কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প ও সরকারি পরিষেবায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু এই প্রযুক্তির সুফল যদি ধনী দেশগুলোই বেশি পায়, তাহলে বিশ্বে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। এমন আশঙ্কার কথা জানিয়েছে জাতিসংঘের একটি সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তা।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) উপমহাসচিব টমাস লামানাউস্কাস আল-জাজিরাকে বলেন, এআইয়ের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন দেশের মধ্যে সুযোগের ব্যবধানও বাড়ছে। তার মতে, উদ্বেগের বিষয়টি শুধু ডিজিটাল প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকারের বৈষম্য নয়; বরং এআই যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে, সেগুলো থেকে দরিদ্র দেশগুলো বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি।
কাতারের দোহায় জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের বিশ্ব বিনিয়োগ ফোরামের এক অনুষ্ঠানের পাশে তিনি বলেন, এআইয়ের সুফল যদি সব দেশ সমানভাবে কাজে লাগাতে না পারে, তাহলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য আরও গভীর হতে পারে।
এই আশঙ্কার পেছনে রয়েছে প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর বড় ঘাটতি। লামানাউস্কাস জানান, বিশ্বের মোট ডেটা সেন্টারের সক্ষমতার মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ রয়েছে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায়। অথচ এআই চালাতে বিপুল পরিমাণ কম্পিউটিং ক্ষমতা, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট প্রয়োজন। এসব সুবিধা না থাকলে দেশগুলোর পক্ষে এআইভিত্তিক অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা করা কঠিন।
বিশ্বে এখনো প্রায় ২২০ কোটি মানুষ ইন্টারনেটের বাইরে। ফলে এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও বিপুলসংখ্যক মানুষ এর সুবিধা থেকে দূরে থেকে যেতে পারেন।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত জাতিসংঘের উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল, এআই দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্যের নতুন যুগ তৈরি করতে পারে। বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা, দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এআইয়ের অর্থনৈতিক সুফল থেকে বঞ্চিত করতে পারে। এতে কয়েক দশক ধরে দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ব্যবধান কমানোর যে অগ্রগতি হয়েছে, তা-ও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই ব্যবধান স্পষ্ট। লামানাউস্কাসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলোর কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর প্রায় ২৯ শতাংশ জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করেন। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই হার মাত্র ১৬ শতাংশ। তাঁর মতে, এ পার্থক্য মানুষের উৎপাদনশীলতা এবং চাকরির বাজারে নতুন সুযোগ পাওয়ার সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
চাকরি নিয়ে উদ্বেগ
এআইয়ের দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে চাকরি হারানোর আশঙ্কাও বাড়ছে। লামানাউস্কাসের উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, এই প্রযুক্তির কারণে বিশ্বে প্রায় ৯ কোটি চাকরি বিলুপ্ত হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন করে ১৭ কোটি কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ সামগ্রিক হিসাবে নতুন চাকরির সংখ্যা বেশি হলেও, পরিবর্তনের ধাক্কা সবার ওপর সমানভাবে পড়বে না।
অনুমান করা হচ্ছে, ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতার প্রায় ৪০ শতাংশ বদলে যেতে পারে। ফলে অনেক কর্মীকে নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। যাঁদের প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ কম, তাঁদের জন্য এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো কঠিন হতে পারে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এআই নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থাবিষয়ক গবেষক ফজল বারেজ বলেন, এআইয়ের কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কা বাস্তব। তবে কোনো কাজের নির্দিষ্ট অংশ স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়া আর একটি সম্পূর্ণ চাকরি বিলুপ্ত হওয়া এক বিষয় নয়। তাঁর মতে, নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক মানসিক কাজের সঙ্গে যুক্ত পেশাগুলো বেশি ঝুঁকিতে থাকতে পারে, যদিও ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা এখনো অনিশ্চিত।

বারেজ আরও সতর্ক করেন, এআইয়ের কারণে ব্যাপক স্বয়ংক্রিয়তা সরকারের কর-রাজস্ব কমিয়ে দিতে পারে, জীবনযাত্রার মানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে এবং নাগরিকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দুর্বল করতে পারে।
ভাষাগত বৈষম্যও বড় বাধা। লামানাউস্কাস জানান, এআইয়ের অনুবাদ সরঞ্জামগুলোতে আফ্রিকার মাত্র ৭ শতাংশ ভাষার প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ফলে বহু ভাষাভাষী মানুষ নিজেদের ভাষায় এই প্রযুক্তি ব্যবহার করার সুযোগ পাচ্ছেন না।
সুফল পেতে প্রয়োজন বিনিয়োগ
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক এআই নিরাপত্তা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিকিৎসা-সংক্রান্ত পরামর্শ নেওয়া থেকে শুরু করে লেখালেখি—বিভিন্ন কাজে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ এআই ব্যবহার করছেন। প্রতিবেদনে আরও অনুমান করা হয়েছে, উন্নত অর্থনীতির প্রায় ৬০ শতাংশ এবং উদীয়মান অর্থনীতির ৪০ শতাংশ চাকরি এআইয়ের প্রভাবে পড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে এসব চাকরির সব কটিই বিলুপ্ত হবে।
লামানাউস্কাস মনে করেন, এআইয়ের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়ার বাস্তবসম্মত সুযোগ নেই। তার ভাষায়, এআই থেকে যাবে এবং মানুষের জীবন বদলে দেবে। এক দশক আগে মাত্র চারটি দেশের এআই কৌশল ছিল; এখন এমন দেশের সংখ্যা ১০৪।
তবে প্রযুক্তির বিস্তার ঘটলেই তার সুফল সবার কাছে পৌঁছাবে না। সে জন্য ডিজিটাল অবকাঠামো, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কার্যকর নীতিমালায় বিনিয়োগ জরুরি। উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শুধু এআই ব্যবহার করার সুযোগ দিলেই হবে না, প্রযুক্তিটি কীভাবে তৈরি ও পরিচালিত হবে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াতেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
লামানাউস্কাসের মতে, সামনে এগোনোর পথ হলো এমন বিনিয়োগ নিশ্চিত করা, যাতে এআইয়ের সুফল সবার কাছে পৌঁছায় এবং মানুষের উদ্বেগ ও আশঙ্কাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্যথায়, প্রযুক্তির নতুন যুগ বিশ্বকে এগিয়ে নেওয়ার বদলে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









