একদিকে সাংহাইয়ে বইপ্রেমীদের ভিড়, অন্যদিকে নাইরোবি, আম্মান, ফ্রাঙ্কফুর্ট, মায়ামি ও গুয়াদালাহারায় চলছে বড় আন্তর্জাতিক বইমেলার প্রস্তুতি। আগামী কয়েক মাসে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বসবে এসব আয়োজন। কোথাও গুরুত্ব পাবে আফ্রিকার সাহিত্য, কোথাও আরব সংস্কৃতি, কোথাও আবার আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ব্যবসা ও বইয়ের স্বত্ব। আর ফ্রাঙ্কফুর্ট ও গুয়াদালাহারায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে থাকছে যথাক্রমে চেচনিয়া ও ইতালি। সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বই ও সাহিত্য ঘিরে ব্যস্ত হয়ে উঠছে বিশ্ব।
বইমেলা এখন আর শুধু বই কেনাবেচার জায়গা নয়। লেখক, পাঠক, প্রকাশক, অনুবাদক, বই বিক্রেতা ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মিলনস্থলে পরিণত হয়েছে বড় আন্তর্জাতিক বইমেলাগুলো। নতুন বই প্রকাশের পাশাপাশি এসব আয়োজনে চলে সাহিত্য আলোচনা, লেখকের সঙ্গে পাঠকের দেখা, বইয়ের আন্তর্জাতিক স্বত্ব কেনাবেচা, অনুবাদ নিয়ে আলোচনা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন শহরে এমন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছু বইমেলার প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শেষ পর্যায়ে, আবার কোথাও চলছে অংশগ্রহণকারী প্রকাশক ও লেখকদের নিয়ে পরিকল্পনা।

সাংহাইয়ে বইয়ের উৎসব
চীনের সাংহাইয়ে, ২০২৬ সাংহাই বইমেলা ১২ আগস্ট শুরু হয়েছে। সাংহাই এক্সিবিশন সেন্টার ও সাংহাই বুক সিটিকে কেন্দ্র করে চলছে এবারের আয়োজন। বই দেখা ও কেনার পাশাপাশি মেলায় সাংস্কৃতিক আয়োজনও রয়েছে।
প্রথম দিনেই বইপ্রেমীদের উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে মেলা প্রাঙ্গণ। কেউ বই দেখছেন, কেউ পছন্দের বই কিনছেন, আবার কেউ মেলার ব্যস্ততার মধ্যেই বই পড়ায় ডুবে আছেন। ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপস্থাপনাও মেলার পরিবেশে যোগ করেছে বাড়তি আকর্ষণ।

