কখনও ভাবিনি আফ্রিকা দেখব। লেসোথো তো দূরের কথা। একবার আমার স্বামী তোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী স্কটল্যান্ডের একটি টিমের সঙ্গে কাজ করতে যান। আমি বাড়ি, স্কুল, মেয়ে সব সামলিয়ে তার সঙ্গে যেতে পারিনি। তবে উনি যখন দুই বছর ওখানে, সাগর মন্ট্রেতে দুই সপ্তাহ কাটিয়ে এসেছি। আমার আবাকের লেখার উৎসমুখ সেই ভ্রমণ।
লেসোথো সাউথ আফ্রিকার মাঝখানে একটি ছোট দেশ। ৩০ হাজার বর্গমাইল তার আয়তন। সমুদ্রপিঠ থেকে ১ হাজার ফুট উঁচুতে এ দেশ। সরা বলে-লেসোথো ‘এ কিংডম অন দ্য মাউন্টেন’। দেশটির নাম আগে ছিল বাসুটোল্যান্ড। মোরেস মোরেসোহো নামে এক বীর সাউথ আফ্রিকার সঙ্গে যুদ্ধ করে দেশটির অস্তিত্ব বজায় রাখেন। মোরেনা মানে মোড়ল। ঠিক তাই, একজন মোড়ল চারপাশের ডাচ, জার্মান, হিল্যান্ডেনদের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকিয়ে রেখেছিলেন এই দেশ। তিনি কিছুতেই সাউথ আফ্রিকার অধীনে যাবেন না। ওরা করেছিল অসম্ভব বন্দুক নিয়ে যুদ্ধ আর ওই মোরেনা ও তার দলের ছিল পাথর, তির-ধনুক এসব। জায়গাটি পাহাড়ি তাই ওরা বা ওইরকম কোনো জায়গায় লুকিয়ে যুদ্ধ চালিয়েছিল দিনের পর দিন।
চারপাশের অনেক অংশ ওরা নিজে গিলেছিল তবে দেশটি নয়। এ মোরেরার জন্ম ১৭৮৬ সালে এবং তিনি মারা যান ১৮৭০ সালে। মারা যাওয়ার সময় ব্রিটিশদের সঙ্গে সরা তার দেশ দেখতো তার মানে, একটি প্রটেক্টরেট দেশ হয়ে ১৮৬৮ থেকে ১৯৬৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বেঁচে ছিল। ১৯৬৬ সালে লেসোথো নাম নিয়ে বাসুটোল্যান্ড স্বাধীন হয়। দেশের নাম হয় লেসোথো এবং রাজধানী মাসেরু। সে দেশে আমি গিয়েছিলাম। দেশটি ভুলতে পারিনি। ওই টিমের সঙ্গে আমি ছিলাম লেসোথোর এক গ্রামে সাত দিন। যে বাসের কথা জুহুর বা কোনো সম্ভব নয়। ওই টিম গ্রামে ছিল ভাষা শেখার জন্য আর কোথায় কোথায় রাস্তা বা কালভার্ট হবে সেসব জানতে। আর আমি ছিলাম ওদের সঙ্গে। আমাদের দেওয়া হয়েছিল তখনকার মোড়লের বাড়ির একটা ঘর। সে মোড়ল নারী। নাম তার মোরেনা মাখাফি। অসাধারণ অভিজ্ঞতা।
আপাতত স্বাধীন রাজ্য লেসোথো। নামেই স্বাধীন। চারপাশে রয়ে গেছে পরাক্রমশালী দক্ষিণ আফ্রিকা। দেশের শতকরা ৬০ ভাগ মানুষ সেখানে গিয়ে নানা সব কাজ করে। কেউ ফিরে আসে কেউ আসে না। ওখানকার মেয়েরা অনেককে ভেড়া বানিয়ে রেখে দেয়। আর যারা ফিরে আসে না তাদের স্ত্রীদের বলা হয়, ল্যান্ড উইডো বা দেশের বিধবা। কোনো এক মার্কিন পরিব্রাজক ওদের নিয়ে সিনেমা করতে গিয়ে এমন নাম দেন; যা আমার কাছে অত্যন্তই ঠাট্টা মনে হয়। গ্রামে, অফিসে হাজার হাজার সোনার বিধবা নিয়ে চলছে লেসোথোর জীবন। মে আগস্টের নামে যে নারী আমাদের সবাইকে সিসোথো ভাষা শিখিয়েছিলেন তিনিই ওদের গল্প করেছিলেন। আমি এমন এক সোনার বিধবার বাড়িতে ছিলাম সে সাতদিন। মাসে শেখার চেষ্টা করেছিলাম। পরে আর এক বাড়িতে ক্লাস বসে। আমি বেড়াতে গেছি কারেন্ট আমাকে সব শিখতে হবে না। তবু শিখেছি কিছু। ওখানে হিলেন ব্রিটেন থেকে যাওয়া সাত-আট জন। ছয়জন কাজ করছেন আর একজন আমার মতো বেড়াচ্ছেন। আমরা দুজন। এবং অন্য দেশ থেকে দুজন। সাত দিন আমাদের খুব ভালো সময় কেটেছিল। আমরা গিয়েছি নানা জায়গায়। ঘুরেছি পাহাড়ে, সমতল ভূমিতে।
