প্যারিসের উপকণ্ঠের শিক্ষার্থীরা প্রথমে রাস্তায় নেমেছিলেন খুব সাধারণ কিছু দাবিতে। তারা চেয়েছিলেন, শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত শিক্ষক থাকুন, সহপাঠীদের বসার জন্য যথেষ্ট বেঞ্চ থাকুক, আর সরকার এমন স্কুল ভবন তৈরি করুক, যেখানে সত্যিকার অর্থে পড়াশোনা করা যায়। কিন্তু তাদের এই দাবির মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ফ্রান্সের গভীর এক সংকট।
প্যারিসের এই উপকণ্ঠ অঞ্চলগুলোকে বলা হয় ‘বানলিয়ু’। সেখানে বাস করেন ফ্রান্সের শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষের বড় একটি অংশ। তাদের অনেকে আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলে ফ্রান্সের সাবেক উপনিবেশ থেকে আসা অভিবাসী পরিবারের সন্তান। সরকারি ভাষ্যে ফরাসি প্রজাতন্ত্রের আদর্শ হলো ‘ইউনিভার্সালিজম’—অর্থাৎ নাগরিকদের জন্য সমান অধিকার ও সর্বজনীন মূল্যবোধ। এই আদর্শের আড়ালে রাষ্ট্রীয় বর্ণবাদ নিয়ে আলোচনা করতে চায় না দেশটির ক্ষমতাসীন অভিজাত শ্রেণি। অথচ পুলিশি নিপীড়ন, কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান এবং উপকণ্ঠের জনপরিষেবার অবনতি অন্য এক বাস্তবতা সামনে আনে। অশ্বেতাঙ্গ ফরাসি নাগরিকদের কাছে এই অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে দেয়, সমান অধিকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে সবার জন্য সমান নয়।
এ কারণেই কয়েক বছর পরপর বানলিয়ুর তরুণেরা রাস্তায় নেমে ন্যায়বিচার দাবি করেন। এবার সেই ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে ফ্রান্সের আরও বিস্তৃত এলাকায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মজুরি নিয়ে অসন্তোষ, নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ ও গণহত্যার প্রতিবাদ, ইউক্রেনকে ফ্রান্সের ক্রমবর্ধমান সামরিক সহায়তা এবং সরকারি পরিষেবার অবক্ষয়। নানা দাবির আড়ালে উঠে এসেছে একটি মৌলিক প্রশ্ন— ফরাসি প্রজাতন্ত্র তার তরুণ প্রজন্মকে কেমন ভবিষ্যৎ দিতে পারছে?
মজুরি কমছে, বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়
১৭ অক্টোবর ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভে প্রায় আট লাখ মানুষের অংশগ্রহণের হিসাব দেয় দেশটির শ্রমিক সংগঠনগুলোর কনফেডারেশন সিজিটি। বিক্ষোভকারীদের দাবির মধ্যে ছিল মজুরি ও পেনশন বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্য কমানো এবং মানুষের প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি পরিষেবা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে অবশ্য বিক্ষোভের অন্য ছবিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে—আগুনে পোড়া ভবন, ভাঙচুর হওয়া দোকানপাট, লুটপাটের দৃশ্য। এসব ছবি প্রচারের ফলে আন্দোলনকে বিশৃঙ্খলা হিসেবে তুলে ধরা সহজ হয়। কিন্তু এই ছবিগুলো ব্যাখ্যা করতে পারে না, কেন শ্রমজীবী মানুষের নেতৃত্বে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন।

স্কুলে শিক্ষার্থীর তুলনায় শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। বহু মানুষের জীবিকা অনিশ্চিত। সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে পরিবারগুলো ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত। ফরাসি সরকার হয়তো বলতে পারে, বিক্ষোভকারীরা পুরো দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন না। কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে এভাবে অস্বীকার করা যায় না। ভাঙা দোকানের কাচের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ভেঙে পড়া সেই সামাজিক প্রতিশ্রুতি, যা মানুষকে একসময় রাষ্ট্রের ওপর আস্থা রাখতে শিখিয়েছিল। ২০১৮ সালে জ্বালানি তেলের ওপর কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে ফ্রান্সে শুরু হয়েছিল আরেকটি বড় আন্দোলন। কাজের জায়গায় যাতায়াতের জন্য যাদের গাড়ির ওপর নির্ভর করতে হয়, এই সিদ্ধান্ত তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয়। আন্দোলনটি পরিচিতি পায় ‘ইয়েলো ভেস্ট’ বা হলুদ জ্যাকেট আন্দোলন নামে। গাড়ির জরুরি পরিস্থিতিতে চালকেরা যে হলুদ প্রতিফলক জ্যাকেট পরেন, বিক্ষোভকারীরা সেটিই পরেছিলেন প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে।
তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ধনীদের ওপর আরোপিত সম্পদকর কমিয়ে দিয়েছিলেন। সাধারণ মানুষের কাছে এই সিদ্ধান্ত ছিল সরাসরি অপমানের মতো। ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকার গোলচত্বরে মানুষ জড়ো হতে থাকেন। তাদের অভিযোগ ছিল ভিন্ন ভিন্ন, কিন্তু ক্ষোভের উৎস ছিল একই—রাষ্ট্রের নীতিতে ধনীদের স্বার্থের অগ্রাধিকার। শেষ পর্যন্ত সরকার জ্বালানি কর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে। এতে আন্দোলনকারীরা শক্তি পান। মানুষ ঘরে ফিরে গেলেও আন্দোলনের ক্ষোভ নিভে যায়নি।
২০২৩ সালে সেই ক্ষোভ আবার সামনে আসে। মাখোঁ পার্লামেন্টে ভোটাভুটি ছাড়াই পেনশন সংস্কার এগিয়ে নিতে সংবিধানের একটি বিশেষ বিধান ব্যবহার করেন। তার পরিকল্পনা ছিল অবসরের বয়স ৬২ থেকে বাড়িয়ে ৬৪ বছর করা। সরকারের যুক্তি ছিল, পেনশনব্যবস্থার আর্থিক ভার সামলাতে এই পরিবর্তন প্রয়োজন। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের কাছে এটি ছিল দীর্ঘদিনের অর্জিত সামাজিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা। ২০২৫ সালে প্রধানমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া বায়রু ৪৩৮০ কোটি ইউরোর ব্যয়সংকোচন পরিকল্পনা প্রস্তাব করেন। এর মধ্যে দুটি সরকারি ছুটি বাতিলের প্রস্তাবও ছিল। তখন অনেক ফরাসি নাগরিকের কাছে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে ওঠে— রাষ্ট্রের হিসাব মেলাতে শ্রমিকদের বিশ্রাম, অবসর ও সামাজিক সুরক্ষা কমানো যেতে পারে; কিন্তু ধনকুবেরদের সম্পদের ওপর হাত দেওয়া যাবে না।
এই বিশ্বাসঘাতকতার অভিঘাত এসে পড়েছে শ্রমিকদের সন্তানদের ওপরও। আজ রাস্তায় নেমেছে সেই প্রজন্ম, যারা নিজেদের জীবনেই রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ভেঙে পড়তে দেখেছে। ফ্রান্সের জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ইনসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশটিতে ৯৮ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছিলেন। দারিদ্র্যের হার ছিল ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ—১৯৯৬ সালে এই পরিসংখ্যানের ধারাবাহিক হিসাব শুরু হওয়ার পর সর্বোচ্চ। শিশু ও একক অভিভাবকের পরিবারগুলো বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বানলিয়ুতে দারিদ্র্য কেবল সাময়িক দুর্দশা নয়; বহু মানুষের কাছে এটাই দৈনন্দিন বাস্তবতা। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বর্ণবৈষম্যও। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে মালির বংশোদ্ভূত ২৪ বছর বয়সী আদামা ত্রাওরে জেন্ডারমেরি হেফাজতে মারা যান। তার মৃত্যুর বিচার দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ২০২০ সালের জুনে বড় আকার ধারণ করে। ত্রাওরের বোন আসা ত্রাওরের নেতৃত্বে প্যারিসের আদালতের সামনে জড়ো হন কয়েক দশ হাজার মানুষ। কৃষ্ণাঙ্গ ও আরব বংশোদ্ভূত শ্রমজীবী মানুষের পুলিশি নিপীড়নের অভিজ্ঞতা এই আন্দোলনে একসূত্রে গাঁথা হয়। আজকের তরুণদের অনেকে ২০১৮ সালের হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনে অংশ নেওয়ার মতো বয়সী ছিলেন না। কিন্তু তাদের বাবা-মায়ের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তারা কাঁদানে গ্যাস ও পুলিশের লাঠির মুখোমুখি হওয়ার বাস্তবতা জেনেছেন। বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের স্মৃতিও তাঁদের কাছে অপরিচিত নয়।
ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়ানোর অধিকার
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি জানানো মানুষদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতাও। ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর, গাজায় নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে, ফ্রান্সের তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জেরাল্ড দারমানাঁ স্থানীয় প্রশাসনকে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দেন। সেদিন রাতেই প্যারিসের প্লাস দ্য লা রিপাবলিক চত্বরে ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে জড়ো হন মানুষ। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে। ১৮ অক্টোবর ফ্রান্সের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আদালত কনসেই দেতা স্পষ্ট করে যে ফিলিস্তিনের সমর্থনে সব বিক্ষোভ একযোগে নিষিদ্ধ করা যায় না; কেবল যেসব বিক্ষোভে জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেগুলো নিষিদ্ধ করা যেতে পারে। কিন্তু এতে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। বহু বিক্ষোভই দমন-পীড়নের মুখে পড়ে। ফলে ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলার পাশাপাশি বিক্ষোভ করার অধিকার রক্ষার প্রশ্নও সামনে চলে আসে।

প্যারিসের সায়েন্স পোসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা ইসরায়েলি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীদারত্বের বিরোধিতা করে সভা ও অবস্থান কর্মসূচি আয়োজন করেন। ২৪ এপ্রিল রাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাস থেকে ৬০ জন শিক্ষার্থীকে সরিয়ে দিতে দাঙ্গা পুলিশ ডাকে। শিক্ষার্থীদের কাছে ঘটনাটি ছিল গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। যেসব প্রতিষ্ঠান সর্বজনীন মানবিক মূল্যবোধের কথা বলে, তারাই যখন ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রেও সেই মূল্যবোধ প্রয়োগের দাবি তোলা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশ ডাকে, তখন প্রতিষ্ঠানগুলোর নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়ে। ফরাসি সরকার ইউক্রেনের মানুষের জীবন রক্ষার প্রশ্নে যে গুরুত্ব দেখিয়েছে, ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রে তার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে—এমন অভিযোগও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। তাদের চোখে কিছু মানুষের জীবন রক্ষার যোগ্য, আর অন্যদের জীবন পরিত্যাজ্য—রাষ্ট্রের নীতিতে এমন একটি বিভাজন তৈরি হয়েছে। একই বৈপরীত্য দেখা যায় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রেও। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার জন্য অর্থের অভাবের কথা বলা হয়। অথচ সামরিক ব্যয় বাড়ানো এবং ইউক্রেনকে অস্ত্র সহায়তার জন্য অর্থ জোগাড় করতে ফরাসি রাষ্ট্রের অসুবিধা হয় না। এই বৈপরীত্য তরুণদের কাছে ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
ইউক্রেনের যুদ্ধ ও সামরিক ব্যয়ের অগ্রাধিকার
