পুরনো পুকুর—ব্যাঙ লাফ দিল; জলের শব্দ— মাতসুও বাশো
কিয়োটোর কোনো পুরোনো গলিতে যদি মাঝরাতে একটি ব্যাঙ লাফ দেয়, তার শব্দ কত দূর পর্যন্ত যায়—এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো বিজ্ঞানী দিতে পারবেন। কিন্তু যদি সেই শব্দ চারশো বছর পেরিয়ে আজও আমাদের কানে এসে পৌঁছায়, তখন বিজ্ঞানীর চেয়ে ইতিহাসবিদের কাজ কঠিন হয়ে যায়।
কারণ শব্দেরও বয়স হয়। বইয়েরও হয়। আর মানুষের কৌতূহলেরও হয়। জাপানের কিয়োটোর পুরোনো বইয়ের ইতিহাসে ‘নাগাতা বুনশোদো’—ঠিক এমনই এক দীর্ঘ প্রতিধ্বনির নাম।
কখনো এটি ছিল বইয়ের দোকান। কখনো প্রকাশকের ঘর। কখনো বৌদ্ধ গ্রন্থের ভাণ্ডার। কখনো গবেষণার বই ছাপার প্রতিষ্ঠান। আর সব সময়ই, কোনো না কোনো অর্থে, এটি ছিল জ্ঞানের এক খোলা দরজা।
দরজাটি কখন প্রথম খোলা হয়েছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমাদের যেতে হয় ‘কেইচো যুগে’, ষোড়শ শতকের শেষভাগ থেকে সপ্তদশ শতকের শুরুর জাপানে। কিয়োটোর বই ও প্রকাশনা-ইতিহাস নিয়ে প্রকাশিত নথিতে নাগাতা বুনশোদোর সূচনা এই সময়কালে লিখিত রয়েছে। তাকে কিয়োটোর প্রাচীনতম বইয়ের দোকানগুলোর একটি, এমনকি কিছু ঐতিহাসিক বর্ণনায় শহরের প্রাচীনতম বইয়ের দোকান হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু একটি তারিখ কখনো একটি গল্প নয়। তারিখ হলো দরজার ওপর লেখা সংখ্যা। গল্পটি শুরু হয় দরজা খোলার পর।
এই পথে কেউ যায় না—শরতের সন্ধ্যা — মাতসুও বাশো
সেই সময়ের কিয়োটোকে আজকের কিয়োটো দিয়ে কল্পনা করলে আমরা ভুল করব। আজকের শহরে বিদ্যুৎ আছে, ট্রেন আছে, নিয়ন আলো আছে, পর্যটকের ভিড় আছে। কিন্তু কয়েক শতাব্দী আগে কিয়োটো ছিল মন্দির, প্রাসাদ, কারিগর, পণ্ডিত, পুরোহিত, ব্যবসায়ী ও বইয়ের শহর। বিশেষ করে বইয়ের সঙ্গে ধর্মের সম্পর্ক ছিল গভীর।
বৌদ্ধ মন্দির শুধু প্রার্থনার স্থান ছিল না। সেখানে শিক্ষা ছিল। পাঠ ছিল। আলোচনা ছিল। পাণ্ডুলিপি ছিল। শিক্ষক ছিলেন। ছাত্র ছিলেন। আর যেখানে শিক্ষা আছে, সেখানে বই দরকার। এই জায়গাতেই নাগাতা বুনশোদোর যাত্র।
কিন্তু এখানে একটি মজার সমস্যা আছে। আমরা যখন বলি ‘বইয়ের দোকান’, তখন আমাদের মাথায় আধুনিক দোকানের ছবি আসে—কাঁচের দরজা, তাক, দাম লেখা বই, কাউন্টার, নগদ বা কার্ডে টাকা দেওয়া।
কিন্তু সেই সময়ের ‘হোন-ইয়া’—বইয়ের ব্যবসা—এমন সরল ছিল না। একজন বই ব্যবসায়ী একই সঙ্গে বই প্রকাশ করতে পারতেন, ছাপতে পারতেন, বিক্রি করতে পারতেন, আবার পুরোনো বইও কিনে রাখতে পারতেন। অর্থাৎ বইয়ের জন্ম, জীবন এবং দ্বিতীয় জীবন—তিনটিই একই ব্যবসায়ীর হাতে থাকতে পারত। আজকের ভাষায় বললে, নাগাতা বুনশোদো ছিল একই সঙ্গে ‘প্রকাশনা সংস্থা, ছাপাখানা, বইয়ের দোকান এবং জ্ঞানের ভান্ডার’।