আর দেখেছি ওদেশ ভীষণ। যে বাড়িতে আমরা ওদ্দেশ ভাষা শিখতে গিয়েছিলাম, সে বাড়ির নারী তখনও সোনার বিধবা হননি। তাঁর পাট্টা ছেঁটেছে। সবাই স্কুলে যায়। ওখানকার পাহাড়ের নাম মালতি পাহাড়। আর ওদেশ টাকার নামও মালতি। ওরা কেউ বেড়াতে গেলে খেতে দেয় শিলে শিলে নামের পানীয়। যা অনেকটা সন্দেশনার শরবতের মতো। আমরা আমাদের তুলেটুভরা সব নিয়ে ওদের ওখানে ছিলাম। নিজেরা রান্না করে খেয়েছি। ওই বাড়ির সবাইকে আমার রান্না খেতে দিয়ে যে প্রশংসা পেয়েছিলাম তা ভুলি কী করে? কারণ ওরা কেবল সেদ্ধ করে খায়। তবে ওদের প্রধান খাবার পরিজ বা ওটস। খাবারটি মাঝের জন্য ভালো। তবে ওরা আমাদের মতো রঁাঁধতে জানে না। একদিন রান্না শেষ করে কেবল খেতে বসব মোরেনা মাখাফি নিয়ে এসেছিল তাদের খাদ্দার। দেখলাম ওই মাখাফুটি সেন্ট, আর পরিনের খড়ওকে হালুয়া জাতীয় একটা কিছু। খুশিমনে নিলাম। বললাম, তোমার ছেলে এখানে থাকে? ও উত্তর দিয়েছিল ও আর জো বার্গে যাবে জোহানেসবার্গে যেতে চায় না। জোহানেসবার্গ জায়গাটি সাউথ আফ্রিকার একটি প্রধান শহর। কেন চায় না? ও বলে, সরা দিন খতমের খনিতে। আমি নামি সকালে আর কাজ শেষ করি রাতে। তাই ভাবছি দিনের রোদে চাকরি পেলে করব। এনটং হোসনে মানে তোফাজ্জল হোসেন ওকে কি কোনো কাজ দিতে পারবেন? উনি বলেছিলেন, আমি চেষ্টা করব।
মোরেনা মেগোশেশো যে দেশের গোলাম হবেন না বলে সারা জীবন যুদ্ধ করেছিলেন, বর্তমান ট্রিক্স ওদের গোলাম হতে গেছে অনেক লেসোথোবাসী। ওখানকার নারীদের ভেড়াও হয়েছে নিজের স্ত্রীদের সোনার বিধবা করে। এই হলো সাদ মানুষের ক্ষমতা। হুকেননে-কেঁশেনে ওরা নিয়ে নিয়েছে সবকিছু।
তোমার ছেলের স্ত্রী কোথায়? প্রশ্ন করেছিলাম। ও যখন কায়দার খনিতে, বাচ্চা দুটো রেখে চলে গেছে। একজনের কাছে তো খনিতে কাজ করে না। পরে এসেছিল? এসেছিল আমার ছেলে ওকে আর দেয়নি। কাটিয়ে আর কী লোহা দুটো সন্তান ছাড়া আর তো কিছু দিতে পারোনি। আমার ছেলে আদি অভাব হয়ে মোরেঙ্গা মাখাফিকে দেখি। শাশুড়ি তো বেশ ভালো। তবে এ মেসোথো গায়ের মোড়ল। বাইবেল ছাড়া অন্যকিছু হয়তো বোঝে না। ভালো মানুষ। একদিন হতে প্রশ্ন করি- আচ্ছা এনটং তুমি কি জাদুটোন্টায় বিশ্বাস করো? (এনটং মানে মিস্টার) স্বরই উত্তর দিয়েছিল ওরা বা শরীরে জড়িয়ে থাকে কেবল তার উপর পিৎজাছিল আগে আমরা পশুর চামড়া দিয়ে দিয়ে থাকতাম। এখন কম্বল।
আমরা একদিন দেখতে গেলাম থাবা বসিনি বা থাবার পাহাড়। ওখানে মোরেনা মোপোশেশো কবর আছে। বেশ ভালো লেগেছিল। একজন সতিতারোর বীর তিনি। যুদ্ধ করেছেন। দেশ রক্ষা করেছেন। তারপর সে দেশ এখন স্বাধীন। ঘর একটি মানচিত্র আছে, একটি ঘূর্ণীসার। থিঙ্গস আছে, রাজধানী আছে। তিন-চতুর্থ আর পাথর দিয়ে দেশরক্ষা! ভাবা যায়?
