হোমারের ওডিসিউস শুধু একজন বীরের যুদ্ধশেষে বাড়ি ফেরার গল্প নয়; এটি নারী, ক্ষমতা, কৌশল, প্রলোভন এবং মানবিক দুর্বলতার গল্পও। লেখক দেখিয়েছেন, ওডিসিউস একজন পুরুষ নায়ক হলেও তার যাত্রার প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্ধারণ করেন নারী চরিত্র যেমন দেবী, ক্ষুদ্র দেবী, জাদুকরী বা স্ত্রী।
গল্প শুরু হয় ওডিসিউসকে নিয়ে, ‘ট্রয়’ যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও তিনি নিজের রাজ্যে ফিরতে পারেননি। সাত বছর ধরে ওগিজিয়া দ্বীপে নিম্ফ ক্যালিপসোর সঙ্গে বাস করছেন। লেখকের মতে তিনি আসলে নিজের মানসিক অবস্থায় বন্দি আছেন। আধুনিক দৃষ্টিতে তার দীর্ঘ স্থবিরতা ও যুদ্ধ-পরবর্তী অসহায়ত্বকে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি)-এর লক্ষণ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। তবুও ক্যালিপসোর আকর্ষণ ছিল প্রবল। ওডিসিউস নিজেই স্বীকার করেন যে তার স্ত্রী পেনেলোপি সৌন্দর্যে ক্যালিপসোর সমকক্ষ নন, কারণ তিনি একজন সাধারণ মানুষ, দেবী নন।

এদিকে ইথাকায় তার স্ত্রী পেনেলোপি একেবারেই নিষ্ক্রিয় ছিলেন না। ওডিসিউসের দীর্ঘ সময় রাজ্যে অনুপস্থিত থাকায় ১০৮ জন প্রার্থী তাকে বিয়ে করে রাজা হতে চেয়েছিল। কিন্তু পেনেলোপি অসাধারণ বুদ্ধি ও ধৈর্যের সঙ্গে তাদের প্রতিরোধ করেন। তিনি ঘোষণা করেন, শ্বশুর লায়ার্টিসের জন্য একটি কাফনের কাপড় বোনা শেষ হলে তিনি বিয়ের সিদ্ধান্ত নেবেন। দিনে তিনি কাপড় বুনতেন, আর রাতে গোপনে সেই বোনা অংশ খুলে ফেলতেন। ফলে কাজ কখনো শেষ হতো না এবং বিয়েও পিছিয়ে যেত। এই কৌশল ওডিসিউসের রাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

দেবতাদের মধ্যে ওডিসিউসের সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন জ্ঞান ও কৌশলের দেবী অ্যাথেনা। ট্রয় যুদ্ধেও তিনি ওডিসিউসকে সাহায্য করেছিলেন এবং পরে দেবতাদের সভায় তার বাড়ি ফেরার উদ্যোগ নেন। ওডিসিউস যখন ফিয়াসিয়ানদের দেশে অসহায় অবস্থায় পৌঁছান, তখন অ্যাথেনা তাকে রক্ষা করেন, তার দুর্বলতা আড়াল করেন এবং তার চেহারা আরও আকর্ষণীয় ও দেবতুল্য করে তোলেন। এর ফলে ফিয়াসিয়ানরা তাকে সম্মান, আশ্রয়, ধনসম্পদ এবং নিরাপদে ইথাকায় ফেরার জন্য জাহাজ দেয়।

লেখক বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে অ্যাথেনা অধিকাংশ সময় পুরুষের ছদ্মবেশ ধারণ করেন। কখনও তিনি মেন্তেস নামে এক রাজা, আবার কখনো একজন পুরুষ দূতের রূপ নেন। এর মাধ্যমে লেখক বোঝাতে চান, মানুষের সমাজে ক্ষমতা অনেক সময় পুরুষদের হাতে থাকলেও, ঘটনাপ্রবাহকে পরিচালনা করায় নারীরা প্রায়ই কৌশল ও ছদ্মবেশের মাধ্যমে প্রয়োগ করেন।

