যুদ্ধের মধ্যে মানুষ কীভাবে বেঁচে থাকে? ধ্বংসস্তূপের পাশে কীভাবে একটি শিশু বড় হয়, ঘর হারিয়েও কীভাবে কেউ ঘরের কথা মনে রাখে, আর মৃত্যুর এত কাছাকাছি থেকেও কীভাবে মানুষ গান গায়? মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসের ইতিহাসের মধ্যে এই প্রশ্নগুলো বারবার ফিরে আসে। শান্তির আন্তর্জাতিক দিবস যখন আমাদের যুদ্ধের বিপরীতে মানুষের জীবনের কথা ভাবতে আহ্বান জানায়, তখন ফিলিস্তিনি শিল্পী রিম বান্নার কণ্ঠ মনে করিয়ে দেয়—যুদ্ধকে শুধু নিহত মানুষের সংখ্যা দিয়ে বোঝা যায় না। তারও একটি মুখ আছে, একটি স্মৃতি আছে, একটি ঘর আছে, আছে ভালোবাসা ও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা।
রিম বান্নার গানে ফিলিস্তিন কেবল সংঘাতের ভূগোল নয়। সেখানে শিশুরা বড় হয়, মানুষ ভালোবাসে, অপেক্ষা করে, স্বপ্ন দেখে। ধ্বংসের মধ্যেও জীবন তার নিজস্ব ছন্দ খুঁজে নেয়। এই কারণেই তার গান রাজনৈতিক বাস্তবতার পাশাপাশি মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার দলিল হয়ে ওঠে।
১৯৬৬ সালে নাজারেতে জন্ম নেওয়া রিম বান্না অল্প বয়সেই সংগীতচর্চা শুরু করেন। পরে মস্কোতে সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং দেশে ফিরে নিজের শিল্পীজীবনকে ফিলিস্তিনি সংস্কৃতি ও স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত করেন। পুরোনো ফিলিস্তিনি শিশুগান, ঘুমপাড়ানি গান ও মৌখিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ছিল তার কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিস্মৃতির দিকে এগিয়ে যাওয়া গানগুলোকে তিনি নতুন করে মানুষের কাছে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই কাজের অর্থ আরও বিস্তৃত হয়। গান তখন শুধু অতীত সংরক্ষণের উপায় থাকে না; হয়ে ওঠে হারিয়ে যাওয়া মানুষ, উচ্ছেদ, কারাবন্দিত্ব, শিশুদের জীবন এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার স্মৃতিবাহী এক মাধ্যম। যে ভূখণ্ডে রাজনৈতিক সংঘাত মানুষের ঘরবাড়ির পাশাপাশি ভাষা ও সংস্কৃতিকেও বিপন্ন করে, সেখানে একটি পুরোনো গান ধরে রাখা মানে কখনো কখনো একটি হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীকে ধরে রাখা।

২০০৩ সালে ‘লালাবাইজ ফ্রম দ্য অ্যাক্সিস অব ইভিল’ প্রকল্পে তার অংশগ্রহণ এই শিল্পীসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। ইরাক যুদ্ধের সময় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের নারী শিল্পীদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল এই সংগীতপ্রকল্প। যুদ্ধের প্রচলিত ভাষার বিপরীতে সেখানে উঠে এসেছিল ঘুমপাড়ানি গানের কোমলতা। অস্ত্রের শব্দের পাশে রাখা হয়েছিল মায়ের কণ্ঠ। রিম বান্না সেখানে ফিলিস্তিনের হয়ে এমন এক ভাষা বহন করেছিলেন, যার কেন্দ্রে ছিল শিশু, নিরাপত্তা ও জীবনের অধিকার।
তার ২০০৫ সালের অ্যালবাম ‘দ্য মিররস অব মাই সোল’-এ ব্যক্তিগত জীবনের গল্পের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনের ক্ষত আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাস্তুচ্যুত মানুষ, ঘর থেকে উচ্ছেদ হওয়া পরিবার, কারাগারে বন্দী মানুষ এবং নিহত শিশুদের অভিজ্ঞতা সেখানে একেকটি মানবিক কাহিনি হয়ে উপস্থিত হয়।
