সুসান সন্টাগ বেঁচে থাকলে এখন তার বয়স হতো ৯৫ বছর। তার লেখাকে এত দীর্ঘস্থায়ী করে রেখেছে শুধু তার প্রজ্ঞা, বাক্শক্তি কিংবা বুদ্ধিমত্তা নয়; এর পেছনে আছে তার অসাধারণ রুচিবোধ। সহজ করে বললে, তিনি জানতেন কোনটি সত্যিই ভালো—এবং জানতেন সেই ভালো জিনিস নিয়ে কীভাবে কথা বলতে হয়। এমনকি, বরং বিশেষ করে, যখন অন্যরা তাঁর সঙ্গে একমত নাও হতে পারে।
‘ক্যাম্প’ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি একবার বলেছিলেন, সেটি হলো ‘খারাপ রুচির ভালো রুচি’। অর্থাৎ কোনো কিছুর প্রচলিত মানদণ্ডে মূল্য না থাকলেও তার অতিরঞ্জন, কৃত্রিমতা কিংবা অদ্ভুত সৌন্দর্যের মধ্যে যে বিশেষ আনন্দ আছে, সেটি চিনে নেওয়ার ক্ষমতা তার ছিল। তার রুচি তাই শুধু কী ভালো তা জানত না; ভালোকে দেখার নতুন চোখও তৈরি করত।
এ কারণেই হোর্সে লুইস বোর্হেসকে তিনি ভালোবাসতেন—এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। যদিও বোর্হেসকে ‘খারাপ রুচি’র উদাহরণ বলার সাহস বোধহয় কারও নেই।
সন্টাগ শুধু বোর্হেসের সাহিত্যিক অনুরাগী ছিলেন না; ছিলেন তার বন্ধু। বোর্হেসের মৃত্যুর দশ বছর পর তিনি তাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। মৃত একজন বন্ধুকে লেখা সেই চিঠিতে ছিল তাকে হারানোর বেদনা, বই ও সাহিত্যের প্রতি সন্টাগের গভীর ভালোবাসা, এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ।
তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, বই যখন খুব সহজে হাতের নাগালে পাওয়া যাবে এবং যেকোনো লেখা যখন মুহূর্তে বদলে ফেলা, সম্পাদনা করা বা নিজের প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা সম্ভব হবে, তখন মানুষের ভেতরের সেই নীরব জগৎ—যাকে তিনি বলেছিলেন ইনওয়ার্ডনেস’—ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যেতে পারে। বইয়ের জায়গা নিতে পারে এমন এক ‘টেক্সট’, যার সঙ্গে মানুষ কেবল প্রয়োজন ও ব্যবহারের সম্পর্কেই যুক্ত হবে। শেষ পর্যন্ত লিখিত শব্দও হয়ে উঠতে পারে বিজ্ঞাপননির্ভর, পর্দা-নির্ভর বাস্তবতার আরেকটি অংশ।
আজ সন্টাগ ও বোর্হেস দুজনেই যদি বেঁচে থাকতেন, আমাদের এই ডিজিটাল পৃথিবী, বইয়ের বদলে পর্দায় পড়া, মুহূর্তে বদলে ফেলা যায় এমন লেখা এবং সর্বক্ষণ আমাদের ঘিরে থাকা তথ্যের স্রোত দেখে তারা কী বলতেন—ভাবতেই কৌতূহল হয়। কিন্তু তারা আর নেই। তাই তাদের আজকের উত্তর খোঁজার একমাত্র পথ হয়তো তাদের লেখা শব্দগুলোর কাছেই ফিরে যাওয়া।
সন্টাগের এই চিঠিটি ২০০১ সালে প্রকাশিত তার প্রবন্ধসংকলন ‘হোয়্যার দ্য স্ট্রেস ফল্স: এসেইজ’-এ অন্তর্ভুক্ত হয়। বোর্হেসকে লেখা সেই চিঠিতে তিনি যে সাহিত্য, বই, স্মৃতি ও মানুষের অন্তর্জগত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, আজও সেগুলো অদ্ভুতভাবে প্রাসঙ্গিক।

