টিকটক ব্যবহারকারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি গুঞ্জন প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, গভীর রাত পর্যন্ত টানা ভিডিও দেখতে থাকলে এবং অ্যালগরিদমের স্বাভাবিক সুপারিশ শেষ হয়ে এলে, হঠাৎ করেই ব্যবহারকারী এমন কিছু ভিডিওর মুখোমুখি হতে পারেন, যা সাধারণ অভিজ্ঞতার সম্পূর্ণ বিপরীত। তবে অনেকের মতে, কেবল স্ক্রল করলেই সেখানে পৌঁছানো যায় না। প্রয়োজন হয় অন্য একজন ব্যবহারকারীর দেওয়া একটি বিশেষ কোডের। সাধারণত ভিডিওর কমেন্টে এলোমেলো অক্ষর ও সংখ্যার একটি স্ট্রিং শেয়ার করা হয়। সেই কোড টিকটকের সার্চ বক্সে লিখে অনুসন্ধান করলে ফারল্যান্ডসের ভিডিও পাওয়া যেতে পারে বলে দাবি করা হয়।
ইন্টারনেট সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিবেদক ও মিম গবেষক এইডান ওয়াকার বলেন, “অ্যালগরিদমের সুপারিশ অনুসরণ করে সেখানে পৌঁছানো যায় না। আপনাকে সেখানে নিয়ে যেতে একজন মানুষের আমন্ত্রণ প্রয়োজন।” গত কয়েক মাসে ‘ফারল্যান্ডস’ নিয়ে আলোচনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে একদিকে যেমন ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও ইন্টারনেটভিত্তিক লোককাহিনীর উপাদান রয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম কতটা নিয়ন্ত্রণ করছে ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা, সেই প্রশ্নও উঠে এসেছে। অনেক ব্যবহারকারী বিশ্বাস করেন, তারা টিকটকের অ্যালগরিদমকে ফাঁকি দিয়ে এমন ভিডিও সামনে আনতে সক্ষম হচ্ছেন, যেগুলো প্ল্যাটফর্মটি সাধারণভাবে দেখাতে চায় না। ফলে বিষয়টি একদিকে যেমন মিম সংস্কৃতির অংশ, অন্যদিকে সামাজিক প্রতিরোধ বা ডিজিটাল প্রতিবাদেরও একটি রূপ হয়ে উঠেছে।
টিকটককে সাধারণত এমন একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে দেখা হয়, যেখানে অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীদের সামনে একের পর এক বিনোদনমূলক, ইতিবাচক ও জনপ্রিয় ভিডিও তুলে ধরে। সমালোচকদের কেউ কেউ এটিকে অতিরিক্ত ‘পরিচ্ছন্ন’ বা ‘স্যানিটাইজড’ বলেও আখ্যা দেন। কিন্তু এই পরিচিত জগতের আড়ালেই নাকি রয়েছে আরেকটি অচেনা স্তর। অদ্ভুত, ভয়ঙ্কর, বিকৃত এবং কখনো কখনো গভীরভাবে অস্বস্তিকর ভিডিওতে ভরা এক ডিজিটাল অঞ্চল, যার নাম ‘টিকটক ফারল্যান্ডস’ ।
এটি আদৌ বাস্তব নাকি ইন্টারনেটের আরেকটি নগরকথা, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে অনেক ব্যবহারকারীর দাবি, টিকটকের স্বাভাবিক অ্যালগরিদম যেসব ভিডিও দেখায় না, সেগুলোর একটি অংশে বিশেষ উপায়ে পৌঁছানো সম্ভব। অনেকে এটিকে ভবিষ্যতের ইন্টারনেটের একটি ঝলক বলেও মনে করছেন।
ঢুকে পড়েছেন।”
কী দেখা যায় সেখানে?