এখানেই গল্পটি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। কারণ যে মানুষ বই বিক্রি করে, সে পাঠকের হাতে জ্ঞান তুলে দেয়। কিন্তু যে মানুষ বই প্রকাশ করে, সে ঠিক করে দেয়—‘কোন জ্ঞান পাঠকের হাতে পৌঁছাবে।’
তুষারের রাত—একাকী পথিকের পায়ের শব্দ— ইয়োসা বুসন
একটি বই ছাপা এখন খুব সহজ। কম্পিউটারে লিখলাম। ফাইল পাঠালাম। মেশিন ছাপল। হাজার কপি বেরিয়ে গেল। কিন্তু তখন? একটি কাঠের ব্লক তৈরি করতে হতো। তার ওপর অক্ষর খোদাই করতে হতো। একটি ছোট ভুলও পুরো পৃষ্ঠাকে নষ্ট করতে পারত। তারপর কাগজ। কালি। শ্রমিক। সময়। ধৈর্য। আর অর্থ। একটি বই তাই তখন ছিল অনেক মানুষের সম্মিলিত শ্রমের ফল। কেউ লিখেছেন। কেউ সম্পাদনা করেছেন। কেউ কাঠে অক্ষর কেটেছেন। কেউ কাগজ তৈরি করেছেন। কেউ ছাপিয়েছেন। কেউ বাঁধাই করেছেন। তারপর বইটি দোকানে এসেছে। একজন পাঠক সেটি কিনেছেন। এখানে আমরা ইতিহাসের একটি গোপন সত্য দেখতে পাই।
‘জ্ঞান কখনো একা ভ্রমণ করে না।’ তার সঙ্গে ভ্রমণ করে কাগজ। কালি। মানুষের হাত। বাজার। অর্থনীতি। প্রযুক্তি। আর বিশ্বাস। নাগাতা বুনশোদোর ইতিহাস তাই শুধু বইয়ের ইতিহাস নয়। এটি সেইসব মানুষের ইতিহাস, যারা বইকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে গেছে।
বসন্তের বৃষ্টি—ছাতার নিচে দুজন মানুষ— কোবায়াশি ইস্সা
কিয়োটোর বইয়ের ইতিহাসে ‘নিশি হোংগানজি’ একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। নাগাতা বুনশোদোর ইতিহাসও এই বুদিস্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে যুক্ত। এখানে আমাদের গল্পের আরেকটি দরজা খুলে যায়। ধরা যাক, একটি মন্দিরে কোনো ধর্মীয় গ্রন্থ পড়ানো হচ্ছে। একজন পুরোহিত সেটি ব্যাখ্যা করছেন। দশজন শুনছে। কিন্তু সেই শিক্ষা যদি বইয়ে ছাপা হয়? তাহলে দশজন নয়, একশজন পড়তে পারে। একশজন নয়, এক হাজারজন। তারপর তাদের সন্তানরা। তারপর তাদের সন্তানরা। অর্থাৎ বই একটি মুহূর্তকে দীর্ঘ সময়ে পরিণত করে।
একজন শিক্ষক একদিন কথা বলেন। একটি বই সেই কথাকে কয়েক শতাব্দী বাঁচিয়ে রাখতে পারে। নাগাতা বুনশোদো এই কাজের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বৌদ্ধ গ্রন্থ প্রকাশ ও প্রচারের মাধ্যমে এটি মন্দিরের জ্ঞানকে বৃহত্তর পাঠকসমাজে পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। এখানে ‘দোকান’ শব্দটি খুব ছোট হয়ে যায়। এটি ছিল এক ধরনের ‘জ্ঞান-পরিবহন ব্যবস্থা’।

এই পৃথিবী—এক শিশুর হাতে ধরা একটি শিশিরবিন্দু— কোবায়াশি ইস্সা