১৩ জুন ১৯৯৬, নিউইয়র্ক
প্রিয় বোর্হেস,
তোমার সাহিত্য যখন চিরকালের চিহ্নের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন তোমাকে একটি চিঠি লেখা খুব অস্বাভাবিক মনে হয় না। তুমি চলে গেছ দশ বছর। দশ বছর, বোর্হেস! সময়ের কাছে এই দশ বছর হয়তো সামান্য; কিন্তু একজন মানুষের অনুপস্থিতি মাপতে গেলে দশ বছরও দীর্ঘ এক শূন্যতা।
সমকালীন কোনো লেখক যদি সাহিত্যিক অমরত্বের জন্য জন্মে থাকেন বলে মনে হয়ে থাকে, সে তুমি। তুমি ছিলে তোমার সময়ের, তোমার সংস্কৃতির, তোমার শহরের সন্তান। অথচ আশ্চর্যভাবে তুমি তোমার সময় ও সংস্কৃতিকে অতিক্রম করতে পেরেছিলে। কীভাবে তা সম্ভব হয়েছিল, তা আজও পুরোপুরি বুঝি না। হয়তো তোমার দৃষ্টির উদারতা এবং তার আশ্চর্য উন্মুক্ততার মধ্যে তার উত্তর ছিল।
তুমি ছিলে এমন একজন লেখক, যার মধ্যে আত্মমুগ্ধতা প্রায় ছিল না। বরং তুমি ছিলে স্বচ্ছ—অথচ একই সঙ্গে অত্যন্ত শিল্পসচেতন। নিজের উপস্থিতিকে আড়াল করেও কীভাবে একজন লেখক তাঁর স্বরকে এত গভীর করে তুলতে পারেন, তুমি তার এক বিরল উদাহরণ।
এর সঙ্গে ছিল তোমার এক ধরনের স্বাভাবিক আত্মিক নির্মলতা। তুমি আমাদের পৃথিবীতে অনেক বছর বাস করেছ, কিন্তু নিজেকে এমনভাবে সংযত ও বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছিলে যে একই সঙ্গে তুমি অন্য সময়েরও এক মানসিক ভ্রমণকারী হয়ে উঠেছিলে। সময়কে তুমি অন্যদের মতো দেখনি। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ—এই আলাদা আলাদা ঘরগুলো তোমার কাছে যেন কখনোই খুব বিশ্বাসযোগ্য ছিল না।
তুমি প্রায়ই বলতে, প্রতিটি মুহূর্তের মধ্যে অতীত ও ভবিষ্যৎ একসঙ্গে উপস্থিত। মনে পড়ে, তুমি ব্রাউনিংয়ের একটি কথার উল্লেখ করতে—বর্তমান সেই ক্ষণ, যখন ভবিষ্যৎ ধীরে ধীরে অতীতে ভেঙে পড়ে। এমন একটি ভাবনাও তুমি নিজের নামে রাখতে চাইতে না। অন্য লেখকের কথার মধ্যে নিজের চিন্তার পূর্বসূরি খুঁজে নেওয়ার এই অভ্যাসটিও ছিল তোমার বিনয়ের অংশ।
আর সেই বিনয়ই তোমার উপস্থিতিকে আরও দৃঢ় করেছিল।
তুমি ছিলে নতুন আনন্দের আবিষ্কারক। তোমার মতো গভীর, শান্ত বিষণ্নতার একজন মানুষকে কখনো ক্ষুব্ধ হতে হয়নি। তোমার হতাশা ছিল সৃষ্টিশীল। তুমি জানাতে, পৃথিবী কতটা ভয়াবহ—কিন্তু সেই জ্ঞানকে অসহায়তার কারণ হতে দাওনি। বরং তাকে পরিণত করেছিলে কল্পনার উপাদানে।
এই জায়গাটিই তোমার কাছে আমার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
