মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন ভাষা আরবির হাজার বছরের পথচলা এবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে প্রযুক্তিনির্ভর আকর্ষণীয় প্রদর্শনীতে। সৌদি আরবের রিয়াদে কিং সালমান গ্লোবাল একাডেমি ফর আরাবিক ল্যাঙ্গুয়েজের সদর দপ্তরে সম্প্রতি উদ্বোধন হয়েছে ‘আরবি ভাষা : আটাশটি আলোর অক্ষর’ শীর্ষক প্রদর্শনী।
আরবি ভাষার ইতিহাস, বৈশিষ্ট্য এবং বিবর্তন নিয়ে সাজানো এই প্রদর্শনী শিক্ষাবিদ, গবেষক, শিক্ষক, ছাত্র এবং আরবি ভাষাপ্রেমীদের জন্য একটি সৃজনশীল ও সমসাময়িক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। ইন্টারঅ্যাকটিভ ডিসপ্লের মাধ্যমে দর্শকরা ভাষাতাত্ত্বিক বিভিন্ন বিষয় অন্বেষণ করতে পারছেন, আধুনিক শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে মিশতে পারছেন এবং আরবি শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়াতে বিশেষ প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারছেন।
প্রদর্শনীর একাংশে আরব উপদ্বীপের ভাষার ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কীভাবে বিশ্বের ভাষাগুলোকে প্রধান ভাষাগোষ্ঠীতে শ্রেণীবদ্ধ করেছেন পণ্ডিতরা এবং বিভিন্ন ভাষাতাত্ত্বিক পদ্ধতি কীভাবে ভিন্ন শ্রেণীবিন্যাস তৈরি করেছে। অনেক ভাষাবিদ আরবিকে হ্যামিটো-সেমিটিক ভাষাগোষ্ঠীর দক্ষিণ-পশ্চিম সেমিটিক ভাষার অন্তর্গত বলে মনে করেন, যার মধ্যে উত্তর ও দক্ষিণ আরবি এবং আরব উপদ্বীপের ভাষাসমূহ অন্তর্ভুক্ত।
প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হয়েছে প্রামাণিক পাথরের নমুনা যেগুলোতে প্রাচীন থামুদিক ও নাবাতিয়ান লিপির শিলালিপি রয়েছে — এগুলো শতাব্দী ধরে পাথর ও উপত্যকার দেয়ালে সংরক্ষিত, আরবে লিপি ও ভাষার বিবর্তনের চিরস্থায়ী প্রমাণ। লেখার বিবর্তনও তুলে ধরা হয়েছে এখানে।
প্রাচীন সভ্যতাগুলো পাথর, তামা, কাঠ, মাটির ফলক, গাছের উপাদান, উটের কাঁধের হাড় ও পাঁজরা এবং চামড়ায় লিখত। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দের গোড়ায় সুমেরীয়রা তীক্ষ্ণ স্টাইলাস ব্যবহার শুরু করে নরম মাটির ফলকে খোদাই করে, যা পরে রোদে শুকিয়ে নেওয়া হত — এই স্টাইলাসের তীর্যক ছাপ থেকে উদ্ভূত হয় কুনিফর্ম লিপি।
লেখার উপকরণের বিবর্তনও উল্লেখযোগ্য। উমাইয় যুগে ক্যালিগ্রাফার খালিদ ইবনে আবি আল-হাইয়াজ ও কুতবাহ আল-মুহাররির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে, আর আব্বাসীয় যুগে আরবি ক্যালিগ্রাফির জনক হিসেবে খ্যাত ইবনে মুকলাহ এবং তার শিষ্য ইবনে আল-বাওয়াবের উত্থান ঘটে। শতাব্দী ধরে আরব পণ্ডিতরা কলম ধরা ও কাটার বিস্তারিত নিয়ম তৈরি করেন এবং লেখার উপকরণ নিয়ে গ্রন্থ রচনা করেন। আব্বাসীয় যুগে কাগজ তৈরির কৌশল বিকশিত হয় এবং মুসলিমরাই প্রথম কাগজ স্পেনে নিয়ে যান, যা ইউরোপজুড়ে এর বিস্তারের পথ সুগম করে।
প্রদর্শনীটি একটি উন্নত জ্ঞানভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও কাজ করছে, যেখানে আরবিকে সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করা হয়েছে। সৌদি আরবের আরবি ভাষা সমর্থন, আরবি শিক্ষার উন্নয়ন, একাডেমিক ও বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে এর উপস্থিতি শক্তিশালীকরণ এবং বৈশ্বিক প্রচারের প্রচেষ্টাও তুলে ধরা হয়েছে। ইন্টারঅ্যাকটিভ পরিবেশের মাধ্যমে দর্শকরা আরবির দীর্ঘ ইতিহাস, শতাব্দী ধরে এর বিবর্তন এবং চিন্তা, বিজ্ঞান ও শিল্পে এর অবদান সম্পর্কে গভীর ধারণা পান।
ভাষাতত্ত্বে ডক্টরেট গবেষক আলি আল-আহমাদ মনে করেন, এই প্রদর্শনী আরবির ইতিহাস ও বিকাশকে তাত্ত্বিক বক্তৃতাকক্ষ ও গবেষণাপত্র থেকে জীবন্ত, ইন্টারঅ্যাকটিভ ভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে।
তিনি বলেন, গবেষক হিসেবে আমাদের জন্য এটি একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা—আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আমাদের ভাষার অসাধারণ গল্প বলা হচ্ছে। দর্শকরা প্রায় অনুভব করেন যে আরবি একটি জীবন্ত জীব, যা তার পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে ক্রমাগত বিবর্তিত হচ্ছে।
শব্দের মূল, বিভক্তির ধরন এবং অর্থগত বিকাশকে দৃশ্য ও ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রযুক্তিগত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উপস্থাপন দেখে তিনি বলেন, বছরের পর বছরের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাকে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। এই প্রদর্শনী ডিজিটাল প্রজন্ম ও আরবি লিপির ঐতিহ্যের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে দিয়েছে, যা প্রমাণ করে যে আরবি কেবল আজকের জ্ঞানের পরিবেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না, বরং তা নেতৃত্ব দিতেও পূর্ণ সক্ষম।
প্রদর্শনীটি রিয়াদে একটি সাংস্কৃতিক ল্যান্ডমার্ক হিসেবেও কাজ করছে, আরবির মর্যাদা পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক, পর্যটন ও ঐতিহ্য খাতে সৌদি ভিশন ২০৩০-এর লক্ষ্যগুলোকে সমর্থন করছে।
সূত্র : আশার্ক আল-আওসাত


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