একদিন গেলাম পাহাড়ে, বুশম্যান পেইন্টিং দেখতে। সে এক ভয়ানক অভিজ্ঞতা। নিচে গভীর খাদ। আর আমরা চলেছি খুব ধীরে বুশম্যান পেইন্টিং দেখতে একেবারে নিচের খাদের দিকে না তাকিয়ে। পাহাড়ের গায়ে আঁকা হয়েছিল নানা ছবি। আমাদের দেশে সরাৎ ছবি তোলা হয়েছিল। একদিন এনটংটি মুড়িছুকে প্রশ্ন করেছিলাম-লেসোথোতে কি নদী নাই?
আছে। মইকার নদী। একটা হিরের খনিও পাওয়া গেছে। দেখা যাক আমাদের ভাগ্য কতটুকু জোটে। ওই বাড়ির মুড়িরে ছেলে মোফাকাত।
বললেন, জানো, আমাদের বর্তমান রাজার তুমির বরং। এবং আমাদেরও বাস তাই। এখানে সব গোত্রের নাম এসব বাগ, ব্যাড, কুমিছ, বাঘ, জাবুল সিংহ। বলি, মোরেঙ্গা মোশেশেশো কী বংশ ছিলেন? মোলেনাদি বলে, উনিও কুমিছ বংশ। এরপর বলল, ওনার মতো বড় বীর এ পৃথিবীতে আর কেউ নেই। আমাকে ওনারা বলেছিল আমাদের মীর যেন মুটিজুর রহমানের কথা। এই মোলেনাদি আমাকে নানা জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল এবং আমি ওর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে অনেক সিসোথো ভাষা শিখেছিলাম। যার এখনও কিছু মনে আছে। মনে আছে সিসোথো দেখার ক্লাসে শিক্ষক বলতেন কোলেনা এনটেন্ট, কোলেনা মেসা, কোলেনা মেসাফেনিং-তার সরাৎ নামে তকটিকে বলে, কোলেনা আসিীং সরা। মানে হলোন কুমারী সরাৎ। হ্যালো মানে কোলেনা। তারপর প্রশ্ন-উদলা জেনো। মানে কেমন আছো? উত্তর-কেপলা হাতো হাইুমাতো। ভালো আছি, অনেক ভালো আছি। মনে হয় আপেল চেঁইর গাছ ঘেরা বাড়িতে আমরা কিছু মানুষ কোথা থেকে এসে এদের ভাষা শিখছি। ওরাও দেখত শিলে শিলে আর মটরের গেড়ে গেউ ভর্তি করছিল।
এখানে খাদের বাড়িতে বিয়ার ও ময বানানো হয় তাদের বাড়িতে লাল পতাকা উড়তে থাকে। এমনি এক বাড়িতে গিয়েছিলাম আমরা। কে ওটা বিরি। আমি বিয়ার পছন্দ করি। মানে যারা বিয়ার পছন্দ করে তারা সব এই জিনিস পান করেছিল। আমি দেখছিলাম এই হরিদ্ব জাতীয় মায়ে বিয়ার নয় আমি পানি পছন্দ করি। সেখানে ছিল খুব সুন্দর দেখতে এক সোনার বিধবা। যার স্বামী তাকে ফেলে সাউথ আফ্রিকায় গিয়ে আর ফিরে আসেনি। সেখানে এনটংটি মুড়িছুখ ঘন ঘন তাকাত। শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল বলতে পারব না।
ওখানে ছিল এক উইচ ডাক্তার। তার বাড়িতে গিয়ে নানা গল্প শুনেছিলাম। ও বলেছিল নানা সব জাদুমন্ত্রের কথা। কার পেট থেকে কী বের করেছে, কার দাঁত থেকে কেমন পোকা বেরিয়েছে সেসব। বগ্রেঞ্জিল-একরব নদীতে খুব লিয়ে একটি ব্যাগ পেয়েছিলাম। নদীর ঈশ্বর আমাকে ব্যাগ দিয়েছিল। বললাম, ব্যাগটি সেখানে পাতে? ও ঘর থেকে একটা ব্যাগ এনে বলেছিল-এটটি। আমাদের টিমের একজনের নাম ছিল ব্রায়ান। বলেছিল, ভালো করে দেখলে বুঝতে পারবেন এটা মার্কিন ও পেন্সিলরের ব্যাগ। আসলেই তাই। ও তো আর ইত্যাদি জানে না। তাই সবাইকে বলেছে নদীর ঈশ্বর দিয়েছেন। ওর নাকি অনেক ক্ষমতা। তবে ওই ব্যাগ দেখার পর আমরা আর ক্ষমতা দেখতে চাইনি।