এইডান ওয়াকারের একটি ভিডিওর নিচে দেওয়া মন্তব্য থেকে কয়েকটি কোড সংগ্রহ করে সেগুলো অনুসন্ধান করার পর প্রতিবেদক সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের টিকটক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন।
সেখানে দেখা যায়- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি দুঃস্বপ্নের মতো বিকৃত চরিত্র। পিক্সেল বিকৃতিতে বিকলাঙ্গ হয়ে যাওয়া মানুষের মুখ। টেলিভিশনের তারের সঙ্গে শিরা-উপশিরা যুক্ত এক ভিনগ্রহের প্রাণী, যন্ত্রণায় চিৎকার করছে; আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোর ভিডিও গেমের কন্ট্রোলার হাতে তাকিয়ে আছে। বিকৃত শব্দ, করাপ্টেড ভিডিও এবং ভৌতিক দৃশ্যের সমন্বয়ে তৈরি অস্বস্তিকর কনটেন্ট।
এসব ভিডিওর অনেকগুলোই এতটাই অস্বাভাবিক ও ভয়াবহ। সংবাদমাধ্যম বিবিসি সেগুলোর লিংক প্রকাশ করা থেকে বিরত থেকেছে। একই সঙ্গে পাঠকদের সতর্ক করে বলা হয়েছে, কৌতূহলবশত এসব ভিডিও খুঁজতে গেলে মানসিকভাবে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে পারেন।
রহস্যময় কোডগুলোর উৎস কী?
ফারল্যান্ডসে প্রবেশের জন্য ব্যবহৃত এলোমেলো অক্ষর ও সংখ্যার স্ট্রিংগুলো কোথা থেকে আসে, তা নিয়েও রয়েছে রহস্য। কখনো কোনো নির্মাতা নিজেই ভিডিওতে এমন কোড যুক্ত করে নিজের কনটেন্ট প্রচার করেন। আবার কয়েকজন ব্যবহারকারীর দাবি, তারা কেবল কীবোর্ডে এলোমেলোভাবে চাপ দিয়েই এমন কোড খুঁজে পেয়েছেন। আরো একটি জটিলতা হলো, একই কোড ভিন্ন ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে ভিন্ন ফলাফল দেখাতে পারে। কারণ টিকটকের সার্চ ব্যবস্থাও ব্যবহারকারীর ভিত্তিতে আলাদা ফলাফল প্রদর্শন করে।
এইডান ওয়াকারের মতে, “এখানে মূল আনন্দটাই হলো টিকটককে এমনভাবে ব্যবহার করা, যেভাবে প্ল্যাটফর্মটি তৈরি করা হয়নি। আপনি স্বাভাবিক সীমা অতিক্রম করে এমন এক জায়গায় পৌঁছে যান, যেখানে আসলে কেউই নিশ্চিত নয় কী ঘটছে।”
‘আমি ফারল্যান্ডসে থাকতে চাই’
এই ভিডিওগুলোর মন্তব্যে প্রায়ই বড় বড় ব্লকে লেখা দেখা যায়—“I WANT TO STAY IN THE FARLANDS”।
অনেক ব্যবহারকারীর বিশ্বাস, ৫০০ শব্দের দীর্ঘ মন্তব্য লিখলে টিকটকের অ্যালগরিদম একই ধরনের আরো ভিডিও দেখাতে শুরু করে। তবে এ দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে না। বিষয়টি জানতে বিবিসি টিকটকের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও প্রতিষ্ঠানটি কোনো মন্তব্য করেনি।
জেসিকা ম্যাডক্স বলেন, ‘মানুষ তাদের নিউজফিড ও অনলাইন অভিজ্ঞতার নিয়ন্ত্রণ আবার নিজেদের হাতে নিতে চাইছে। এটি দেখায় যে মানুষ অ্যালগরিদম নির্ভর ফিডে ক্লান্ত এবং এগুলো তাদের জীবনে কতটা প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন’
তিনি আরো বলেন, ‘ইন্টারনেট এখন এতটাই বিশৃঙ্খল যে, এক অর্থে ফারল্যান্ডস মানুষের কাছে এমন একটি জায়গার প্রতীক, যেখানে পৌঁছে মনে হয় অবশেষে ইন্টারনেটের শেষ প্রান্তে এসেছি এবং এখানেই থামা সম্ভব।‘
লেখক - থোমাস জার্মেইন
অনুবাদক - ইসলামুল হাফিজ নির্জন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









