অক্টোবরেই লা লিগার শিরোপার লড়াই শেষ হয়ে যাক, তা চায়নি রিয়াল মাদ্রিদ। ক্যাম্প ন্যুতে বার্সেলোনাকে হারিয়ে তারা শুধু তিনটি পয়েন্টই তুলে নেয়নি; যারা বার্সেলোনাকে অপ্রতিরোধ্য ভাবছিল, তাদেরও ভুল প্রমাণ করেছে। একই সঙ্গে কোচ হোসে মরিনহো নতুন প্রকল্প শুরু হওয়ার আগেই যারা সেটিকে ব্যর্থ বলে ধরে নিয়েছিলেন, তাদেরও জবাব দিয়েছে রিয়াল।
মরিনহো সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল ম্যাচটি পড়তে পারা—শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। মাঝমাঠে তিনি এমন খেলোয়াড়দের রেখেছিলেন, যারা শারীরিক গড়নে খুব লম্বা না হলেও মাঠের ফাঁকা জায়গা দখল করেছেন অসাধারণ দক্ষতায়। তাদের চলাফেরা, অবস্থান নেওয়া ও পরস্পরকে সহায়তা করার ক্ষমতা বার্সেলোনার আক্রমণকে বারবার আটকে দিয়েছে। শেষ দিকে এডুয়ার্দো কামাভিঙ্গাকে নামিয়ে তিনি দলে আরও গতি ও শক্তি যোগ করেন। সেটিই হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষকে শেষ আঘাত করার প্রস্তুতি।

এমবাপ্পে অবশ্য ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত নাম। তার লক্ষ্য ছিল তিন পয়েন্ট নিয়ে ফেরা, আর ব্যালন ডি’অরের ফলের অপেক্ষাও রয়েছে সামনে। কিন্তু এই এল ক্লাসিকোর গল্প শুধু তার গোল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। দুই দলের সবচেয়ে বড় তারকাদের দ্বৈরথের মধ্যে এমন একজন খেলোয়াড় নিজের জায়গা করে নিয়েছেন, যার পারফরম্যান্সের প্রয়োজন ছিল খুব বেশি। তিনি মার্ক কুকুরেয়া।
স্পেন জাতীয় দলে লামিনে ইয়ামালের সতীর্থ কুকুরেয়া তাকে এমনভাবে আটকে রেখেছিলেন, যেন বার্সেলোনার তরুণ তারকার খেলার প্রতিটি অভ্যাস তার জানা। দুজনের একসঙ্গে কাটানো সময় হয়তো তাকে লামিনের চলাফেরা বুঝতে সাহায্য করেছে। তবে শুধু পরিচিতি নয়, কুকুরেয়ার সাফল্যের পেছনে ছিল নিখুঁত মনোযোগ ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
লামিনে সাধারণত নিজের গতি, ড্রিবলিং এবং বাম পায়ের জাদুতে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাটল ধরান। কিন্তু এবার তাকে স্বচ্ছন্দ হতে দেননি কুকুরেয়া। লামিনে দৌড় শুরু করার আগেই তিনি তার গতিপথ আঁচ করার চেষ্টা করেছেন, স্বাভাবিক পাসের রাস্তা বন্ধ করেছেন এবং তাকে বারবার এমন অবস্থায় ঠেলে দিয়েছেন, যেখানে বাম পা ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, লামিনেকে কখনোই এমন অনুভব করতে দেননি যে ম্যাচের ভাগ্য তার পায়ের ওপর নির্ভর করছে।
ফলে বার্সেলোনার তরুণ ফরোয়ার্ডকে পুরো ম্যাচে নিজের ছন্দ খুঁজতে হয়েছে। যে খেলোয়াড়কে ঘিরে আক্রমণের পরিকল্পনা সাজানো হয়, সেই খেলোয়াড়ই যখন খেলায় নিজের ছাপ রাখতে পারেন না, তখন দলের সামগ্রিক আক্রমণও অনেকটাই অনুমেয় হয়ে পড়ে। কুকুরেয়া ঠিক সেটিই করেছেন। তার রক্ষণাত্মক পারফরম্যান্স শুধু একজন খেলোয়াড়কে থামায়নি; বার্সেলোনার আক্রমণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথও বন্ধ করে দিয়েছে।
কামাভিঙ্গার অবদানও ছিল চোখে পড়ার মতো। তার শক্তি ও গতিশীলতা রিয়ালকে শেষ দিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। মাঝমাঠে জুড বেলিংহামও আবার দেখিয়েছেন, নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার শিল্পে তিনি কতটা দক্ষ। বল পায়ে তার শান্ত থাকা, সঠিক সময়ে জায়গা বদলানো এবং সতীর্থদের জন্য সময় ও জায়গা তৈরি করে দেওয়া রিয়ালের খেলায় স্বস্তি এনেছে। ক্যাম্প ন্যুর চাপের মধ্যেও তিনি যেন নিজের ছন্দে নেচেছেন।
এই জয় তাই শুধু এমবাপ্পের গোলের জয় নয়, কিংবা মরিনহোর কৌশলের সাফল্যও শুধু নয়। এটি এমন এক দলের জয়, যারা জানে কখন প্রতিপক্ষকে জায়গা দিতে হয়, কখন সেই জায়গা বন্ধ করতে হয় এবং কখন পাল্টা আঘাত হানতে হয়। বার্সেলোনা মাঠে নিজেদের শক্তি দেখাতে চেয়েছিল, কিন্তু রিয়াল তাদের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে।
লামিনেকে নিষ্ক্রিয় করে কুকুরেয়া প্রমাণ করেছেন, বড় ম্যাচে তারকা হওয়াই সব নয়। কখনো কখনো প্রতিপক্ষের তারকাকে আলো ছড়াতে না দেওয়াই সবচেয়ে বড় অবদান। আর সেই কাজটি তিনি করেছেন এমন এক রাতে, যখন রিয়াল মাদ্রিদকে অনেকেই আগেভাগে বাতিল করে দিয়েছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