তুমি দেখিয়েছ, পৃথিবী সম্পর্কে মোহমুক্ত থাকা আর অসুখী থাকা এক কথা নয়। মানুষ পৃথিবীর ভয়াবহতা স্পষ্ট চোখে দেখতে পারে, তার ভেতরের নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে কোনো ভ্রম না রেখেও বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি শান্তও থাকতে পারে।
কোথাও তুমি বলেছিলে, একজন লেখক—আর খুব সাবধানে যোগ করেছিলে, আসলে প্রত্যেক মানুষ—এমনভাবে ভাবতে শেখে যে তার জীবনে যা-ই ঘটুক, তা যেন কোনো না কোনোভাবে তার জন্য একটি সম্পদ হয়ে ওঠে। তুমি তখন তোমার অন্ধত্বের কথা বলছিলে।
কী অদ্ভুত—তোমার অন্ধত্ব তোমার কাছে যেমন একটি সম্পদে পরিণত হয়েছিল, তেমনি তুমি নিজেই হয়ে উঠেছ অন্য লেখকদের জন্য এক বিরাট সম্পদ।
১৯৮২ সালে, তোমার মৃত্যুর চার বছর আগে, এক সাক্ষাৎকারে আমি বলেছিলাম, ‘আজ জীবিত লেখকদের মধ্যে অন্য লেখকদের কাছে বোর্হেসের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কেউ নেই।’ আরও বলেছিলাম, অনেকে তোমাকেই জীবিত লেখকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলবেন। আর খুব কম লেখকই আছেন, যারা তোমার কাছ থেকে কিছু শেখেনি, অথবা কোনো না কোনোভাবে তোমাকে অনুকরণ করেনি।
আজও কথাটি সত্য। আমরা এখনও তোমার কাছ থেকে শিখছি। এখনও তোমাকে অনুকরণ করছি।
তুমি মানুষকে কল্পনার নতুন পথ দিয়েছিলে, অথচ একই সঙ্গে বারবার মনে করিয়ে দিয়েছিলে—আমরা অতীতের কাছে ঋণী। বিশেষ করে সাহিত্যের কাছে। তুমি বলেছিলে, আমরা যা, আমরা যা ছিলাম, আমাদের যা কিছু আছে—তার প্রায় সবকিছুর কাছেই আমরা সাহিত্যের ঋণী।
বই যদি হারিয়ে যায়, ইতিহাসও হারাবে। আর ইতিহাস হারালে মানুষও তার নিজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারাবে। আমি মনে করি, তুমি ঠিকই বলেছিলে।
বই কেবল আমাদের স্বপ্ন ও স্মৃতির ইচ্ছামতো সাজানো কোনো সংগ্রহ নয়। বই আমাদের শেখায় কীভাবে নিজের সীমাকে অতিক্রম করতে হয়। কেউ কেউ পড়াকে শুধু পালিয়ে যাওয়ার একটি পথ হিসেবে দেখে—বাস্তব পৃথিবী থেকে কল্পনার পৃথিবীতে, দৈনন্দিন জীবন থেকে বইয়ের পাতায়।
কিন্তু বই তার চেয়ে অনেক বেশি। বই আমাদের সম্পূর্ণ মানুষ হয়ে ওঠার একটি পদ্ধতি। তোমাকে তাই একটি দুঃসংবাদ দিতে হচ্ছে। বই এখন বিপন্ন প্রজাতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আমি শুধু মুদ্রিত বইয়ের কথা বলছি না। বলছি সেই পাঠের পরিবেশের কথাও, যার মধ্যে সাহিত্য জন্ম নেয়, যার মধ্যে সাহিত্যের আত্মিক প্রভাব সম্ভব হয়।
আমাদের বলা হচ্ছে, খুব শিগগির আমরা ‘বুকস্ক্রিন’-এ চাইলেই যেকোনো লেখা তুলে আনতে পারব। লেখাটির চেহারা বদলে দিতে পারব। তাকে প্রশ্ন করতে পারব। তার সঙ্গে ‘ইন্টারঅ্যাক্ট’ করতে পারব। অর্থাৎ বই আর বই থাকবে না; হয়ে উঠবে একটি ‘টেক্সট’—যার মূল্য নির্ধারিত হবে তার ব্যবহারিক সুবিধা দিয়ে।
