ছোট বেলায় বইয়ের পাতায়, সিনেমার পর্দায় কিংবা ইতিহাসের গল্পে যে শহরের নাম বারবার এসেছে, এ বছরের মার্চে স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে কাটিয়ে এলাম জীবনের অন্যতম স্মরণীয় একটি সফরে স্বপ্নের সেই লন্ডন শহরে। শুধু একটি শহর দেখা নয়, বরং ইতিহাস, জ্ঞান, সংস্কৃতি, খেলাধুলা, সাহিত্য আর প্রকৃতির এক অনন্য মেলবন্ধনকে কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ হয়েছিল।
আমার কাছে ভ্রমণ মানেই শুধু ছবি তুলে ফিরে আসা নয়। প্রতিটি শহরের একটি আত্মা থাকে, একটি গল্প থাকে। সেই গল্পটাকে খুঁজে বের করাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। প্রথম দিনটি কেটেছিল টার্কিস এয়ারলাইন্স-এর দীর্ঘ ট্রানজিট কাটিয়ে ক্লান্তি নিয়ে। পৌঁছেই এরপর শুরু হলো লন্ডন অন্বেষণ। সকালে যখন ওয়েস্টমিনস্টারে পৌঁছালাম, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিগ বেন যেন ইতিহাসের এক জীবন্ত প্রতীক। পাশেই ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, শত শত বছরের গণতান্ত্রিক চর্চার সাক্ষী।
ওয়েস্টমিনস্টার ব্রিজে দাঁড়িয়ে টেমস নদীর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, এই নদী হয়তো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উত্থান, শিল্পবিপ্লব, বিশ্বযুদ্ধ থেকে শুরু করে আধুনিক ব্রিটেনের প্রতিটি অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী।
ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবি, বাকিংহাম প্যালেস, সেন্ট জেমস পার্ক, ট্রাফালগার স্কয়ার, পিকাডিলি সার্কাস... প্রতিটি জায়গার আলাদা ইতিহাস, আলাদা ব্যক্তিত্ব। সবচেয়ে ভালো লেগেছে একটি বিষয়। লন্ডন তার অতীতকে কখনো মুছে ফেলেনি। বরং ইতিহাসকে সংরক্ষণ করেই আধুনিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়েছে। তাই একই রাস্তায় একদিকে কয়েকশ বছরের পুরনো ভবন, অন্যদিকে কাঁচের আধুনিক স্কাইস্ক্র্যাপার। সময় যেন এখানে পাশাপাশি হাঁটে।
এই সফরের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্তগুলোর একটি ছিল আমার লেখা বই আন্তর্জাতিক গবেষণা গ্রন্থাগারগুলোর হাতে তুলে দেওয়া। ব্রিটিশ লাইব্রেরি, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের সোয়াস লাইব্রেরি এবং ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের (বিএফআই) রিউবেন লাইব্রেরিতে আমার লেখা ‘লুমিয়ের থেকে হীরালাল’ ইংরেজি অনুবাদ পৌঁছে দিতে পেরে একজন লেখক হিসেবে এক ভিন্নরকম তৃপ্তি অনুভব করেছি। বাংলাদেশের সিনেমা ও দক্ষিণ এশিয়ার চলচ্চিত্র ইতিহাস নিয়ে লেখা একটি বই বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহে স্থান পাওয়া নিঃসন্দেহে আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
আরেক দিন ছিল টেমস নদীতে নৌভ্রমণ। উবার বোটে করে ওয়েস্টমিনস্টার থেকে টাওয়ার ব্রিজ পর্যন্ত যাত্রা ছিল পুরো সফরের অন্যতম সুন্দর অভিজ্ঞতা। নদীর বুক থেকে লন্ডন দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, শহরটি যেন নিজেই তার ইতিহাসের গল্প শোনাচ্ছে। দূরে লন্ডন আই, সামনে সেন্ট পলস ক্যাথেড্রালের গম্বুজ, আধুনিক ক্যানারি ওয়ার্ফের স্কাইলাইন, আর শেষে ধীরে ধীরে চোখের সামনে ভেসে উঠল বিশ্বের অন্যতম পরিচিত স্থাপনা টাওয়ার ব্রিজ।
একদিন আবার ঘুরে এলাম ব্রিটিশ মিউজিয়াম। পৃথিবীর নানা সভ্যতার হাজার হাজার বছরের ইতিহাস একই ছাদের নিচে সংরক্ষিত। যদিও সময় স্বল্পতার কারণে সবকিছু দেখা সম্ভব হয়নি, তবুও বুঝতে পারলাম কেন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাদুঘর হিসেবে এটি পরিচিত। এখানে দেখেছি বিখ্যাত মিসরের কিছু সত্যিকারের মমি!