অ্যালবামের উল্লেখযোগ্য গান ‘সারা’-তে একটি তরুণ ফিলিস্তিনি মেয়ের হত্যার কাহিনি উঠে আসে। এখানে যুদ্ধ কোনো দূরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনা নয়। তা এসে দাঁড়ায় একটি শিশুর অসমাপ্ত জীবনের সামনে। একটি মেয়ের মৃত্যু তখন একটি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি একটি মায়ের ব্যক্তিগত শোক, একটি পরিবারের শূন্যতা এবং একটি ভবিষ্যতের আকস্মিক সমাপ্তির গল্প হয়ে ওঠে।
রিম বান্নার সংগীতে যুদ্ধ তাই কেবল যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটে না। তার অভিঘাত ছড়িয়ে থাকে ঘরের ভেতর—সন্তান হারানো মায়ের কান্নায়, স্কুলে যেতে না-পারা শিশুর জীবনে, ছেড়ে আসা বাড়ির স্মৃতিতে, কিংবা এমন একটি জানালার সামনে যেখানে একদিন কোনো পরিবার বসে বাইরের পৃথিবী দেখত। এই ব্যক্তিগত পরিসরই তার গানের রাজনৈতিক অর্থকে আরও গভীর করে। কারণ একটি ভূখণ্ডের ইতিহাস শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন দিয়েই লেখা হয়।
তার শিল্পীজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংযোগ। তিনি প্রচলিত ফিলিস্তিনি সুর ও মৌখিক ঐতিহ্যকে সমকালীন সংগীতের সঙ্গে মিলিয়েছেন, কবিতাকে গানে রূপ দিয়েছেন এবং হারিয়ে যেতে বসা শিশুগানকে নতুন শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। ফলে তার সংগীত একই সঙ্গে অতীতের স্মৃতি এবং বর্তমানের অভিজ্ঞতার বাহন হয়ে ওঠে।
এই কাজের মধ্যে এক ধরনের নীরব প্রতিরোধ ছিল। কোনো সংস্কৃতি যখন বারবার বাস্তুচ্যুতির মুখোমুখি হয়, তখন শুধু মানুষ নয়—তার গান, গল্প, উচ্চারণ, লোকস্মৃতি ও শৈশবও হারিয়ে যেতে পারে। একটি ঘর ধ্বংস হলে তার দেয়াল পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব; কিন্তু সেই ঘরে গাওয়া একটি গান হারিয়ে গেলে তাকে ফিরিয়ে আনা অনেক কঠিন। রিম বান্না সেই হারিয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে নিজের কণ্ঠকে ব্যবহার করেছিলেন।
তাই তার গান শুনলে ফিলিস্তিনকে শুধু যুদ্ধের মানচিত্র হিসেবে দেখা যায় না। সেখানে একটি শিশুর ঘুম, একটি মায়ের কণ্ঠ, দূরে পড়ে থাকা একটি গ্রাম, নির্বাসনের স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একগুঁয়ে আশাও শোনা যায়। বেদনা আছে, কিন্তু বেদনার মধ্যেই জীবনকে আঁকড়ে থাকার একটি প্রবল আকাঙ্ক্ষা আছে।
২০১৮ সালে নাজারেতে তার মৃত্যু ঘটে। রেখে যান বহু অ্যালবাম, পুনরুজ্জীবিত লোকঐতিহ্য এবং এমন এক কণ্ঠ, যা আধুনিক ফিলিস্তিনি অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে আছে। তার শিল্পের মূল্য শুধু এই কারণে নয় যে তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে গান গেয়েছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি যুদ্ধের ভেতরেও জীবনের ক্ষুদ্র ও ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোকে দৃশ্যমান করেছিলেন।