তখন লিখিত শব্দও হয়তো আমাদের বিজ্ঞাপননির্ভর, পর্দায়-চালিত বাস্তবতার আরেকটি অংশ হয়ে উঠবে। এই ভবিষ্যৎকে আমাদের সামনে হাজির করা হচ্ছে আরও ‘গণতান্ত্রিক’ বলে। কিন্তু আমি ভয় পাই, এর ভেতরে আমরা এমন কিছু হারাতে পারি, যার নাম অন্তর্জগৎ।
বইয়ের সঙ্গে আমাদের একাকী সম্পর্ক। পড়ার সেই নীরবতা। একটি বাক্যের সামনে থেমে থাকা। এমন কোনো শব্দের সঙ্গে দীর্ঘদিন বসবাস করা, যার কোনো তাৎক্ষণিক ব্যবহার নেই। নিজের ভেতরে একটি কণ্ঠের জন্ম হতে দেওয়া।
সেই জগৎটিই হয়তো ধীরে ধীরে বিলীন হবে। আর এবার কোনো আগুনের প্রয়োজন নেই। বর্বরদের আর বই পুড়িয়ে ফেলতে হবে না। বাঘটি ইতিমধ্যেই গ্রন্থাগারে ঢুকে পড়েছে।
প্রিয় বোর্হেস, এসব বলে আমার কোনো আনন্দ হচ্ছে না। বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিযোগ করা আমার উদ্দেশ্যও নয়। কিন্তু বইয়ের, এমনকি পাঠেরই, এই সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে তোমার চেয়ে আর কার কাছে অভিযোগ জানানো যায়?
বোর্হেস, তোমার চলে যাওয়ার দশ বছর হয়ে গেল। আমি শুধু বলতে চাই—আমরা তোমাকে মিস করি। আমি তোমাকে মিস করি। তবু তুমি এখনও আমাদের ওপর প্রভাব ফেলছ। এখনও তুমি আমাদের চিন্তার মধ্যে, আমাদের পাঠের মধ্যে, আমাদের কল্পনার মধ্যে উপস্থিত।
আমরা যে একবিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করছি, এই নতুন সময় মানুষের আত্মাকে নতুন নতুন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করাবে। হয়তো ভবিষ্যতে বইয়ের চেহারা বদলাবে, পড়ার অভ্যাস বদলাবে, শব্দের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও বদলাবে।
কিন্তু বিশ্বাস করো, আমাদের কয়েকজন এখনও সেই মহান গ্রন্থাগার ছেড়ে যাব না। আমরা বইয়ের কাছে ফিরে যাব। নীরব পাঠের কাছে ফিরে যাব। কারণ গ্রন্থাগার কেবল বই রাখার জায়গা নয়। এটি মানুষের স্মৃতি রাখার জায়গা। কল্পনা রাখার জায়গা। এমন এক পৃথিবীর সম্ভাবনা রাখার জায়গা, যেখানে মানুষ নিজেকে অতিক্রম করতে পারে।
আর সেখানে, প্রিয় বোর্হেস, তুমি আমাদের পৃষ্ঠপোষক হয়ে থাকবে। আমাদের নায়ক হয়েও।
হয়তো কোনো একদিন, কোনো এক নীরব পাঠক একটি বই খুলবে, তোমার একটি গল্প পড়বে, এবং হঠাৎ বুঝতে পারবে—কিছু মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাদের লেখা সময়ের ভেতর দিয়ে এমনভাবে হাঁটে যে তাদের অনুপস্থিতিও এক ধরনের উপস্থিতি হয়ে থাকে।
তুমিও তেমনই। দশ বছর পরেও।
এবং সম্ভবত, আরও অনেক বছর পরে।
সুসান সন্টাগ


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