২০২৫ সালের ৫ মার্চ মাখোঁ রাশিয়াকে ফ্রান্স ও ইউরোপের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি সামরিক ব্যয় বাড়ানোর আহ্বান জানান এবং সেই ব্যয় মেটাতে সামাজিক খাতে কাটছাঁটের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তার ভাষায়, এ জন্য প্রয়োজন সংস্কার, কঠিন সিদ্ধান্ত এবং সাহস। যুদ্ধের পরিণতি যা-ই হোক, ইউরোপকে আরও বেশি অস্ত্রসজ্জিত হতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। একই বছরের ১৩ জুলাই সশস্ত্র বাহিনীর উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মাখোঁ বলেন, ২০২৭ সালের মধ্যে ফ্রান্সের বার্ষিক প্রতিরক্ষা বাজেট ৬৪ বিলিয়ন ইউরোতে উন্নীত করা হবে। ২০১৭ সালের তুলনায় নামমাত্র হিসাবে তা হবে দ্বিগুণ। তার ঘোষণা ছিল, স্বাধীনতার মূল্য থাকলে সেটিই সেই মূল্য। তবে এই ব্যয় মেটাতে সরকার ঋণ নেবে না, করও বাড়াবে না।
প্রস্তাবিত ২০২৭ সালের বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে ৬৩৪০ কোটি ইউরো বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে—২০২৬ সালের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। বড় অস্ত্র কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ ১৭২০ কোটি ইউরো, যা আগের বছরের তুলনায় ১১ শতাংশ বেশি। এই হিসাবগুলো রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার স্পষ্ট করে দেয়। সামরিক খাতে অর্থ বরাদ্দের সময় সরকার বিপুল অর্থের ব্যবস্থা করতে পারে। কিন্তু শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ সামাজিক খাতে ব্যয়ের প্রশ্নে অর্থের সীমাবদ্ধতার কথা শোনা যায়। এখানে নিরাপত্তার সংজ্ঞাটিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। নিরাপত্তা কি কেবল ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়া এবং অস্ত্রের মজুত বাড়ানো? নাকি মানুষের এমন বস্তুগত পরিস্থিতি নিশ্চিত করাও নিরাপত্তার অংশ, যেখানে তারা মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে, পড়াশোনা করতে পারে এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসা পায়? ফরাসি রাষ্ট্রের বর্তমান অগ্রাধিকার শ্রমজীবী মানুষের অগ্রাধিকারের সঙ্গে মিলছে না। তরুণদের বিক্ষোভের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
ফ্রান্সের বাইরে ইউরোপেও ক্ষোভ
ফ্রান্সে যে অসন্তোষ জমে উঠেছে, তার প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও। আলবেনিয়া থেকে ইতালি, স্পেন থেকে ফ্রান্স—বিভিন্ন জায়গায় লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমেছেন। প্রতিটি দেশের তাৎক্ষণিক কারণ আলাদা, কিন্তু সামাজিক সংকটের শিকড় অনেকটাই অভিন্ন।
স্পেনে ৮৭ বছর বয়সী মারিকারমেন আবাসকালকে তার বাসা থেকে উচ্ছেদের ঘটনা বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটায়। আলবেনিয়ায় ‘ফ্ল্যামিঙ্গো বিপ্লব’ নামে পরিচিত আন্দোলনের পেছনে রয়েছে জ্যারেড কুশনার ও ইভাঙ্কা ট্রাম্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানের রিসোর্ট নির্মাণের পরিকল্পনা। ঘটনাগুলোর মধ্যে সরাসরি মিল নেই। কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই উঠে আসছে কয়েকটি সাধারণ প্রশ্ন— আবাসনের দাম ক্রমাগত বাড়ছে কেন? মানুষের মজুরি কেন জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না? কেন সামাজিক সুরক্ষার কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে ইউরোপের বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে তাকাতে হয়। একদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি ও সামরিক ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থাগুলো সংকুচিত হচ্ছে। এই ব্যবধান মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলছে। এ ধরনের বিক্ষোভ আরও দেখা দিতে পারে। কিন্তু হতাশা থেকে জন্ম নেওয়া আন্দোলনের সামনে পথ সব সময় পরিষ্কার থাকে না। কৃচ্ছ্রসাধন ও যুদ্ধের প্রতি ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর অঙ্গীকার বহাল থাকলে মানুষের ক্ষোভের সহজ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সমাধানও দেখা যাচ্ছে না।

বিক্ষোভের পর কী?
