সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যকার সদ্য স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ‘মক্কা চুক্তি’তে বাংলাদেশকে যুক্ত করার যে প্রস্তাব তুর্কি গণমাধ্যমে উঠেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। কারণ সৌদি-পাক-তুর্কি জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ঢাকাকে ‘ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় বিষমতা বা অসমতা কাটিয়ে এক পরিপক্ক ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির’ দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, তুরস্কের এই নতুন কৌশল ভারতের সামরিক ও কৌশলগত বলয়ের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
একই সঙ্গে ঢাকা-আঙ্কারা প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাব্য এ বিস্তারকে দিল্লির একচ্ছত্র প্রভাব থেকে বাংলাদেশের বের হয়ে আসার ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান যে ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, তাতে যোগদানের সম্ভাবনার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছে বলে সদ্য পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হওয়া হুমায়ুন কবিরের এ মন্তব্যের পরপর ভারতের সেই উদ্বেগ আরো বেড়ে গেছে। বিষয়টিকে এভাবে উল্লেখ করা যেতে পারে- এটি যেন মাথা বাংলাদেশের, ব্যথা ভারতের।
তবে এসব ছাপিয়ে ভারত কেন নিজে ‘স্পন্সর’করে শেখ হাসিনাকে সামনে নিয়ে আসছে, সেই ব্যাপারটিও সামনে আসছে। বলা হচ্ছে, মূলত মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিসহ নতুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিষয়ক নানা সিদ্ধান্তে ভারতের অস্বস্তি কাটাতেই নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করে রাখা হচ্ছে। তাই ডিসেম্বরকে ‘ডেডলাইন’ সাজিয়ে বাংলাদেশের ওপর অব্যাহত চাপ প্রয়োগ করে যাচ্ছে দেশটি।
সূত্র জানায়, নতুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো একক দেশকে প্রাধান্য দেওয়ার রেওয়াজ থেকে বের হতে বদ্ধপরিকর- তার অনেক প্রমাণ ইতোমধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। কিন্তু সেটি কতটুকু পারবে তা সময় বলে দেবে। তবে বাংলাদেশ যদি সত্যিই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে নিজেদের অন্তর্ভুক্তির এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে তাহলে এই প্রচেষ্টা বাস্তবেই মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি নানা কারণে ভারতের জন্য নতুন মাথাব্যথা। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক “এই ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে সবার ওপর হামলা হিসেবে ধরা হবে; অর্থাৎ একটি দেশের ওপর আক্রমণ মানে, তিন দেশই একসঙ্গে তার জবাব দেবে। এতে উপসাগরীয় অর্থশক্তি, তুরস্কের ন্যাটো মানের প্রতিরক্ষাপ্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা— সব মিলিয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা জোট তৈরি হচ্ছে। এই চুক্তি এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন পশ্চিম এশিয়ায় চলমান সংকট পরিস্থিতি তীব্র আকার ধারণ করেছে।
চুক্তির আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বাড়ানো এবং যৌথভাবে সামরিক সরঞ্জাম তৈরি করা। এর মধ্যে রয়েছে যৌথ গবেষণা, প্রযুক্তি আদান-প্রদান, সহজতর প্রতিরক্ষা ক্রয় এবং ড্রোন, নৌপ্রযুক্তি, আকাশ প্রতিরক্ষা ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থার মতো আধুনিক খাতে যৌথ উৎপাদন। বাংলাদেশ এই চুক্তিতে সম্পৃক্ত হলে নানাভাবে বড় দেশগুলোর অব্যাহত হুমকি থেকে স্বস্তিতে থাকতে পারবে।
তবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হুমকি নির্ধারণ করতে গেলে ভারতীয় আধিপত্য, পুশ-ইন ও প্রতিরক্ষার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। তা ছাড়া মায়ানমার সীমান্তে রোহিঙ্গা ইস্যু তো রয়েছেই। এই রোহিঙ্গাদের সহায়তার সবচেয়ে বড় অংশীদারও কিন্তু সৌদি আরব ও তুরস্ক। তাই বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে একটা শক্ত ভিত্তি দিতে হলে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষরের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জানতে চাইলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক-ডাচেসের সহকারী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের (বিডস) নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান হোসাইন আনসারী দৈনিক এদিনকে বলেন, মক্কা জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ একদিকে যেমন বড় সুযোগ তৈরি করছে ঠিক তেমনি আবার এর পেছনে চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কারণ, সৌদি আরব হচ্ছে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয়ের সবচেয়ে বড় একটি দেশ। গত বছর প্রায় ৫.