সাংহাইয়ের এই আয়োজন দেখিয়ে দিচ্ছে, ডিজিটাল যুগেও বইকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ কমেনি। বরং প্রযুক্তির পাশাপাশি ছাপা বই ও সরাসরি পাঠের অভিজ্ঞতার জন্যও পাঠকেরা এখনো বড় আয়োজনগুলোতে ভিড় করছেন।
নাইরোবিতে আফ্রিকার বইয়ের বাজার
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বইয়ের বড় আয়োজন বসবে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে। নাইরোবি আন্তর্জাতিক বইমেলার ২৭তম আসর অনুষ্ঠিত হবে ২৩ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর। ভেন্যু সারিত এক্সপো সেন্টার। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, আফ্রিকা ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকাশনা পেশাজীবী, লেখক, বই বিক্রেতা, মুদ্রণসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমকর্মী ও পাঠকেরা এতে অংশ নেবেন।
নাইরোবির বইমেলার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে আফ্রিকার প্রকাশনা শিল্পের জন্য। এই মেলা স্থানীয় লেখক ও প্রকাশকদের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ করে দেয়। একই সঙ্গে আফ্রিকার গল্প, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমকালীন চিন্তাভাবনা বিশ্বের পাঠকদের সামনে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়।
এবারের মেলাকে সামনে রেখে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি চলছে। মেলার মূল লক্ষ্য শুধু বই প্রদর্শন নয়; লেখক, প্রকাশক ও পাঠকদের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং আফ্রিকার বইয়ের বাজারকে আরও শক্তিশালী করা।
আম্মানে আরব সাহিত্য ও সংস্কৃতির মিলন
নাইরোবির পরই শুরু হবে আম্মান আন্তর্জাতিক বইমেলা। জর্ডানের রাজধানীতে ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে মেলাটি। আয়োজনের স্থান জর্ডান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল এক্সিবিশনস হল, মেক্কা মল।
এবারের মেলায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ইরাক। ইরাককে সম্মানিত অতিথি করা হয়েছে। জুলাইয়ে মেলার আয়োজকেরা ইরাকের অংশগ্রহণ ও সম্মানিত অতিথি হিসেবে ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছেন।
ইরাকের সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সামনে আনার ফলে এবারের মেলায় আরব বিশ্বের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য আরও স্পষ্টভাবে উঠে আসতে পারে। বইয়ের পাশাপাশি লেখক-পাঠক যোগাযোগ, সাহিত্য আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আম্মান হয়ে উঠবে আরবি সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
ফ্রাঙ্কফুর্টে চেকিয়ার প্রস্তুতি
অক্টোবরে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে বসবে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা আয়োজনগুলোর একটি—ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা। ৭ থেকে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে মেলা। এবারের সম্মানিত অতিথি চেকিয়া।
চেকিয়াকে ঘিরে এবারের প্রস্তুতিও বেশ বড়। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার আয়োজকেরা জানিয়েছেন, অক্টোবরের মেলায় দেশটির ৭৫ জন লেখক অংশ নেবেন। সম্মানিত অতিথি প্যাভিলিয়নে পাঁচ দিনজুড়ে থাকবে পাঠ, আলোচনা ও পেশাজীবীদের বিভিন্ন আয়োজন। ফ্রাঙ্কফুর্টের বাইরেও জার্মানভাষী অঞ্চলের বিভিন্ন জায়গায় চেক সংস্কৃতি ও সাহিত্য নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার গুরুত্ব শুধু পাঠক ও লেখকদের মিলনেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকাশনা ব্যবসায় বইয়ের আন্তর্জাতিক স্বত্ব, অনুবাদ ও নতুন বাজার খোঁজার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সম্মানিত অতিথি হিসেবে চেকিয়ার অংশগ্রহণ দেশটির লেখক ও প্রকাশকদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করবে।
মায়ামিতে লেখক-পাঠকের বড় মিলন
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামিতে বসবে মায়ামি বইমেলা। ১৫ থেকে ২২ নভেম্বর পর্যন্ত চলবে আট দিনের এই আয়োজন। এর মধ্যে ২০ থেকে ২২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে বহুল জনপ্রিয় ‘স্ট্রিট ফেয়ার’।
আয়োজকেরা জানিয়েছেন, এবারের মেলায় শত শত লেখক অংশ নেবেন। তিন ভাষায় রাজনীতি, জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও নানা ধরনের সাহিত্য নিয়ে থাকবে আলোচনা। শিশুদের জন্যও থাকবে আলাদা আয়োজন।
মেলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রদর্শকদের জন্য আবেদন নেওয়া হচ্ছে। প্রকাশক, বই বিক্রেতা ও স্বনির্ভর লেখকদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ মায়ামি বইমেলা শুধু বড় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়; ছোট প্রকাশক ও স্বাধীন লেখকদেরও পাঠকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ করে দিচ্ছে।
শহরের কেন্দ্রস্থলকে কয়েক দিনের জন্য সাহিত্যিক উৎসবের এলাকায় পরিণত করার এই আয়োজন মায়ামির সাংস্কৃতিক জীবনে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

গুয়াদালাহারায় ইতালিকে ঘিরে আয়োজন
বছরের শেষ বড় আয়োজনগুলোর একটি হবে মেক্সিকোর গুয়াদালাহারা আন্তর্জাতিক বইমেলা। ২৮ নভেম্বর থেকে ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে এর ৪০তম আসর। ভেন্যু এক্সপো গুয়াদালাহারা। এবার সম্মানিত অতিথি ইতালি।
ইতালি ইতিমধ্যে তাদের সম্মানিত অতিথি কর্মসূচির প্রস্তুতি প্রকাশ করেছে। জুলাইয়ে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশটি গুয়াদালাহারায় সাহিত্য ও সংস্কৃতির বড় একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।
মেলার সময়সূচিও ইতিমধ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট দিনে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। ৪ ডিসেম্বর ‘নাইট সেল’-এর কারণে সময় বাড়িয়ে রাত ১১টা পর্যন্ত করা হবে। ৩০ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বর পর্যন্ত পেশাজীবীদের জন্য আলাদা সময় রাখা হয়েছে।
ইতালির জন্য এবারের আয়োজন আরও তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটির সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতিকে মেক্সিকো ও লাতিন আমেরিকার পাঠকদের সামনে নতুন করে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।
আগস্ট থেকে ডিসেম্বর—মাত্র পাঁচ মাসে সাংহাই, নাইরোবি, আম্মান, ফ্রাঙ্কফুর্ট, মায়ামি ও গুয়াদালাহারা হয়ে উঠবে বই ও সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ছয়টি মেলার আয়োজনের ধরন আলাদা, পাঠকও আলাদা। কিন্তু উদ্দেশ্যের জায়গায় রয়েছে মিল—বইকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং মানুষকে বইয়ের কাছে ফিরিয়ে আনা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









