বাংলাদেশের সবচেয়ে রহস্যময় অথচ আকর্ষণীয় জনপদের কথা বললে সবার আগে আসে সুন্দরবনের নাম। পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটি নদী ও গাছপালার এক অনন্য সহাবস্থান। জোয়ার-ভাটার ছন্দে বদলে যাওয়া প্রকৃতি, বাতাসে মিশে থাকা বুনো গন্ধ আর অজানা আহ্বান—সব মিলিয়ে সুন্দরবন যেন এক জীবন্ত বিস্ময়।
এই বিশ্বখ্যাত অরণ্যের খুব কাছেই রয়েছে এমন একটি জায়গা, যেখানে ঢাকা থেকে সকালে রওনা হয়ে দুপুরের মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায়। নাম পিয়ালী ইকো রিসোর্ট অ্যান্ড কালচারাল সেন্টার। পরিবেশবান্ধব নির্মাণশৈলী, নিজস্ব ইকোসিস্টেম এবং প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা নান্দনিক পরিবেশের কারণে এটি অন্য অনেক রিসোর্ট থেকে আলাদা।
যারা শহরের ব্যস্ততা থেকে কিছু সময়ের জন্য মুক্তি খুঁজছেন, তাদের জন্য এটি হতে পারে আদর্শ আশ্রয়। নদীর ধারে বসে সূর্যাস্ত দেখা, পাখির ডাক শুনে ঘুম ভাঙা, বনের নীরবতা অনুভব করা কিংবা স্থানীয় টকঝাল খাবারের স্বাদ নেওয়া—সব মিলিয়ে এখানে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে স্মরণীয়।
আমাদের ভ্রমণের শুরু হয়েছিল খুলনাগামী বাসে। এই পথে এনা, সোহাগ পরিবহন, টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস, গ্রিন লাইন, ইমাদসহ বিভিন্ন পরিবহনের বাস চলাচল করে। বাসভেদে ভাড়া শুরু হয় প্রায় ৬৮০ টাকা থেকে।

ঢাকা ছাড়ার পর ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। কংক্রিটের নগরজীবন পেছনে ফেলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে সবুজ মাঠ, নদী আর গ্রামীণ জনপদের চিরচেনা সৌন্দর্য। সকাল ৭টায় যাত্রা শুরু করে প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে পৌঁছালাম কাটাখালী মোড়ে। সুন্দরবন বা মোংলাগামী যাত্রীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট পয়েন্ট।
কাটাখালী মোড় থেকে মোংলার দূরত্ব প্রায় ৪৩ কিলোমিটার। স্বল্প খরচে যেতে চাইলে লোকাল বাস পাওয়া যায়, আর আরামদায়ক ভ্রমণের জন্য রয়েছে মাইক্রোবাস বা ব্যক্তিগত গাড়ি। আমরা একটি রিজার্ভ হাইসে রওনা দিলাম। মাত্র ৫০ থেকে ৫৫ মিনিটে পৌঁছে গেলাম মোংলা। পথের দুই পাশের সবুজ প্রকৃতি, নদীর ছোঁয়া আর দক্ষিণাঞ্চলের সহজ-সরল জীবনযাত্রা ভ্রমণের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
মোংলা ফেরিঘাটে পৌঁছাতেই রিসোর্টের নৌকা আমাদের নিতে চলে এলো। ঝলমলে রোদ আর পিয়ালী নদীর শীতল হাওয়ায় শুরু হলো জলপথের যাত্রা। এখানে মূলত হাইব্রিড নৌকা ব্যবহার করা হয়, যা নিরাপদ ও আরামদায়ক।
মোংলার আলাদা এক সৌন্দর্য আছে। চারপাশে নদী, ছোট ছোট ট্রলার আর সুন্দরবনের আবহ মিলিয়ে জায়গাটি যেন এক অন্য জগৎ। পশুর নদী পেরিয়ে আমাদের গন্তব্য বানিশান্তা ইউনিয়ন—সেখানেই নদীর ধারে প্রকৃতির কোলে দাঁড়িয়ে আছে পিয়ালী ইকো রিসোর্ট।
নদী আর সরু খালপথ ধরে রিসোর্টের দিকে এগোতে এগোতে চারপাশে যেন সুন্দরবনেরই প্রতিচ্ছবি। সবুজের নীরবতা, আলো-ছায়ার খেলা, দূরে জেলেদের ছোট নৌকা আর নদীকেন্দ্রিক জীবনযাপন—সব মিলিয়ে মনে হয় প্রকৃতি এখানে এখনও নিজের ছন্দে বেঁচে আছে।