২৮ বিলিয়ন ডলার দেশটি থেকে এসেছে। এ ছাড়া আরব দেশগুলোতে বাংলাদেশের শ্রমিক পাঠানোর নির্ভরতা রয়েছে। সৌদি আরবের সাথে এ জোটে যুক্ত হলে এই শ্রমবাজার আরো বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের এলএনজি ও এনার্জি সেক্টরে যে সংকট তৈরি হয়েছে সে জায়গা থেকে সৌদি আরব বাংলাদেশকে বড় ধরনের সহযোগিতা করতে পারে।
এই অর্থনৈতিক সুযোগ ছাড়াও এ জোটে যুক্ত হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। কারণ তুরস্ক এবং পাকিস্তান ইতিমধ্যেই ড্রোন, জেএফ ৭০ ফাইটার্স এবং নেভাল প্ল্যাটফর্ম অফার করেছে- যে তিনটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে যদি ভারত ও মিয়ানমারকে সামনে রেখে চিন্তা করা হয় তাহলে বাংলাদেশের ড্রোন, এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ও ফিগ্রেটসের আধুনিকায়নের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে তুরস্ক ও পাকিস্তান বাংলাদেশকে আরো বেশি সহযোগিতা করতে পারবে। টেকনোলজি ট্রান্সফার করতে পারবে।
তিনি বলেন, ‘মোটাদাগে অর্থনৈতিক ও সামরিক জোটে যোগদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামনে দুটো সুযোগ তৈরি করবে। তবে এ ক্ষেত্রে আমাদেরকে চ্যালেঞ্জের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বিষয়টিকে কিভাবে নেবে সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। ভারত ইতিমধ্যেই বাংলাদেশের নতুন সরকারকে নানাভাবে চ্যালেঞ্জে ফেলার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে বিনা শর্তে ফেরত পাঠানো, পুশইন ও পার্বত্য চট্টগ্রামে নানা ধরনের সংকট তৈরির চেষ্টা করছে। ভারত যেহেতু বাংলাদেশের তিন দিক দিয়ে ঘেরা, তাই এ জোটে যুক্ত হলে ভারত বিষয়টিকে কিভাবে নেবে এবং ভারতের অ্যাকশনকে কিভাবে মোকাবিলা করা হবে সেটি বিবেচনায় রাখতে হবে।
তাই শুরুতেই সরাসরি এ জোটের সদস্য না হয়ে সহযোগী সদস্যপদ নেওয়ার পর ভারতের সাথে বাংলাদেশের বিদ্যমান চুক্তিগুলো নিয়ে একটা দরকষাকষি করা যেতে পারে। বিশেষ করে গঙ্গা ও তিস্তা চুক্তির বাস্তবায়ন, শেখ হাসিনা এবং ওসমান হাদির খুনিদের ফেরত পাঠানোর সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারে। এই দরকষাকষি ফলপ্রসূ না হলে পরে পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ গ্রহণ করতে পারে।
তবে এই জোটে যোগ দিলে ভারত বাংলাদেশের সাথে কী ধরনের আচরণ করতে পারে তারও একটি ‘থ্রেড এনালাইসিস’ করতে হবে যাতে এই থ্রেড পর্যালোচনা করে বাংলাদেশকে তার ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি ঢেলে সাজাতে পারে। তবে কোনোভাবেই এই সুযোগ মিস করা ঠিক হবে না বলে মন্তব্য করেন এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
এদিকে মক্কা জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে আগ্রহের খবরে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি-পাক-তুর্কি জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি ঢাকাকে "ভারতের সাথে দ্বিপক্ষীয় বিষমতা বা অসমতা কাটিয়ে এক পরিপক্ব ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির" দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
তুর্কি দৈনিক 'ইয়েনি শাফাক’র বরাত দিয়ে এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি কেবল সাধারণ কোনো পত্রিকা নয়; এটি তুরস্কের বর্তমান ক্ষমতাসীন ইসলামপন্থী দল ও প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের বেশ ঘনিষ্ঠ। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে সংবাদপত্রটি বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে আসছে এবং ঢাকার নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পূর্ণ সমর্থন জোগাচ্ছে।
প্রতিবেদনে শঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়, এই চুক্তিটি স্রেফ গণমাধ্যমের খবরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আঙ্কারা দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের আদলে বাংলাদেশের সাথেও নিজস্ব প্রতিরক্ষা সম্পর্ক গভীর করার চেষ্টা করছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন ব্লক বা এই ত্রিপক্ষীয় জোটে বাংলাদেশের যোগদানের সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে বলে আঙ্কারা সংকেত দিয়েছে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নিজেদের কৌশলগত একক প্রভাব বজায় রাখতে চাওয়া ভারতের জন্য এই সম্ভাব্য সমীকরণ বেশ অস্বস্তিকর।
এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ যদি সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগ দেয় তবে কী ঘটবে?’ তুর্কি সংবাদমাধ্যম 'ইয়েনি শাফাক'-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে সৌদি-তুরস্ক-পাকিস্তান উদীয়মান প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের যোগদানের একটি কাল্পনিক বা সম্ভাব্য দৃশ্যপট তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়েছে কিভাবে এমন একটি পদক্ষেপ ঢাকার পররাষ্ট্রনীতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভারতের সাথে সম্পর্কের সমীকরণকে নতুন রূপ দিতে পারে।
এতে বলা হয়, বাংলাদেশ যদি এই জোটে যোগ দেয়, তবে তা একটি পরিপক্ক ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির বার্তা দেবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় অসমতা কাটিয়ে একটি বহুমুখী নিরাপত্তা কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাবে। পাকিস্তান ও তুরস্ক এটিকে ইসলামিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতার এক স্বাভাবিক সম্প্রসারণ হিসেবে স্বাগত জানাবে, অন্যদিকে ভারতকে তার পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীর প্রতি ঐতিহ্যগত দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
তুরস্কের উন্নত যুদ্ধজাহাজ নির্মাণ প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের সামুদ্রিক অভিজ্ঞতার সহায়তায় বাংলাদেশ ভারতের হস্তক্ষেপ ছাড়াই তার নৌবাহিনীকে আধুনিকায়ন করতে পারবে। বঙ্গোপসাগরের বিশাল জ্বালানি সম্পদ এবং বৈশ্বিক শিপিং লেনগুলোর নিরাপত্তা তখন একটি যৌথ দায়িত্বে পরিণত হতে পারে— যা এ অঞ্চলের পূর্ব সামুদ্রিক এলাকায় দিল্লির একক কর্তৃত্ব ভেঙে দিতে সক্ষম।
বাংলাদেশের ৪,০৯৬ কিলোমিটারের দীর্ঘ স্থলসীমান্তটি আগ্রাসনের কেন্দ্র না হয়ে শান্তির সীমানা হিসেবেই থাকবে। তবে বাংলাদেশ একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত হলে নয়াদিল্লি দ্বিপক্ষীয় পানিবণ্টন ও বাণিজ্যবিরোধের মতো ইস্যুগুলোতে আরো বেশি কূটনৈতিক সতর্কতা অবলম্বন করতে বাধ্য হবে। ক্ষমতার ভারসাম্য সূক্ষ্মভাবে ঢাকার দিকে ঝুঁকবে, যা ভারতকে আঞ্চলিক অভিভাবকের বদলে এক সমান অংশীদার হিসেবে আলোচনায় বসতে বাধ্য করবে।
এই চুক্তির মাধ্যমে তুরস্কের ন্যাটো মানের প্রতিরক্ষা শিল্প— বিশেষ করে যুদ্ধে পরীক্ষিত ড্রোন বা ইউএভি প্রযুক্তি সরাসরি বাংলাদেশের হাতের নাগালে চলে আসবে। এটি পাকিস্তানের জন্য তার পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীর সাথে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক গভীর করার সুযোগ তৈরি করবে। ভারত হয়তো প্রযুক্তিগত এই পরিবর্তনকে অস্বস্তির চোখে দেখবে, তবে ঢাকার জন্য এটি হবে নিজস্ব জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার এক অভূতপূর্ব সার্বভৌম আধুনিকায়ন।
ঢাকা এযাবৎ চীন, ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের সাথে দক্ষতার সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখেছে। এই জোটে যোগ দেওয়া কোনো আগ্রাসী পদক্ষেপ হবে না, বরং এটি হবে একটি সুরক্ষাকবচ বা 'হেজ'। তুরস্কের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব এবং সৌদির আর্থিক সক্ষমতা বাংলাদেশকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বিকল্প সরবরাহ করবে, যা দেশের বিকাশকে কোনো একক আঞ্চলিক শক্তির অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশের জিম্মি হওয়া থেকে রক্ষা করবে।
এই ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মূল কৌশলগত ভিত্তি হলো পাকিস্তানের নির্ভরযোগ্য পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা। নয়াদিল্লি 'সম্প্রসারিত প্রতিরক্ষা'র এই ধারণা নিয়ে চিন্তিত হলেও, বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ এর মাধ্যমে এক অতুলনীয় কৌশলগত নিরাপত্তা বলয় পেতে পারে। শক্তির এই নতুন সমীকরণ ভারতকে তার পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশীর সাথে একটি সত্যিকারের বহু-মেরুভিত্তিক সম্পর্ক মেনে নিতে বাধ্য করবে— যা একতরফা প্রভাবের বদলে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