একটি বইয়ের কথা ভাবুন। আমরা তার নাম জানি না। লেখকের নামও হয়তো জানি না। কোনো একদিন সেটি নাগাতা বুনশোদো থেকে বের হলো। কেউ কিনল। তারপর বইটি গেল একটি মন্দিরে। সেখানে একজন তরুণ সন্ন্যাসী পড়ল। সে কিছু দাগ টানল। পাশে কয়েকটি শব্দ লিখল। বছর কেটে গেল। সন্ন্যাসী বৃদ্ধ হলো। বইটি তার ছাত্রের হাতে গেল। তারপর আরেকজনের হাতে। কোনো একদিন বইটি কোনো আলমারিতে উঠে গেল। শত বছর পরে কেউ সেটি আবার বের করল।
আমরা জানি না সত্যিই এমন কোনো বইয়ের জীবন ছিল কি না। কিন্তু এমন জীবন হওয়া অসম্ভবও নয়। এবং এখানেই ইতিহাসের সৌন্দর্য। আমরা সব মানুষের নাম জানি না। কিন্তু তাদের হাতের ছাপ বইয়ের পাতায় থেকে যায়। একটি পুরোনো বই তাই অনেক সময় একটি ‘অজ্ঞাত মানুষের জীবনের স্মৃতিস্তম্ভ’।
পৃথিবীর সব পথ—আজও বসন্তের দিকে যায়— মাসাওকা শিকি
এখানে একটি আপাত-বিরোধ আছে। জ্ঞানকে যদি মানুষের কাছে পৌঁছাতে হয়, তাকে বইয়ে পরিণত করতে হবে। বইকে যদি মানুষের কাছে পৌঁছাতে হয়, তাকে বিক্রি হতে হবে। অর্থাৎ জ্ঞানকে বাজারে যেতে হবে। এতে কেউ অস্বস্তি বোধ করতে পারেন।
‘জ্ঞান কি তবে পণ্য?’ হ্যাঁ—এক অর্থে। কিন্তু এই পণ্য হওয়াই কখনো কখনো জ্ঞানকে বাঁচিয়ে রাখে। একটি বই যদি শুধু মন্দিরের ভেতর থাকে, তার পাঠক সীমিত। কিন্তু বই যদি বাজারে আসে, কেউ সেটি কিনতে পারে। বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে। অন্যকে দিতে পারে। পুরোনো হয়ে গেলে আবার বিক্রি করতে পারে। এইভাবে বাজার জ্ঞানকে ছড়িয়ে দেয়।
নাগাতা বুনশোদোর মতো বই ব্যবসায়ীরা এই জটিল ব্যবস্থার মধ্যস্থতাকারী ছিলেন। তারা একদিকে ব্যবসায়ী। অন্যদিকে জ্ঞানের বাহক। দুটির মধ্যে সীমারেখাটি সব সময় পরিষ্কার ছিল না। আসলে কখনো ছিলই না।
মানুষের পৃথিবী—শিশিরের মতো, তবু আমরা তাকে আঁকড়ে ধরি— কোবায়াশি ইস্সা
একটি ধর্মীয় বই যখন একজন সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছায়, তখন একটি ছোট বিপ্লব ঘটে। মন্দিরের জ্ঞান ঘরের জ্ঞান হয়ে যায়। একজন বাবা পড়ছেন। ছেলে শুনছে। মা হয়তো পাশে বসে আছেন। পরিবারের কেউ হয়তো পুরোটা বুঝছেন না। তবু শব্দগুলো ঘরের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে। এইভাবেই জ্ঞান সামাজিক হয়।
বই শুধু শিক্ষিত মানুষের সম্পত্তি থাকে না। ধীরে ধীরে তা পারিবারিক স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। জাপানের বৌদ্ধ সংস্কৃতির বিস্তারে মুদ্রিত গ্রন্থের ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই বইগুলোর উৎপাদন ও প্রচারের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ইতিহাসও তাই গুরুত্বপূর্ণ। ‘নাগাতা বুনশোদো’ এই দীর্ঘ যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম।
আমি যদি ফুল না-ও দেখি, বসন্ত কোথাও না কোথাও আসবেই— মাসাওকা শিকি