ফ্রান্সের আন্দোলনের পরিণতি এখনো অনিশ্চিত। বিক্ষোভ সাধারণত ঢেউয়ের মতো আসে, আবার স্তিমিত হয়ে যায়। কিন্তু আন্দোলনের অভিজ্ঞতা অনেক সময় নতুন সংগঠন, রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক ও সম্মিলিত উদ্যোগের জন্ম দেয়।
হলুদ জ্যাকেট আন্দোলন থেকে স্থানীয় গণসমাবেশ গড়ে উঠেছিল। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে কমেরসিতে এসব সমাবেশের প্রতিনিধিরা একত্র হয়ে একটি ‘সমাবেশের সমাবেশ’ আয়োজন করেন। তবে সেখান থেকে দেশজুড়ে প্রভাব বিস্তার করতে পারে—এমন কোনো ঐক্যবদ্ধ জাতীয় দল গড়ে ওঠেনি। কিছু অংশগ্রহণকারী স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সাফল্য ছিল সীমিত। একইভাবে, আদামা ত্রাওরের মৃত্যুর বিচার দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন পুলিশি সহিংসতার বিরুদ্ধে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও নেটওয়ার্ককে শক্তিশালী করেছে। এসব সংগঠনের সঙ্গে হলুদ জ্যাকেট আন্দোলনের অংশগ্রহণকারীদেরও সহযোগিতা গড়ে উঠেছে। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে বোমোঁ-সুর-ওয়াজে যৌথ কর্মসূচি তার একটি উদাহরণ।
তবু মূল প্রশ্নটির মীমাংসা হয়নি: বিচ্ছিন্ন এসব আন্দোলনকে কীভাবে একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া যায়? এমন একটি শক্তি, যার অভিন্ন কর্মসূচি থাকবে এবং যে কৃচ্ছ্রসাধন, সামরিকীকরণ ও বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ গড়ে তুলতে পারবে। ২০২৪ সালের ফরাসি আইনসভা নির্বাচনে বামপন্থী দলগুলো একত্র হয়ে নিউ পপুলার ফ্রন্ট (এনপিএফ) জোট গঠন করে। এতে ছিল ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টি, লা ফ্রঁস ইনসুমিজ, সোশ্যালিস্ট পার্টিসহ আরও কয়েকটি দল। জোটটি নির্বাচনে সর্বাধিক আসন পেলেও প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাসের কারণে প্রধানমন্ত্রী পদ দাবি করতে পারেনি। এখন প্রশ্ন, এই আন্দোলনগুলো ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে। বামপন্থীরা যদি একজন অভিন্ন প্রার্থীকে সামনে আনতে পারে—যাদের মধ্যে জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁর নাম আলোচনায় রয়েছে—তাহলে তারা নতুন করে রাজনৈতিক শক্তি সঞ্চয় করতে পারে।
কিন্তু মধ্যপন্থী রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা কমে গেলে সুবিধা পেতে পারে উগ্র ডানপন্থীরাও। মেরিন ল্য পেনের ন্যাশনাল র্যালি অভিবাসীদের বিরুদ্ধে মানুষের অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে আরও কঠোর দমনমূলক নীতির দাবি তুলতে পারে। এতে মানুষের প্রকৃত সংকট—কাজ, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা ও সামাজিক মর্যাদার অভাব—আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফ্রান্সের রাস্তায় নামা তরুণেরা মূলত শিখতে চান, কাজ করতে চান এবং মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে চান। তাঁদের দাবি কোনো অসাধারণ সুবিধার নয়; তারা চান রাষ্ট্র তার মৌলিক দায়িত্ব পালন করুক।
এই আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে ক্ষোভকে কতটা সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়া যায়, তার ওপর। কারণ রাস্তায় মানুষের উপস্থিতি একা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার বদলে দিতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন সংগঠন, দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি এবং বিচ্ছিন্ন অসন্তোষকে একটি অভিন্ন দাবিতে পরিণত করার ক্ষমতা। ফ্রান্সের বর্তমান সংকট তাই শুধু ফ্রান্সের নয়। এটি এমন এক ইউরোপের সংকট, যেখানে যুদ্ধের জন্য অর্থ পাওয়া যায়, অথচ মানুষের জীবনকে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলার জন্য অর্থের অভাবের কথা বলা হয়। এই বৈপরীত্যের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বিক্ষোভের ঢেউ থামলেও তার নিচে জমে থাকা ক্ষোভ থেকে যাবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









