স্ত্রীর মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন রতন পোদ্দার (৫৫)। মাত্র এক মাস আগে হৃদরোগে স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন তিনি। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন রতন। সেই মানুষটি বুধবার সন্ধ্যায় চলন্ত গাড়ি থামাতে গিয়ে যাত্রীবাহী বাসের ধাক্কায় মারা গেলেন। বাবাকেও হারিয়ে এখন অসহায় হয়ে পড়েছে তার ছোট দুই সন্তান মেঘা ও গোপাল।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় শরীয়তপুর জেলা শহরের ধানুকা বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ স্টেডিয়ামের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত রতন পোদ্দার শরীয়তপুর পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ মধ্যপাড়ার বাসিন্দা। তিনি মৃত গৌরঙ্গ পোদ্দারের ছেলে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার বিকেল থেকেই স্টেডিয়ামের সামনে চলাচলকারী গাড়িগুলোকে হাতের ইশারায় সরিয়ে দিচ্ছিলেন রতন পোদ্দার। তার এমন কর্মকাণ্ড দেখে স্থানীয় অনেকেই মোবাইল ফোনে ভিডিও করছিলেন। সন্ধ্যার দিকে শরীয়তপুর আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির একটি মিনিবাস ওই সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় রতন হাতের ইশারা দিলে বাসটি তাকে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়।
গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানোর পরামর্শ দেন। পরে অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকার উদ্দেশ্যে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা ধাওয়া করে বাস ও চালককে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন।
পরিবার ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় এক মাস আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান রতন পোদ্দারের স্ত্রী। স্ত্রীর মৃত্যুর পর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন রতন। ধীরে ধীরে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।
রতন দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। এখন ছোট দুই সন্তানই ছিল তাদের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু মায়ের মৃত্যুর এক মাস না পেরোতেই বাবাকেও হারিয়ে তারা এখন কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে।
রতনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজন ও প্রতিবেশীদের প্রশ্ন মা-বাবা দুজনকেই হারানো এই দুই শিশুর ভবিষ্যৎ এখন কী হবে?
রতনের প্রতিবেশী মো. শহিদুল ইসলাম ঢালী বলেন, “রতনের স্ত্রী মারা গেছে মাসখানেক আগে। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছিলেন। আজ সড়ক দুর্ঘটনায় তিনিও মারা গেলেন। তাদের তিন সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট দুই সন্তানকে দেখার মতো এখন আর কেউ রইল না। আমরা চাই, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার বিচার হোক। একই সঙ্গে অসহায় শিশু দুটির জন্য একটি ব্যবস্থা করা হোক।”
এদিকে দুর্ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্থানীয়দের বিভিন্ন মন্তব্য দেখা গেছে। অনেকেই শহরের ব্যস্ত সড়কে লোকাল বাস ও অন্যান্য যানবাহনের অতিরিক্ত গতি ও বেপরোয়া চালানোর অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয়দের কেউ কেউ বলছেন, জেলা শহরের ভেতরের সড়কে পথচারী, শিক্ষার্থী, শিশু ও বয়স্ক মানুষের চলাচল বেশি। সেখানে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই শহরের ভেতরে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ, চালকদের সতর্কতা এবং নিয়মিত ট্রাফিক নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
শরীয়তপুর আন্তঃজেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহমেদ তালুকদার বলেন, “আমাদের লোকাল বাসের ধাক্কায় এক মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি আহত হয়েছেন—এ খবর শুনে আমরা দ্রুত মালিক সমিতির অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকায় পাঠাই। কিন্তু পথে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আমরা মর্মাহত। মালিক সমিতি তার সাধ্যমতো নিহতের পরিবারের পাশে থাকবে।”
পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ আলম বলেন, “ইতোমধ্যেই আমরা বাস ও চালককে আটক করেছি। যেহেতু ভিকটিম মারা গেছেন, তাই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”
রতনের মৃত্যুতে এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে তার ছোট দুই সন্তান। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে মা-বাবা দুজনকেই হারিয়ে মেঘা ও গোপালের জীবনে নেমে এসেছে গভীর অন্ধকার।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অসহায় দুই শিশুর ভবিষ্যতের দায়িত্ব নিতেও এগিয়ে আসবে সমাজ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