সময় কখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। জাপান বদলাল। আধুনিক শিক্ষা এল। বিশ্ববিদ্যালয় এল। গবেষণার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হলো। শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, ইতিহাস, দর্শন, সমাজ, সংস্কৃতি ও বৌদ্ধ অধ্যয়ন নিয়ে নতুন ধরনের গবেষণা শুরু হলো। এই সময় ‘নাগাতা বুনশোদো’র ভূমিকারও পরিবর্তন ঘটল।
প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশনা পরবর্তীকালে গবেষণামূলক বৌদ্ধ সাহিত্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়-সম্পর্কিত কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়। ‘রিউকোকু বিশ্ববিদ্যালয়’-এর গবেষকদের বইও ‘নাগাতা বুনশোদোর’ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এখানে আমরা একটি চমৎকার পরিবর্তন দেখতে পাই। একসময় বই ছিল ধর্মীয় শিক্ষার বাহন। পরে বই হয়ে উঠল গবেষণার বাহন। কিন্তু মাধ্যমটি একই—বই। শুধু প্রশ্ন বদলেছে। আগে প্রশ্ন ছিল—‘মানুষ কীভাবে মুক্তি পাবে?’ পরে প্রশ্ন হলো—‘এই ধর্মের ইতিহাস কী?’ ‘এই ধারণার জন্ম কোথায়?’ ‘সমাজ কীভাবে বদলেছে?’ ‘পুরোনো গ্রন্থের ভাষা কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে?’ অর্থাৎ জ্ঞান নিজের ভেতরেই নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
শীতের চাঁদ—নদীর ওপর একা— মাতসুও বাশো
একজন গবেষককে কল্পনা করুন। রাতে তাঁর টেবিলে একটি পুরোনো বই। জানালার বাইরে কিয়োটোর শীত। ঘরের ভেতরে আলো। বইয়ের পাতায় ছোট অক্ষর। তিনি একটি বাক্য পড়ছেন। তারপর থামছেন। আরেকটি বই খুলছেন। দুটি সংস্করণ মিলিয়ে দেখছেন। একটি শব্দের অর্থ নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে। তিনি অভিধান খুলছেন। তারপর বুঝতে পারছেন—দুই শতাব্দী আগে একই শব্দ অন্য অর্থে ব্যবহৃত হতো। এমন একটি ছোট আবিষ্কার হয়তো সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় আসবে না। কিন্তু জ্ঞানের ইতিহাসে তার মূল্য অনেক। কারণ বড় জ্ঞান তৈরি হয় হাজার ছোট আবিষ্কার থেকে। আর সেই আবিষ্কারের জন্য দরকার বই। পুরোনো বই। নতুন বই। বিশ্বাসযোগ্য সংস্করণ। প্রকাশক। লাইব্রেরি। বইয়ের দোকান। ‘নাগাতা বুনশোদো’র মতো প্রতিষ্ঠান এই নীরব জগতেরই অংশ।
চাঁদও আজ রাতে—পুরোনো বন্ধুর মতো— ইয়োসা বুসন
একটি দোকানের আয়তন দিয়ে তার গুরুত্ব মাপা যায় না। একটি ছোট ঘর থেকেও বড় ইতিহাস তৈরি হতে পারে। ‘নাগাতা বুনশোদো’র ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই। একটি বইয়ের দোকান রাষ্ট্র নয়। বিশ্ববিদ্যালয় নয়। রাজপ্রাসাদ নয়। কিন্তু কখনো কখনো রাষ্ট্রের নীতির চেয়ে একটি বই দীর্ঘস্থায়ী হয়।