আজ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে আবারও যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসের ছবি দেখা যায়। সেই দৃশ্যের মধ্যে রিম বান্নার গান শুনলে মনে হয়, যুদ্ধের ইতিহাস কখনো কেবল সেনাবাহিনী, রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডের ইতিহাস নয়। তার ভেতরে এমন অসংখ্য মানুষ আছে, যাদের নাম বড় রাজনৈতিক বয়ানে হয়তো নেই। আছে তাদের ঘর, তাদের সন্তান, তাদের স্মৃতি, তাদের হারানোর গল্প।
শান্তি তাই শুধু যুদ্ধ থেমে যাওয়ার নাম নয়। মানুষের ঘরে ফিরে যাওয়ার অধিকার, নিজের স্মৃতি ও সংস্কৃতি ধরে রাখার সুযোগ, শিশুর নিরাপদে বড় হওয়ার নিশ্চয়তা—এসবও তার অংশ। রিম বান্নার সংগীত এই সহজ সত্যটির কাছেই ফিরে যায়।
তার কণ্ঠে ফিলিস্তিন কেবল একটি আহত ভূখণ্ড নয়; এটি মানুষের বেঁচে থাকার এক দীর্ঘ সুর। সেই সুরে শোক আছে, কিন্তু শুধু শোক নেই। আছে স্মৃতি, ভালোবাসা, প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকার এক গভীর জেদ। যুদ্ধ যতবার মানুষকে সংখ্যা বানাতে চায়, তার গান ততবার একজন মানুষকে তার নাম, মুখ ও জীবনের গল্পসহ ফিরিয়ে আনে।
আর হয়তো এখানেই তার সংগীতের সবচেয়ে গভীর অর্থ—ধ্বংসের মধ্যেও জীবনকে ভুলে না যাওয়া।

পরিচিতি
রিম বান্না (১৯৬৬–২০১৮) ছিলেন ফিলিস্তিনি গায়িকা, সুরকার ও সংগীতশিল্পী। নাজারেথে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী ছোটবেলা থেকেই গান ও সংগীতের সঙ্গে বেড়ে ওঠেন। তার মা ছিলেন ফিলিস্তিনি কবি জুহাইরা সাব্বাগ। মায়ের কাছ থেকেই তিনি ফিলিস্তিনি লোকগান, লোরি ও মৌখিক ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হন।
কৈশোরেই সংগীতচর্চা শুরু করে বান্না পরে মস্কোর গনেসিনস স্টেট মিউজিক একাডেমিতে আধুনিক গান ও কণ্ঠসংগীত পরিচালনা নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৯১ সালে স্নাতক হন। মস্কোতেই তিনি ইউক্রেনীয় গিটারবাদক লিওনিদ আলেক্সেয়েঙ্কোর সঙ্গে পরিচিত হন। দেশে ফিরে তাঁর সংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে ওঠে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে চলে আসা ফিলিস্তিনি শিশুদের গান ও ঘুমপাড়ানি গান সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং নতুন সংগীতায়োজনে পরিবেশন করা।
পরবর্তী সময়ে তার গান হয়ে ওঠে স্মৃতি, নির্বাসন, ভালোবাসা, স্বাধীনতা ও ফিলিস্তিনি জীবনের নানা অভিজ্ঞতার ভাষা। তিনি ঐতিহ্যবাহী কবিতা ও লোকসুরকে সমকালীন সংগীতের সঙ্গে মিলিয়ে একটি স্বতন্ত্র শিল্পভাষা নির্মাণ করেন। ২০০৩ সালে ‘লালাবাইজ ফ্রম দ্য অ্যাক্সিস অব ইভিল’ প্রকল্পে অংশ নিয়ে তার কণ্ঠ আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছেও পৌঁছে যায়।
২০০৯ সালে তার ক্যানসার ধরা পড়ে। ২০১৬ সালে কণ্ঠনালির সমস্যার কারণে গান গাওয়া প্রায় ছেড়ে দিলেও সৃষ্টিশীলতা থামাননি। ২৪ মার্চ ২০১৮ সালে নাজারেথে তার মৃত্যু হয়। তার গান আজও ফিলিস্তিনের সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও মানুষের জীবনসংগ্রামের এক শক্তিশালী সাক্ষ্য হয়ে আছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