তুর্কি গণমাধ্যমটির বিশ্লেষণে বলা হয়, বাংলাদেশের এই জোটে যোগদান এখনো একটি সম্ভাব্য ধারণা মাত্র, তবে এটি দেশটির ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক মর্যাদার সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ। পাকিস্তানের জন্য এটি নিশ্চিত করবে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত গভীরতা এবং তুরস্কের জন্য এটি হবে দক্ষিণ এশিয়ার হৃদয়ে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ। এটি বাস্তবায়িত হলে ভারতের সবচেয়ে গঠনমূলক প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত নিয়ন্ত্রণ বা বাধা দেওয়া নয়, বরং মানিয়ে নেওয়া— এটি স্বীকার করে যে এই ব্লকের সাথে ঢাকার অংশীদারত্ব একটি নতুন বহু-মেরুভিত্তিক আঞ্চলিক ব্যবস্থারই স্বাভাবিক অংশ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারতের এই উদ্বেগের পেছনের মূল কারণ হলো দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর তার একচেটিয়া আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পাওয়া। বাংলাদেশ যদি তুরস্ক এবং সৌদি সমর্থিত কোনো নিরাপত্তা বা অর্থনৈতিক কাঠামোর অংশ হয়, তবে তা দেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সার্বভৌম পররাষ্ট্রনীতিকে আরো শক্তিশালী করবে। ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও স্বীকার করছেন যে, ভৌগোলিক অবস্থান ও নতুন আঞ্চলিক মেরুকরণের সুযোগ নিয়ে বাংলাদেশ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে ভারত যে সত্যিকার অর্থেই চিন্তায় পড়েছে তা দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সোয়ালের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের সম্ভাব্যভাবে ওই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যুক্ত হওয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে বাংলাদেশের যোগদানের আগ্রহের বিষয়টি নয়াদিল্লি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
রণধীর জয়সোয়াল বলেন, ‘আমরা পশ্চিম এশিয়ায় ঘটে চলা ঘটনাবলির ওপর নিবিড়ভাবে নজর রাখছি। এই মুহূর্তে আমার এটুকুই বলার আছে। তবে নির্দিষ্ট এই চুক্তিটির কথা বললে, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ওপর এর কী প্রভাব পড়তে পারে; তা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় ভারত সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (বর্তমানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী) হুমায়ুন কবির এক সাক্ষাৎকারে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানের আগ্রহের কথা জানান। এর পরই ভারতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এলো।
সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে হুমায়ুন কবির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘বাংলাদেশ তার নিজস্ব স্বার্থ এবং বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যের পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতি বিবেচনায় রেখে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের সমন্বয়ে গঠিত কোনো অর্থনৈতিক বা প্রতিরক্ষা কাঠামোতে যোগদানের সম্ভাবনার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে।’
তিনি বলেন, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রিয়াদ সফরের জন্য যে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, এই গ্রীষ্মের পরপরই তা চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান গত ৭ আগস্ট ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যাতে ন্যাটো-ধাঁচের সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিনটি দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা তিনটি দেশের ওপরই হামলা হিসেবে গণ্য হবে। তবে তিনটি দেশই জোর দিয়ে বলেছে, এই চুক্তিটি প্রকৃতিগতভাবে প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়।
এদিকে মক্কা জোট নিয়ে ভারতের উদ্বেগকে আরো বেশি মাত্রা দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক টুইটার পোস্ট। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক বার্তায় তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিকে’স্বাগত জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান শেষ পর্যন্ত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করায় আমি অত্যন্ত আনন্দিত।’
ট্রাম্প আরো উল্লেখ করেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ‘মধ্যপ্রাচ্য কিভাবে একত্র হচ্ছে এবং দেশগুলো শেষ পর্যন্ত কিভাবে নিজেদের আরো ভালোভাবে রক্ষা করতে সক্ষম হবে’তা ফুটে উঠেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









