বুয়েনস এইরেসের ‘লিব্রেরিয়া দে আভিলা’-এ ঢুকলে প্রথমে মনে হবে, আপনি একটি পুরোনো বইয়ের দোকানে এসেছেন। একটু পরেই মনে হবে—না, ভুল হচ্ছে। আপনি আসলে একটি সময়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছেন।
দোকানটির গল্প শুরু ১৭৮৫ সালে। তখন আর্জেন্টিনা নামে স্বাধীন কোনো দেশ নেই। এই জায়গায় ছিল ‘লা বতিকা’—ওষুধ, মোমবাতি, ধর্মীয় ছবি, ক্রুশ আর আলতো পেরু থেকে আসা কিছু বইয়ের দোকান। আজকের আদোলফো আলসিনা ও বলিভারের কোণ তখন অন্য নামে পরিচিত। কিন্তু জায়গাটি থেকে গেল; শুধু শহর আর মানুষের নাম বদলাতে থাকল।
১৮০১ সালে এখানেই বিক্রি হয়েছিল বুয়েনস এইরেসের প্রথম সংবাদপত্র ‘এল তেলেগ্রাফো মেরসান্তিল’। অর্থাৎ বইয়ের সঙ্গে খবরেরও যেন একই ঘরে জন্ম হলো। বই তখন শুধু জ্ঞান নয়; পৃথিবীকে অন্যভাবে কল্পনা করার একটি উপায়।১৮১০-এর মে বিপ্লবের আগে এই দোকানে আসতেন ম্যানুয়েল বেলগ্রানো, হুয়ান হোসে কাস্তেইয়ো, মারিয়ানো মোরেনো ও হুয়ান হোসে পাসোর মতো তরুণেরা। তাঁরা ফ্রান্স থেকে আসা বই খুঁজতেন, পড়তেন বিপ্লবের নতুন চিন্তা। বাইরে ছিল ঔপনিবেশিক শহর; ভেতরে কয়েকজন মানুষ ভবিষ্যৎ পড়ছিলেন।
আনুমানিক ১৮৩০ সালে দোকানটির নাম হলো ‘লিব্রেরিয়া দেল কোলেহিও’। সামনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের বই জোগাত বলে এই নাম। পরে সেই প্রতিষ্ঠানই হয়ে ওঠে ‘কোলেহিও নাসিওনাল দে বুয়েনোস আইরেস’। এরপর দোকানটি যেন শহরের স্মৃতির সঙ্গে নিজের ঠিকানা বদলাতে অস্বীকার করল। তার ঘরে সাহিত্যিক আড্ডা বসত। এসেছেন সর্মিয়েন্তো, আলবের্দি, মিত্রে, হোসে হার্নান্দেস, পল গ্রুসাক; পরে বোর্হেস, বিওই কাসারেস, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর মতো লেখক ও বুদ্ধিজীবীরাও এই বইয়ের জগতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এখানেই বইয়ের দোকানটির আসল গুরুত্ব।
কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নয়, কোনো গবেষণাকেন্দ্রও নয়—তবু ‘লিব্রেরিয়া দে আভিলা’ লাতিন আমেরিকার সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাস বোঝার এক জীবন্ত উপাদান। কারণ একটি সমাজ কীভাবে চিন্তা বদলায়, তা শুধু তার লেখা বইয়ে নয়; বোঝা যায় কোন বই কোথায় বিক্রি হলো, কে তা পড়ল, কোন ধারণা কোন পাঠকের হাতে পৌঁছাল—সেই ইতিহাসেও।

একটি লাইব্রেরি বলে, কী সংরক্ষিত হয়েছে। একটি বইয়ের দোকান বলে, কী পড়া হচ্ছিল। বিশ শতকে এসে দোকানটির অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ে। ১৯৮৯ সালে ‘লিব্রেরিয়া দেল কোলেহিও’ বন্ধ হয়ে যায়। সংগ্রহ নিলামে বিক্রি হয়। জায়গাটি কয়েক বছর বন্ধ ছিল; এমনকি একসময় সেখানে ফাস্ট-ফুডের দোকান হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বইপ্রেমী মিগেল আভিলা উদ্যোগ নেন। ১৯৯৪ সালে তার নামে আবার দোকানটি খুলে যায়। পুরোনো বই, দুর্লভ সংস্করণ, সাময়িকী ও ঐতিহাসিক সংগ্রহ হয়ে ওঠে এর নতুন পরিচয়।
বর্তমান ভবনটি ১৯২৬ সালের। কিন্তু তার নিচতলায় বই বিক্রির ইতিহাস ১৭৮৫ থেকে। তাই ভবনটি এক শতাব্দীর, অথচ তার ভেতরের সময় প্রায় আড়াই শতাব্দীর। ২০০০ সালে বুয়েনস এইরেস শহর এটিকে সাংস্কৃতিক গুরুত্বসম্পন্ন ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে; ২০১১ সালে এটি জাতীয় ঐতিহাসিক স্থান হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবু তার সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো সরকারি স্বীকৃতিতে নয়।
একটি পুরোনো বই খুলে যখন কেউ হঠাৎ ১৮১০-তে পৌঁছে যায়, তখনই বোঝা যায় এই দোকানটি কী। হয়তো আমরা বই পড়ি না। বইই আমাদের পড়ে। আর ‘লিব্রেরিয়া দে আভিলার’ তাকের মধ্যে দাঁড়িয়ে মনে হয়—সময় কখনো চলে যায় না। সে শুধু মলাট বদলায়, একটি বই বন্ধ করে আরেকটি বই খুলে বসে থাকে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