ফিয়াসিয়ানদের কাছে ওডিসিউস তার আগের নানা অভিযানের কাহিনী বলেন। সেখানে তিনি লোটাস ভক্ষণকারী জাতি, সাইক্লোপস এবং আরও নানা বিপদের পাশাপাশি একাধিক রহস্যময় নারীর কথাও বলেন।
তাদের মধ্যে অন্যতম হলো সাইরেনরা। পরবর্তী যুগের শিল্প ও কাহিনিতে তাদের অর্ধ-পাখি বা মৎস্যকন্যারূপে দেখানো হলেও, হোমারের বর্ণনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাদের মধুর গান। সেই গান নাবিকদের এমনভাবে মোহিত করত যে তারা নিজেরাই মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেত। তাদের দ্বীপের সামনে অসংখ্য মানুষের হাড় ছড়িয়ে ছিল। ওডিসিউস সেই গান শুনতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আগেই তার সঙ্গীদের নির্দেশ দেন তাকে জাহাজের মাস্তুলে শক্ত করে বেঁধে রাখতে, যাতে তিনি গান শুনে জলে ঝাঁপ দিতে না পারেন। ফলে তিনি গানও শুনতে পারেন এবং প্রাণও বাঁচান।
আরেক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ‘সার্সি’। প্রথম দেখায় তিনি বিপজ্জনক বলে মনে হয় না। কিন্তু তার সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে ছিল শক্তিশালী জাদুবিদ্যা। তিনি ভেষজ ও ওষুধের সাহায্যে ওডিসিউসের সঙ্গীদের শূকরে রূপান্তরিত করেন। তবে তিনি কেবল বাধাই সৃষ্টি করেন না। পরে ওডিসিউস তার প্রেমিক হয়ে ওঠেন এবং সার্সিই তাকে পাতালে যাওয়ার পথ দেখান। সেখানে তিনি অন্ধ ভবিষ্যদ্বক্তা টিরেসিয়াসের সঙ্গে দেখা করেন, যিনি ইথাকায় ফেরার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দেন।
লেখকের মতে, ওডিসিউস-এর নারী দানব, নিম্ফ (ক্ষুদ্র দেবী) ও প্রলোভনের চরিত্রগুলোকে উপেক্ষা করে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়। কে তাদের সঙ্গে কোনো না কোনো মাত্রায় সম্পর্ক গড়তেই হয়, কিন্তু সেই সম্পর্ক যেন সীমা না ছাড়ায়। এখানেই আসে সংযমের ধারণা, যা প্রাচীন গ্রিকদের অন্যতম আদর্শ গুণ ছিল।
নিবন্ধটি আরো একটি আকর্ষণীয় ব্যাখ্যা দেয়। অনেক পাঠকের ধারণা, ওডিসিউস তার বহু অভিযানের গল্প নিজেই বাড়িয়ে বলেছেন, যাতে ফিয়াসিয়ানরা মুগ্ধ হয়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে দেয়। যদি এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হয়, তবে সাইক্লোপস, সাইরেন বা অন্য সব দানবকে বাস্তব প্রাণী না ভেবে মানুষের অন্তর্গত ভয়, লোভ, দুর্বলতা ও মানসিক সংগ্রামের প্রতীক হিসেবেও দেখা যায়। অর্থাৎ ওডিসিউস হয়তো বাইরের দানবের চেয়ে নিজের ভেতরের দানবের সঙ্গেই বেশি লড়াই করেছেন।
লেখক বলেন, ওডিসিউসের গল্পের এই অস্পষ্টতা কতটা সত্য আর কতটা কল্পনা তা-ই এই মহাকাব্যের অন্যতম আকর্ষণ। অনুবাদক এমিলি উইলসনের ভাষায় তিনি একজন "জটিল মানুষ"। তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী নিজের পরিচয় বদলান, গল্প বদলান এবং প্রতারণাকেও কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেন।
সবশেষে লেখক উপসংহারে বলেন, ওডিসিউসের বুদ্ধিমত্তা, কল্পনাশক্তি, ত্রুটি, দুর্বলতা এবং নারীদের প্রতি তার আকর্ষণই তাকে প্রাচীন গ্রিসের সবচেয়ে মানবিক নায়কে পরিণত করেছে। তার শক্তি ও দুর্বলতা একই উৎস থেকে এসেছে। আর এই কারণেই প্রায় ২,৮০০ বছর পরেও ওডিসিউস আধুনিক পাঠকদের কাছে প্রাসঙ্গিক ও আকর্ষণীয়।
সূত্র : বিবিসি
লেখক : ডেইজি ডুন
অনুবাদক : ইসলামুল হাফিজ নির্জন


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









