জুলাই-অগাস্টের আন্দোলন দমনের চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মামলার রায় আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন ঘোষণা হতে পারে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ—উভয়ের যুক্তিতর্ক শেষ হয়েছে। এখন মামলাটি রায় ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী সপ্তাহের যেকোনো দিন রায় হতে পারে বলে তারা আশা করছেন।
চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচার শুরু হয়। এর আগে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর প্রসিকিউশনের দেওয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, জুলাই-অগাস্টের আন্দোলন দমনে আসামিরা সমন্বিতভাবে নির্দেশনা, প্ররোচনা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে আন্দোলন প্রতিরোধের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি একাধিক বৈঠকে সহিংসতার পরিকল্পনাও করা হয়। বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র হামলা, কঠোর দমন-পীড়ন এবং গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণেও আসামিদের ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
এসব কর্মকাণ্ডের কারণে দেশজুড়ে হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও ব্যাপক সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে এবং এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে বলে ট্রাইব্যুনালে দাবি করেছে প্রসিকিউশন।
সাত আসামিই পলাতক
মামলার সাত আসামির সবাই বর্তমানে পলাতক। ওবায়দুল কাদের ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
দুই পক্ষের যুক্তিতে যা উঠে আসে
গত ১২ অগাস্ট রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি আসামিদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে দাবি করে সর্বোচ্চ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আবেদন করেন।
পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা আইনি লড়াই করেন। ওবায়দুল কাদের, বাহাউদ্দিন নাছিম ও মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আইনজীবী এম হাসান ইমাম।
তিনি আদালতে দাবি করেন, জনগণের জানমাল রক্ষায় ‘শুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তার মক্কেলরা কোনো ‘কমান্ডিং পজিশনে’ ছিলেন না এবং কাউকে হত্যার নির্দেশও দেননি।
অন্যদিকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন আইনজীবী ইশরাত জাহান। তিনি দাবি করেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন দমনের ঘটনায় তার মক্কেলদের নাম আসেনি। একই সঙ্গে তারা অধীনস্ত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছিলেন বলেও আদালতে তুলে ধরেন।
ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে বিশৃঙ্খলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না জানতে চাইলে আইনজীবী বলেন, জুলাইয়ের শুরু থেকে ৪ অগাস্ট পর্যন্ত চলা বিশৃঙ্খলার কারণে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
এ ছাড়া মামলায় কোনো নারী সাক্ষী না থাকা এবং ভিডিও ফুটেজে আসামিদের হাতে লাঠিসোঁটা থাকার প্রমাণ না পাওয়ার বিষয়টিও যুক্তিতে তুলে ধরা হয়। চার আসামির খালাসের আবেদন জানান তিনি।
যেভাবে শেষ হলো বিচারিক কার্যক্রম
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। ওইদিন প্রথম সাক্ষী হিসেবে শহীদ আসিফ ইকবালের বাবা এম এ রাজ্জাক ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেন।
তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ২৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। প্রথম দফায় ২৭ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। পরে প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ জুলাই সাংবাদিক আশরাফ কায়সারের অতিরিক্ত জবানবন্দি নেওয়া হয়।
এরপর ২ অগাস্ট তদন্ত কর্মকর্তার পুনরায় জেরা ও সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্য পর্ব চূড়ান্তভাবে শেষ হয়।
সবশেষ ১৭ অগাস্ট উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হলে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ মামলাটি রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন।
এখন আগামী সপ্তাহে এই মামলার রায় ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