একটি রাজবংশ শেষ হয়ে যায়। একজন শাসকের নাম মানুষ ভুলে যায়। কিন্তু একটি বইয়ের বাক্য পাঁচশ বছর পরে কেউ পড়তে পারে। সেই কারণে বইয়ের দোকান ইতিহাসের প্রান্তে নয়। তার ভেতরেই আছে।
পুরোনো পথ—একটি কাক বসে আছে; শরতের সন্ধ্যা — মাতসুও বাশো

‘নাগাতা বুনশোদ’র ইতিহাস আমাদের একটি অদ্ভুত প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। একটি প্রতিষ্ঠান এত দীর্ঘ সময় কীভাবে টিকে থাকে? উত্তর এক কথায় দেওয়া যায় না। সময়ের সঙ্গে বদলাতে হয়। পাঠকের সঙ্গে বদলাতে হয়। প্রযুক্তির সঙ্গে বদলাতে হয়। কিন্তু একটি মূল বিশ্বাস ধরে রাখতে হয়। আর তা হলো— ‘বইয়ের প্রয়োজন শেষ হয়নি।’ যতদিন মানুষ জানতে চাইবে, ততদিন বইয়ের প্রয়োজন থাকবে। প্রশ্নের ধরন বদলাবে। কিন্তু কৌতূহল থাকবে।
শীত শেষ হলে—আমিও কি বসন্তের দিকে যাব?— কোবায়াশি ইস্সা
ধরা যাক, আজ সন্ধ্যায় আমি কিয়োটোর সেই পুরোনো বইয়ের জগতের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার হাতে কোনো বই নেই। শুধু একটি প্রশ্ন। চারশো বছর আগে যে মানুষটি বই বিক্রি করেছিল, সে কি জানত তার কাজ এত দীর্ঘ হবে? সম্ভবত না। যে ব্যক্তি প্রথম কোনো বৌদ্ধ গ্রন্থ ছাপতে সাহায্য করেছিল, সে কি জানত কয়েক শতাব্দী পরে গবেষকরা সেই গ্রন্থের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করবেন? সম্ভবত না। যে পাঠক একটি বই কিনে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল, সে কি জানত তার সেই ছোট কাজ জ্ঞানের ইতিহাসের একটি অদৃশ্য পদচিহ্ন হয়ে থাকবে? অবশ্যই না।
ইতিহাসের মজাই এখানে। মানুষ যখন ইতিহাস তৈরি করে, তখন সে সাধারণত জানে না যে সে ইতিহাস তৈরি করছে।একজন শুধু বই বিক্রি করে। একজন বই কেনে। একজন বই পড়ে। একজন বই ছাপে। একজন বই নিয়ে প্রশ্ন করে।তারপর শত বছর পরে আমরা সেই সব ছোট কাজকে একত্র করে বলি—‘এটাই ইতিহাস।’
বসন্তের দিন—আমি জানি না কত দূর পথ বাকি— মাতসুও বাশোর
‘নাগাতা বুনশোদো’র গল্প তাই একটি দোকানের গল্প দিয়ে শুরু হলেও শেষ হয় না দোকানে। এটি শুরু হয় একটি বইয়ে। তারপর যায় মন্দিরে। সেখান থেকে পাঠকের ঘরে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর গবেষকের টেবিলে। আর শেষে এসে পৌঁছায় আমাদের কাছে।
আমরা একটি পুরোনো বই খুলে দেখি। অক্ষরগুলো হয়তো এখনো স্পষ্ট। পাতাগুলো হলদে। মলাট ক্ষয়ে গেছে। কিন্তু ভেতরে একটি প্রশ্ন এখনও জীবিত—‘মানুষ কী জানতে চেয়েছিল?’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই মানুষ বই লিখেছে। ছেপেছে। বিক্রি করেছে। সংরক্ষণ করেছে। পড়েছে। আবার ব্যাখ্যা করেছে।