খালের দুই পাশে ঘন গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে হরিণ দেখা যায়। কোথাও লোনা পানিতে ভেসে থাকে কুমির, কোথাও রোদ পোহায় বিশাল গুইসাপ। আকাশজুড়ে উড়ে বেড়ায় নানা প্রজাতির পাখি। তাদের ডাক আর নদীর শব্দ পুরো যাত্রাকে করে তোলে আরও জীবন্ত।
আমাদের যাত্রাটাও ছিল রোমাঞ্চে ভরা। শুরুতে বানর, পাখি আর গুইসাপ দেখলেও কিছুক্ষণ পর নদীর তীরে বিশাল এক লোনা পানির কুমির চোখে পড়ল। সেই মুহূর্তে চারপাশ যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠল। নৌকা থেকে কুমিরটিকে নিশ্চুপ বসে থাকতে দেখা সত্যিই এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
প্রায় দেড় ঘণ্টার নৌযাত্রা শেষে চোখে পড়ল পিয়ালী ইকো রিসোর্ট। অন্য অনেক রিসোর্টের মতো এখানে কৃত্রিম জাঁকজমক নেই। বরং সবকিছুই নির্মিত হয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে।
রিসোর্টের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর প্রদীপ রায় জানান, প্রকৃতিকে বিনষ্ট না করেই রিসোর্টটি গড়ে তোলা হয়েছে। নদীর ওপর কোনো স্থায়ী স্থাপনা নেই, চারপাশে এখনও গোলপাতা, কেওড়া ও বুনো গাছপালা অক্ষত রয়েছে। এখানে মানুষ প্রকৃতির ওপর আধিপত্য করতে নয়, বরং তার সঙ্গে সহাবস্থান করতে এসেছে।
সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো, নদী আর বনের সৌন্দর্য কোনো নির্দিষ্ট কটেজের জন্য সংরক্ষিত নয়। প্রতিটি অতিথিই সমানভাবে উপভোগ করতে পারেন প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য।
রিসোর্টে পৌঁছেই গোলপাতা দিয়ে তৈরি প্রবেশপথ আমাদের স্বাগত জানাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিবেশন করা হলো স্থানীয় তরমুজ দিয়ে তৈরি ওয়েলকাম ড্রিংক। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি মুহূর্তেই দূর হয়ে গেল।

এখানে রয়েছে দুটি এসি ফ্যামিলি কটেজ, তিনটি নন-এসি ফ্যামিলি কটেজ, দুটি নন-এসি ডুপ্লেক্স কাপল কটেজ এবং বন্ধুদের জন্য দুটি ফ্রেন্ডস রুম। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ জনের থাকার ব্যবস্থা। বাঁশ, বেত, কাঠ ও গোলপাতা দিয়ে তৈরি প্রতিটি কটেজ যেন সুন্দরবনেরই একটি অংশ। জনপ্রতি ২,৫০০ টাকা থেকে শুরু হয় ফুলবোর্ডিং প্যাকেজ।
রাতে সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে এখানকার নীরবতা। দূরের জঙ্গলের শব্দ আর বাতাসের মৃদু সুরে অন্যরকম এক আবহ তৈরি হয়। রিসোর্টের পুকুরে চাইলে সাঁতার কাটা যায়, আবার ছিপ ফেলে মাছ ধরার অভিজ্ঞতাও নেওয়া যায়।
লঞ্চে করে ঘুরে দেখা যায় আশপাশের গ্রামীণ জীবন। সরু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে দেখা মেলে মানুষের জীবনসংগ্রাম, সংস্কৃতি আর সরল জীবনযাত্রার। শহরের ব্যস্ত পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা যেন এই জনপদ।
রিসোর্টের কাছেই রয়েছে বানিশান্তা মন্দির। গোলপাতা আর সবুজে ঘেরা নদীতীরের এই স্থানটিতে পা রাখলেই এক ধরনের রহস্যময় শান্তি অনুভূত হয়।
সুন্দরবনের এই অঞ্চলে বনবিবিকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তি। জেলে, মৌয়াল ও বাওয়ালিরা বনে প্রবেশের আগে বনবিবির কাছে প্রার্থনা করেন। প্রতি বছর মাঘ-ফাল্গুন মাসে এখানে বনবিবির পূজা অনুষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই পূজায় ধর্মের কোনো বিভাজন নেই। হিন্দু ও মুসলিম—উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে অংশ নেন। সহাবস্থান আর সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে এই আয়োজন।

বিকেলে আবার নৌকায় করে বের হলাম খালপথে। পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট পরে নিরাপদে এগিয়ে চলল আমাদের নৌকা। দুই পাশে ঘন বন, পাখির ডাক, পাতার শব্দ আর পানির ঢেউ মিলিয়ে যেন প্রকৃতির হৃদয়ের ভেতর প্রবেশ করলাম।
সন্ধ্যায় রিসোর্টে ফিরে চারপাশের পরিবেশ আরও মোহময় হয়ে ওঠে। কটেজের আলো, আকাশভরা তারা, হাম্মক, দোলনা আর বন্ধুদের আড্ডা—সব মিলিয়ে সময় যেন থেমে যায়।
দুর্ভাগ্য, আমরা পূর্ণিমার রাত পাইনি। তবে অর্ধচন্দ্রের আলোতেও নদীর ধারে বসে কাটানো সময় ছিল অসাধারণ। কখন যে গভীর রাত নেমে এসেছিল, টেরই পাইনি।
পরদিন সকালে আবার প্রকৃতির শান্ত পরিবেশে ঘুম ভাঙল। এবার আর কোনো তাড়াহুড়ো নেই। নদীর হাওয়া, চারপাশের নীরবতা আর প্রিয় মানুষের সঙ্গে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তই যেন এই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
বিকেলে লাঞ্চ শেষ করে রওনা দিলাম মোংলার পথে। কাটাখালী থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার বাস ধরতে হবে। ফিরে আসছি ঠিকই, কিন্তু সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছি সুন্দরবনের বুনো সৌন্দর্য, নদীর হাওয়া আর প্রকৃতির কাছে কাটানো দুটি স্মরণীয় দিনের অমূল্য স্মৃতি।
লেখক : ইশতিয়াক আহমেদ


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









