রাজধানীর পল্লবী এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী হামলা ও গুলিবর্ষণের ঘটনায় হৃদয় ওরফে গন্ডার (২৫) নামের আরেক সন্ত্রাসী গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই ঘটনায় আব্দুল্লাহ নামে আরেক সন্ত্রাসীর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনার পর থেকে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, একাধিক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কথিত মাদক সম্রাট লেংড়া রুবেল কীভাবে এখনো প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন?
মঙ্গলবার (৯ জুন) রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে পল্লবী থানার সেকশন-১২, ব্লক-ই, রোড-৬ এর ১৮ ও ১৯ নম্বর বাড়ির মধ্যবর্তী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ওই রাতে হৃদয় ওরফে গন্ডার এলাকায় অবস্থান করছিলেন। এ সময় পূর্বশত্রুতা ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একদল অস্ত্রধারী ব্যক্তি তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীরা দেশীয় অস্ত্রের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে একাধিক রাউন্ড গুলি ছোড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে হৃদয় গুরুতর আহত হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
স্থানীয়রা জানান, পরে তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। তবে ঘটনার পর তার অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হৃদয়কেও আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা এদিনকে জানান, হামলার সময় হৃদয়ের সহযোগী আব্দুল্লাহকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় সশস্ত্র হামলাকারীরা। এরপর থেকে তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। এদিকে হৃদয় ও আব্দুল্লাহর পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাদের দেখা পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হামলার নেতৃত্বে ছিলেন লেংড়া রুবেল, মো. রাব্বি ওরফে গালকাটা রাব্বি এবং আকাশ ওরফে টান আকাশ। এ ঘটনায় আরও যাদের নাম উঠে এসেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন পারভেজ ওরফে রেপার পারভেজ এবং আল-আমিন। তারা সবাই পল্লবী এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর এলাকাবাসীর মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকেই দাবি করছেন, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে আসছে। সর্বশেষ গুলিবর্ষণের ঘটনাটি সেই দ্বন্দ্বেরই ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ।
এদিনের অনুসন্ধানে জানা যায়, টান আকাশ, গালকাটা রাব্বি, পারভেজ, আল-আমিন, আব্দুল্লাহ ও হৃদয় ওরফে গন্ডার এরা সবাই কোনো না কোনো সময় লেংড়া রুবেলের অনুসারী বা ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই এই সংঘর্ষের সূত্রপাত।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টান আকাশ এবং গালকাটা রাব্বির বিরুদ্ধে অতীতে হত্যা, মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর টান আকাশ পুনরায় এলাকায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং তার নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানান, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে অনেকেই ভয় পান। তাদের অভিযোগ, থানায় মৌখিক ও লিখিতভাবে অভিযোগ দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
স্থানীয়দের আরও দাবি, টান আকাশ ও গালকাটা রাব্বি দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। তারা শাহাজাদী নামে এক কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ীর ছত্রছায়ায় এসব কার্যক্রম পরিচালনা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। মাদক সরবরাহ ও বণ্টন নেটওয়ার্কে তার সম্পৃক্ততার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা।
এলাকাবাসীর অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন লেংড়া রুবেল। স্থানীয়দের দাবি, পেপার সানি হত্যা মামলার প্রধান আসামি হিসেবে তার নাম আলোচিত হলেও তিনি দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। তাদের প্রশ্ন, একের পর এক গুরুতর অপরাধের অভিযোগ ওঠার পরও কীভাবে তিনি প্রকাশ্যে চলাফেরা করছেন এবং তার অনুসারীরা এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে যাচ্ছে?
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পল্লবীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। মাঝে মধ্যেই সংঘর্ষ, হামলা, গুলিবর্ষণ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তার শঙ্কায় প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চান না। ফলে অনেক ঘটনাই আনুষ্ঠানিক অভিযোগে রূপ নেয় না বলে দাবি স্থানীয়দের।
একজন প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, আমরা সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। প্রতিনিয়ত গোলাগুলি, মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের খবর শুনতে হচ্ছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
ঘটনার প্রায় একসপ্তাহ হলেও এখন পর্যন্ত কেনো অভিযোগ বা মামলা হয়নি জানতে চাইলে পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হাসান বাসির বলেন, গুলিবর্ষণ ও নিখোঁজের অভিযোগের বিষয়টি আমি জেনে সাথে সাথে সরজমিনে গিয়ে কিছু সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করি। এই ঘটনার রহস্য উন্মোচন করতে পুলিশ আরও তথ্য সংগ্রহ করছে এবং বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা দায়ের হয়নি। কেউ অভিযোগ দিলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
লেংড়া রুবেল, টান আকাশ ও গালকাটা রাব্বির বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ প্রসঙ্গে ওসি হাসান বাসির বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, তথ্য-প্রমাণ বা মামলা থাকলে পুলিশ অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেয়। অপরাধী যে-ই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
পুলিশের আরও একটি সূত্র জানায়, ঘটনার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং নিখোঁজ আব্দুল্লাহর সন্ধানে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি গুলিবর্ষণের অভিযোগের বিষয়েও খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো বাদী না থাকায় এখনো এ ঘটনায় আনুষ্ঠানিক মামলা হয়নি বলে জানা গেছে।
এদিকে সাম্প্রতিক গুলিবর্ষণ, আহত ও নিখোঁজের ঘটনায় পল্লবী এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত জড়িতদের গ্রেপ্তার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক কারবারের বিরুদ্ধে অভিযান এবং এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, অভিযোগগুলো সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করা হলে ঘটনার প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং এলাকায় সক্রিয় অপরাধী চক্রের নেপথ্যের তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে। একই সঙ্গে নিখোঁজ ব্যক্তির নিরাপদ উদ্ধার, আহতের প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ এবং গুলিবর্ষণের ঘটনায় দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবিও ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