‘নাগাতা বুনশোদো’র ইতিহাস সেই দীর্ঘ মানবিক জ্ঞানযাত্রার একটি অংশ। একটি ছোট দোকান কীভাবে কয়েক শতাব্দী ধরে জ্ঞানের স্রোতের সঙ্গে চলতে পারে—তার একটি অসাধারণ উদাহরণ। আর হয়তো এ কারণেই পুরোনো বইয়ের দোকানকে শুধু দোকান বলা ঠিক নয়। দোকান পণ্য বিক্রি করে। কিন্তু বইয়ের দোকান কখনো কখনো ‘সময় বিক্রি করে’।
আপনি সেখানে টাকা দিয়ে একটি বই কিনে আনেন। কিন্তু বইয়ের সঙ্গে বাড়িতে নিয়ে আসেন এমন এক সময়, যে সময় আপনার জন্মের বহু আগে চলে গেছে। আপনি একজন মৃত মানুষের চিন্তা পড়েন। একজন অচেনা মানুষের প্রশ্ন জানতে পারেন। একটি পুরোনো সমাজের স্বপ্ন দেখতে পারেন। তারপর বইটি বন্ধ করেন। ঘরের নীরবতায় বসে থাকেন। এবং বুঝতে পারেন— চারশো বছর আগে একজন মানুষ একটি দরজা খুলেছিলেন। আজও সেই দরজা দিয়ে জ্ঞান ঢুকছে।
আর হয়তো সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—দরজাটি এখনও আমাদের জন্য খোলা আছে।
পরিচিতি
নাগাতা বুনশোদো জাপানের কিয়োটোর অন্যতম প্রাচীন বইয়ের প্রতিষ্ঠান। এর শিকড় ষোড়শ শতকের শেষভাগে, জাপানের কেইচো যুগে (১৫৯৬–১৬১৫)। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন নাগাতা চোবেই। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি ‘হিশিয়া’ ও ‘চোজিয়া’ নামে পরিচিত ছিল এবং ধর্মীয় গ্রন্থ প্রকাশ ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত ছিল।
সময়ের সঙ্গে নাগাতা বুনশোদো মূলত বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থের প্রকাশক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। বিশেষ করে জোদো শিনশু বৌদ্ধধর্মের বই প্রকাশে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। পাশাপাশি বৌদ্ধধর্মের নানা শাখা ও দর্শন নিয়ে গবেষণাধর্মী বইও প্রকাশ করেছে। উনিশ শতকেও এর প্রকাশিত গ্রন্থের উল্লেখ পাওয়া যায়।
কয়েক শতাব্দী পেরিয়ে আজও নাগাতা বুনশোদো কিয়োটোতেই প্রকাশনা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আধুনিক যুগে প্রকাশিত বইয়ের তালিকায় বৌদ্ধ দর্শন, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্ব ও তিব্বতি বৌদ্ধ সাহিত্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ রয়েছে। ‘বিবলিয়া তিবেটিকা’ সিরিজের মতো গবেষণামূলক প্রকাশনাও প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ জ্ঞানচর্চার ধারাকে বহন করছে।
প্রায় চার শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নাগাতা বুনশোদোর ইতিহাস আসলে একটি পরিবারের ব্যবসার ইতিহাসের চেয়ে বড়—এটি জাপানে ধর্মীয় জ্ঞান, মুদ্রণসংস্কৃতি এবং বইয়ের মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জ্ঞান সংরক্ষণের এক দীর্ঘ যাত্রার গল্প।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









