজনীতিতে উত্তেজনা কমার লক্ষণ নেই।
রোববার ভোট গণনার ৯৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ শেষ হওয়ার পর নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ লুলাকে বিজয়ী ঘোষণা করে। আধুনিক ব্রাজিলের রাজনীতিতে প্রথম দফায় দ্বিতীয় স্থানে থাকার পর দ্বিতীয় দফার ভোটে জিতে প্রেসিডেন্ট হওয়ার নজির নেই। লুলার জয় তাই শুধু তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নয়, দেশটির নির্বাচনী ইতিহাসেও একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা।
প্রথম দফার ধাক্কা কাটিয়ে জয়
গত ৪ অক্টোবর প্রথম দফার ভোটে লুলাকে পেছনে ফেলেছিলেন ফ্লাভিও বলসোনারো। তিনি পেয়েছিলেন ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ ভোট, আর লুলার ভোট ছিল ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ। দুই প্রার্থীর ব্যবধান ছিল ২২ লাখের বেশি ভোট।
প্রথম দফার এই ফলের পর লুলার জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। পরবর্তী তিন সপ্তাহে তিনি ভোট দিতে না যাওয়া মানুষদের কেন্দ্রে ফেরানোর চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে নিত্যপণ্যের দাম, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং তাঁর সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করেন।

ভোট গণনার শুরুতে বলসোনারো এগিয়ে ছিলেন। পরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ফল আসতে শুরু করলে লুলা ব্যবধান কমিয়ে এগিয়ে যান। ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চল লুলা ও তার ওয়ার্কার্স পার্টির শক্ত ঘাঁটি। অন্যদিকে, বলসোনারোর সমর্থন বেশি দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে।
এই জয় লুলাকে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। একই সঙ্গে এটি বলসোনারো পরিবারের ক্ষমতায় ফেরার প্রচেষ্টায় বড় ধাক্কা। ৮০ বছর বয়সী লুলা দায়িত্ব নিলে ব্রাজিলের গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর দেশটির সবচেয়ে বেশি বয়সী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাবেন।
ভোটের সময় বাড়ানো নিয়ে বিতর্ক
রোববার ভোটগ্রহণের শেষ দিকে দুই প্রার্থীর শিবির থেকেই ভোটের সময় বাড়ানোর দাবি ওঠে। লুলার প্রচারশিবিরের অভিযোগ, কয়েকটি শহরে গণপরিবহন কমিয়ে দেওয়ায় নিম্ন আয়ের ভোটারদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে সমস্যা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রবল বৃষ্টি ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভোটারদের সুবিধার জন্য সময় বাড়ানোর আবেদন জানায় বলসোনারোর শিবির।
মিনাস জেরাইস রাজ্যে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ৩৪৯টি ভোটকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে জানিয়েছে আঞ্চলিক নির্বাচনী আদালত। তবে বিকল্প ব্যাটারির সাহায্যে ভোটের যন্ত্র চালু ছিল।
ব্রাসিলিয়া সময় বিকেল পাঁচটায় ভোট শেষ হওয়ার কথা ছিল। দুই পক্ষের আবেদনের পর সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ক্রিস্তিয়ানো জানিন ভোটগ্রহণ আরও দুই ঘণ্টা চালানোর নির্দেশ দেন। কিন্তু ততক্ষণে বেশ কিছু কেন্দ্রে ভোট শেষ হয়ে যন্ত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে জানিন স্পষ্ট করেন, যেসব কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে, সেগুলো আর খোলা হবে না; কেবল খোলা কেন্দ্রগুলোতেই অতিরিক্ত সময় ভোট দেওয়া যাবে।
এতে কোথায় ভোট দেওয়া সম্ভব, তা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। কিছু ভোটার সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের পরও ভোট দিতে পারেননি। বলসোনারো এই পরিস্থিতিকে ফল বাতিলের যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং জানিনের বিরুদ্ধে বিচারিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করেছেন।
হস্তক্ষেপের অভিযোগ, আইনি লড়াইয়ের আশঙ্কা
ব্রাজিলের ফেডারেল পুলিশ পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত গণপরিবহন বিঘ্নিত হওয়ার অভিযোগ তদন্ত করছে। সালভাদরে বাস চলাচল কমানোর নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে শহরটির পরিবহনবিষয়ক সচিবকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছে একটি আদালত। লুলার শিবির এসব ঘটনাকে ভোটে হস্তক্ষেপের প্রমাণ হিসেবে দেখছে।
অন্যদিকে, বলসোনারো নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে ফল মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তার বাবা, সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো, কারাবন্দী। তার বিরুদ্ধে চলা আইনি প্রক্রিয়াকে ট্রাম্পের সমর্থকেরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেছেন। ফ্লাভিও বলসোনারোও ব্রাজিলের আদালতব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রও ভোটের সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তবে ফল বাতিল হবে কি না, তা নির্ভর করবে সম্ভাব্য আইনি চ্যালেঞ্জ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ওপর।
ভোটার উপস্থিতি ও ট্রাম্পের হিসাব
লুলার জয়ের পেছনে ভোটার উপস্থিতি বেড়ে যাওয়াও ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন জরিপ সংস্থা অ্যাটলাসইনটেলের প্রধান আন্দ্রেই রোমান। প্রথম দফায় প্রায় ৩ কোটি ৩৪ লাখ ব্রাজিলীয় ভোট দিতে যাননি। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের জন্য ভোট দেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও সেবার ভোটার অনুপস্থিতির হার ছিল প্রায় ২১ শতাংশ—১৯৯৮ সালের পর সাধারণ নির্বাচনে সর্বোচ্চ।
দ্বিতীয় দফায় কত ভোটার কেন্দ্রে ফিরেছেন এবং কোন অঞ্চলে তাঁদের উপস্থিতি বেড়েছে, তা লুলার প্রত্যাবর্তনের ব্যাখ্যা দিতে পারে। প্রচারের শেষ দিকে শ্রমজীবী মানুষের সমর্থন ধরে রাখতে তিনি সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বিনা মূল্যে গণপরিবহন চালুর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন।
এই ফল লাতিন আমেরিকায় ট্রাম্পের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বলসোনারো পরিবার দীর্ঘদিন ধরে ট্রাম্পের সমর্থন পেয়ে এসেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্রাজিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের কিছু কর্মকর্তা অবস্থান নিয়েছিলেন—যার উদ্দেশ্য হিসেবে লুলাকে দুর্বল করা এবং বলসোনারো পরিবারকে ক্ষমতায় ফেরানোর প্রচেষ্টার কথা উঠে এসেছে।
লুলা তার প্রচারে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরোধিতাকে গুরুত্ব দিয়েছেন। বিজয় ভাষণে তিনি বলেন, চতুর্থ মেয়াদে জয়ের পথে তাঁকে বাইরের হস্তক্ষেপও মোকাবিলা করতে হয়েছে। তিনি এই ফলকে ‘অস্বীকারবাদ’ ও ‘মিথ্যার’ পরাজয় বলে বর্ণনা করেন।
লুলার জয় এখন ব্রাজিলের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় খুলেছে। তবে ভোটের সময় বাড়ানো নিয়ে বিতর্ক, আদালতকে ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজন এবং সম্ভাব্য আইনি লড়াইয়ের কারণে তাঁর চতুর্থ মেয়াদের শুরুতেই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









