বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড সমুন্নত রাখতে কর্তৃপক্ষ ‘ব্যর্থ হচ্ছে’ বলে অভিযোগ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
আন্তর্জাতিক এই মানবাধিকার সংস্থা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলছে, এই ‘ব্যর্থতার’ ফলে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া, আইনের শাসন দুর্বল হওয়া, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মিথ্যা অভিযোগে কারাবন্দি করা এবং অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ‘পুনরাবৃত্তির’ ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
শাপলা চত্বর মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের অভিযোগপত্র জমা পড়ার বিষয়টি সামনে এনে বুধবার এই প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এইচআরডব্লিউ।
মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ১৩ বছর আগে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ‘হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের’ মামলায় গত ২৭ জুলাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন।
ওই মামলার আসামিদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং দুই সাংবাদিকও রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত ‘গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ অভিযোগ আনা হয়েছে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত অসংখ্য নিপীড়নের জন্য দায়ীদের উপযুক্ত জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত, তবে অনেক বিচার প্রক্রিয়াই আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে।
বাংলাদেশের উচিত জরুরি ভিত্তিতে তাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার সংস্কার করা এবং ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত ও মনগড়া অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার কোনো সুযোগ যেন না থাকে, তা নতুন সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ট্রাইব্যুনাল ছয়টি মামলার বিচার শেষ করেছে। এতে মানবতাবিরোধী অপরাধে ৬২ জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে শেখ হাসিনাসহ ৪২ জনের বিচার হয়েছে অনুপস্থিতিতে এবং ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
সংস্থাটি স্মরণ করিয়ে দেয়, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধের বিচার করতে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ট্রাইব্যুনাল অতীতেও রাজনৈতিক পক্ষপাত ও যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়ার ঘাটতির অভিযোগে আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছিল।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে কিছু অপরাধ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হলেও বিদ্যমান আইনি কাঠামো এখনও আন্তর্জাতিক ন্যায্য বিচার মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি।
এইচআরডব্লিউর দাবি, স্পষ্ট প্রমাণের মানদণ্ড পূরণ না করেও প্রসিকিউশন গ্রেফতার চাইতে পারে, লিখিত কারণ ছাড়াই আটক ব্যক্তিদের মাসের পর মাস হেফাজতে রাখা যায় এবং বিচার শুরুর আগেই অন্য আদালতে আপিলের সুযোগ নেই।
এছাড়া আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য অল্প সময় দেওয়া, পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়া অনুপস্থিতিতে বিচার অব্যাহত রাখা এবং জেরা চলাকালে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের ওপর বিধিনিষেধেরও সমালোচনা করেছে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সমাবেশ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ঘটনায় গত ১৪ মে সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রূপার গ্রেফতারের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়। এইচআরডব্লিউর দাবি, তাদের আইনজীবীরা অভিযোগ করেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন এবং আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের বিধান অনুযায়ী গ্রেফতারের লিখিত কারণ প্রসিকিউশন দেয়নি।
এছাড়া ২৭ জুলাই দাখিল করা অভিযোগপত্রে দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে সংস্থাটি। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যার অভিযোগ প্রমাণের জন্য কোনও জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার উদ্দেশ্যের প্রমাণ থাকতে হয়।
চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের ২২ নেতা-কর্মীকে জড়িয়ে করা একটি মামলারও উল্লেখ করেছে এইচআরডব্লিউ। সংস্থাটির দাবি, কয়েকটি সাক্ষ্যবিবরণীতে রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার পরিকল্পনা, অর্থায়ন ও নির্দেশনার অভিযোগে অভিন্ন ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা প্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।
একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটর ১ কোটি টাকার বিনিময়ে এক আসামিকে জামিনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এমন অভিযোগও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। অডিও রেকর্ড প্রকাশের পর ওই প্রসিকিউটর পদত্যাগ করলেও প্রধান প্রসিকিউটরের দফতর এখনও তদন্ত শেষ করেনি। এদিকে, মামলার বিচার আগামী ৬ আগস্ট শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
গুরুতর অপরাধের বিচার যেন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে ন্যায্য, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
সূত্র: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