খুব মজা কেটেছিল ওই হাকাতুকু গ্রামে, আমাদের বেলেঙ্গা সময়।
একদিন বিশাল ঝড়ে যখন বাড়িঘর প্রায় উড়ে যাবে আমরা গ্রামের এক বড়লোকের বাড়িতে সারা রাত ছিলাম। তার বাড়ি পাকা ও মজবুত। আর আমরা যে বাড়িতে ছিলাম তা মাটি ও টিনের। বাড়ির চারপাশে কোনো দেয়াল থাকে না। তবে সেসন মাটির বাড়ি টড়ে মুরগি। ড্রিমেন সবাই নানা গল্প করেছিল। আমাদের নানা গল্প করতে হয়েছিল। মনে হয়েছিল আমরা সবাই পরম আত্মীয়।
কোনো এক বাড়িতে পানির কল। সবাই সেখানে আসে পানি নিতে। মোরেনা মাখাফির বাড়িতে ছিল পানির কল কারণ তিনি গ্রামের মোড়ল। সকালে অনেকে আসত পানি নিতে। তখন ওখানকার সেব লই মুরগিরা। আর দেখব নদী তারাও করুন। তখন বর্ষাকাল নয় তাই। তখনকার ডায়েরি একটু পানি-চোখের জলের মতো। সারা আফ্রিকাতেই তখন খরা। আমি দেখেছিলাম বেশ পানি সংকট সেখানে। পরে লন্ডনে এসে আমি নিয়মিত ‘ওয়াটার এইডকে’ প্রতি মাসে টাকা দিই। এখনও যা অব্যাহত আছে। যারা সেসব টাকায় আফ্রিকার খরাকবলিত জায়গায় পানি সরবরাহের ঠিকঠাক ব্যবস্থা করে। আরও অনেক কিছু করে।
মোরেনা মোশেশেশো যে কেমন যুদ্ধ করেছিলেন তা নয়, ফাল থেকে ভাসাদিল এবং সিসোথো ভাষার ব্যবহার বই করেছিলেন, ভাষা পরিশুদ্ধ করেছিলেন, ওদেশ পাথরপূজা থেকে তুলে এনে পাদরিদের এনে ওদের খ্রিষ্টধর্ম দিয়েছিলেন। পরিমলে পরিচ্ছদেমা সিএসসিছিলেন। ভালো পড়া, নানাবিধ ব্রতভারজানও শিখিয়েছিলেন তারা। খুব গম্ভীর ঘন বনের ভেতর যে বাড়ি সেখানেও পরিচ্ছন্নতার কোনো অভাব নেই। লেসোথো সুন্দর টেবিল চান্দনি, জানালার পর্দা, বিছানার ফুলতোলা চাদর সবকিছুই থাকে সেখানে। আমরা যে বাড়িতে ছিলাম সে বাড়িও ঝকঝকে।
এ ভ্রমণের কথা আজীবন মনে থাকবে। ব্রায়ান, ম্যাথু, সারাহ, জেলেন, অ্যান্ডি, অ্যানি, বিজাস, কুমু সবাই মিলে যে মজা হয়েছিল তার কথা ভোলা যায় না। ভারত, ব্রিটেন, বাংলাদেশ একাকার। কত জায়গায় তো গিয়েছি-আমেরিকা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ইতালি, জার্মানি এবং আরও কত। তবে লেসোথোর কথা কখনও ভুলতে পারব না। মাসেরুতে দেখেছি ডাইনোসরের পায়ের চিহ্ন আঁকা পাথরের গুহা। দেখেছি দুটো গরুর লাঙল কেমন করে শস্য ফলায় ওরা। পাড়ার জমি ভাই দুই গরু। মনে হয় মোগলালি কি ডাক্তার হতে পেরেছে? মাফি ও চলে গেছে সাউথ আফ্রিকায়? কাজ করতে খনিতে বা আর কিছু। মোশেশেশোর রক্ত এর শরীর। ওর তো দারুণ একটি কিছু হওয়া উচিত।
লেখক : সালেহা চৌধুরী


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