কিশোর বেলার হ্যারি পটারের ভক্ত হিসেবে কিংস ক্রস স্টেশনের প্লাটফর্ম 9¾-এ যাওয়া ছিল আরেকটি বিশেষ অভিজ্ঞতা। ছোটবেলার কল্পনার সেই প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা যেন বাস্তব আর কল্পনার এক মজার মিলন। ঈদের দিনটি কাটালাম প্রবাসী আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে। এরপর ঘুরলাম সাউথ ব্যাংক, লন্ডন আই, লাল ডাবল-ডেকার বাসে চড়া, আর হেঁটে হেঁটে পৌঁছে গেলাম হোয়াইট চ্যাপেলে। বাংলা ভাষার সাইনবোর্ড, বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট, ইস্ট লন্ডন মসজিদ, আলতাফ আলী পার্ক... মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল, যেন লন্ডনের মাঝেই বাংলাদেশের একটি ছোট্ট অংশ দাঁড়িয়ে আছে।
সফরের সবচেয়ে দীর্ঘ দিনটি ছিল স্টোনহেঞ্জ, কটসওল্ডস ও অক্সফোর্ড ভ্রমণ। স্টোনহেঞ্জে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে মানুষ কীভাবে এত বিশাল পাথর এখানে এনে স্থাপন করেছিল! আজও এর নির্মাণের উদ্দেশ্য নিয়ে গবেষণা চলছে। হয়তো ধর্মীয় অনুষ্ঠান, হয়তো জ্যোতির্বিজ্ঞান, কিংবা কোনো সামাজিক সমাবেশ। রহস্য এখনও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। সেই রহস্যই হয়তো স্টোনহেঞ্জের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।
স্টোনহেঞ্জ থেকে রওনা দিলাম ইংল্যান্ডের বিখ্যাত কান্ট্রিসাইড কটসওল্ডসের দিকে। বিবুরি গ্রামের আর্লিংটন রো দেখে বুঝলাম কেন একে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে সুন্দর গ্রাম বলা হয়। শত শত বছরের পুরনো পাথরের কটেজ, ছোট্ট নদী, রাজহাঁস, পাথরের সেতু, ফুলে সাজানো বাগান... যেন কোনো জলরঙের ছবির ভেতরে হাঁটছি। শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে এই নীরবতা সত্যিই অন্যরকম।
সন্ধ্যায় পৌঁছলাম অক্সফোর্ডে। ইংরেজিভাষী বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় নগরী। রাতের আলোয় র্যাডক্লিফ ক্যামেরা, বডলিয়ান কোর্টইয়ার্ড আর ব্রিজ অব সাইস দেখে মনে হচ্ছিল, শত শত বছর ধরে জ্ঞানের আলো এখান থেকেই ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। বিশ্বের অসংখ্য রাষ্ট্রনেতা, বিজ্ঞানী, লেখক, দার্শনিক এই শহরের পথ দিয়ে হেঁটেছেন। সেই একই পথে হাঁটার অনুভূতিটা সত্যিই অন্যরকম।
ক্রিকেটপ্রেমী হিসেবে লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ড এর গাইডেড ট্যুর ছিল সফরের অন্যতম আকর্ষণ। ক্রিকেটের মক্কা হিসেবে পরিচিত এই মাঠে দাঁড়িয়ে এমসিসি মিউজিয়ামে দেখলাম বিখ্যাত অ্যাশেজ আর্ন। ছোট্ট একটি মাটির পাত্র, অথচ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় দেড় শতাব্দীর ক্রিকেট ইতিহাস, আবেগ আর ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
একই দিনে শার্লক হোমসের ২২১বি বেকার স্ট্রিটও ঘুরে দেখলাম। সাহিত্যের কাল্পনিক চরিত্র হয়েও কীভাবে একটি ঠিকানা বিশ্বের কোটি মানুষের কাছে বাস্তব হয়ে উঠতে পারে, সেটি না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। লন্ডনে অবস্থানকালে বাংলাদেশ ক্রিকেট সাপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএসএ ইউকে)-এর সদস্যদের সঙ্গে সংগঠনটির ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং সিলেট টাইটান্সের জার্সি হস্তান্তর করার সুযোগও হয়েছিল। দেশের বাইরে থেকেও বাংলাদেশের ক্রিকেটকে ঘিরে তাদের ভালোবাসা ও আবেগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
সফরের শেষ দিনে গেলাম গ্রিনউইচে। পৃথিবীর সময় গণনার সূচনা যেখানে, সেই রয়্যাল অবজারভেটরির সামনে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ যে সময় অনুসরণ করে, তার কেন্দ্রবিন্দু এই ছোট্ট পাহাড়চূড়াই। ইতিহাসের সঙ্গে বিজ্ঞানের এমন মিলন খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়।
এই সাত দিনের সফরে বুঝেছি, বিলেতকে শুধু লন্ডন বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি ইতিহাসের দেশ, সাহিত্য ও জ্ঞানের দেশ, রাজতন্ত্রের দেশ, ক্রিকেটের দেশ, আবার একই সঙ্গে বহু সংস্কৃতিরও দেশ। এখানে একদিন আপনি পাঁচ হাজার বছরের পুরনো রহস্যের সামনে দাঁড়াতে পারবেন, আর পরের দিন বিশ্বের অন্যতম আধুনিক আর্থিক জেলার মাঝে হাঁটবেন।
বিশেষ ধন্যবাদ আমার লন্ডন প্রবাসী ফুফাতো বোন লিনা আপা ও দুলাভাই আশরাফুল হককে, ট্যুরটা স্মরণীয় করে তুলবার জন্য। বোনের বাড়িতে অবস্থান করার মারফত অবলোকন করেছি বাংলাদেশের ইউকে কমিউনিটির সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনার কিছুদিক।
ভ্রমণ শেষে মনে হয়েছে, একটি শহরকে শুধু তার দর্শনীয় স্থান দিয়ে বিচার করা যায় না। তাকে বুঝতে হয় তার মানুষ, তার ইতিহাস, তার সংস্কৃতি, তার শৃঙ্খলা এবং তার স্মৃতির ভেতর দিয়ে। হয়তো এ কারণেই বিলেত আজও শুধু একটি গন্তব্য নয়, বরং পৃথিবীর ইতিহাসের এক চলমান অধ্যায়।
আর আমার কাছে, এই সফর ছিল কেবল একটি বিদেশ ভ্রমণ নয়; বরং শেখা, অনুভব করা, গর্বিত হওয়া এবং নতুন স্বপ্ন নিয়ে দেশে ফেরার এক অনন্য অভিজ্ঞতা। আবার দেখা হবে প্রিয় শহর, লন্ডন। ভালো থেকো।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









