কিছু পরিবারে নীরবতা কোনো শূন্যতা নয়। বরং সেটিই হয়ে ওঠে পারিবারিক ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ বাক্য। সেখানে যুদ্ধ, শ্রেণি, যৌনতা, দেশত্যাগ কিংবা অপমানের কথা বলা হয় না। কিন্তু না-বলা কথাগুলো পরের প্রজন্মের শরীর ও স্মৃতিতে থেকে যায়।
মালয়েশীয় লেখক তাশ আও-এর নতুন উপন্যাস ‘দ্য সাউথ’ এমন এক পরিবারের গল্প, যেখানে ব্যক্তিগত জীবন আর একটি দেশের ইতিহাস ধীরে ধীরে একে অন্যের ভেতরে ঢুকে পড়ে। তার লেখায় মালয়েশিয়া শুধু একটি ভূখণ্ড নয়; এটি স্মৃতি, শ্রেণি, অভিবাসন, আকাঙ্ক্ষা এবং নীরবতার একটি জটিল মানচিত্র। স্প্যানিশ পত্রিক এল পাইস-এর পক্ষে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন কালচারাল জার্নালিস্ট অ্যালেক্স ভিসেন্তে।
আপনার লেখায় পরিবার বারবার ফিরে আসে। কেন?
তাশ আও: পরিবার আমাদের প্রথম পৃথিবী। আমরা ভাষা শেখার আগেই পরিবার থেকে অনেক কিছু শিখি—কী নিয়ে কথা বলা যায়, কী নিয়ে চুপ থাকতে হয়, কাকে বিশ্বাস করতে হয়, কী লুকিয়ে রাখতে হয়। পরে বড় হয়ে আমরা বুঝতে পারি, এই নীরবতাগুলোরও ইতিহাস আছে।
আমার নিজের পরিবারেও অনেক কিছু বলা হতো না। বিশেষ করে আমার বাবা-মায়ের প্রজন্মের কাছে কিছু অভিজ্ঞতা এতটাই গভীর ছিল যে সেগুলোকে ভাষায় আনা কঠিন। ফলে সন্তান হিসেবে আমরা তাদের জীবনের একটা অংশ বুঝতে পারতাম না। কিন্তু সেই অজানা অংশই আমাদের কল্পনাকে সবচেয়ে বেশি তাড়া করত।
‘দ্য সাউথ’ লিখতে গিয়ে আমি সেই জায়গাটির দিকে তাকাতে চেয়েছি—একজন মানুষ কীভাবে তার পরিবারের বলা কথার চেয়ে না-বলা কথাগুলো থেকেও নিজের পরিচয় তৈরি করে।
আপনার নিজের জীবনের সঙ্গে উপন্যাসটির সম্পর্ক কতটা?
তাশ আও: অনেকটাই। তবে এটি আত্মজীবনী নয়। বরং নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কিছু প্রশ্ন এসেছে। আমি মালয়েশিয়ায় বড় হয়েছি, পরে বিদেশে গিয়েছি। ফলে ‘আমি কোথাকার?’—এই প্রশ্নটি আমার জীবনে খুব স্বাভাবিকভাবেই এসেছে।
দেশ ছেড়ে গেলে আপনি বুঝতে পারেন, নিজের পরিচয়কে আপনি যতটা স্থির মনে করেছিলেন, তা আসলে ততটা স্থির নয়। আপনি অন্যদের চোখে নিজেকে দেখতে শুরু করেন। তারা আপনাকে এশীয় বলে, মালয়েশীয় বলে, অভিবাসী বলে, কখনো আবার আপনার লিঙ্গ পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার করে। তখন মনে হয়, পরিচয় যেন আপনার নিজের হাতে পুরোপুরি নেই।

শ্রেণির প্রশ্নটিও আপনার লেখায় গুরুত্বপূর্ণ
তাশ আও: হ্যাঁ। কারণ অর্থনৈতিক উন্নতি সব মানুষের জীবনকে একইভাবে বদলায় না।
মালয়েশিয়ায় একটি প্রজন্ম ছিল, যারা বিশ্বাস করেছিল—চুপচাপ পরিশ্রম করো, পড়াশোনা করো, টাকা উপার্জন করো, তাহলেই তোমার জীবন বদলে যাবে। এর পেছনে একটা রাজনৈতিক সমঝোতাও ছিল। রাষ্ট্র বলছে, রাজনীতি নিয়ে বেশি প্রশ্ন কোরো না; বিনিময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশীদার হও।
এই সমঝোতা অনেক মানুষকে মধ্যবিত্ত জীবনে পৌঁছে দিয়েছে। কিন্তু এর একটা মূল্যও ছিল। আপনি যদি সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন না করেন, তাহলে ধীরে ধীরে নিজের ইতিহাসের কিছু অংশ হারিয়ে ফেলেন।
আমার কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই পরিবর্তন শুধু অর্থনৈতিক নয়। এটি মানুষের ভেতরের সম্পর্কও বদলে দেয়। বাবা-মা সন্তানকে বলেন, ‘তোমার আমাদের মতো কষ্ট করতে হবে না।’ কিন্তু সন্তান যখন নিজের জীবন বেছে নিতে চায়, তখন সেই পুরোনো ত্যাগের ইতিহাস তার ওপর চাপ হয়ে ফিরে আসে।
এশীয় লেখকদের নিয়ে পশ্চিমে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, সেটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
তাশ আও: এখানে একটা অস্বস্তিকর বিষয় আছে। পশ্চিমা পাঠক অনেক সময় এশিয়ার লেখকের কাছে এমন কিছু খোঁজেন, যা তারা ‘এশীয়’ বলে চিনতে পারেন। যেন একটি বইকে অবশ্যই তাদের পরিচিত কোনো সাংস্কৃতিক ছবির ব্যাখ্যা দিতে হবে।
কিন্তু একজন লেখক কি শুধু নিজের দেশের প্রতিনিধি?
তাশ আও: আমি মালয়েশিয়া নিয়ে লিখি, কারণ সেটি আমার অভিজ্ঞতার অংশ। কিন্তু আমি একই সঙ্গে প্রেম, পরিবার, শ্রেণি, যৌনতা, ক্ষমতা ও স্মৃতি নিয়ে লিখি—যে অভিজ্ঞতাগুলো কোনো একটি দেশের সম্পত্তি নয়।
‘এশীয় সাহিত্য’ বলে একটি আলাদা তাক তৈরি করা কখনো কখনো আমাদের সাহায্য করে। আবার সেটি আমাদের সীমাবদ্ধও করে। কারণ তখন লেখককে মানুষ হিসেবে নয়, একটি অঞ্চলের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়।

আপনার উপন্যাসে অভিবাসনের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর নিজের দেশকে কীভাবে দেখেছেন?
তাশ আও: দূরত্ব অনেক কিছু পরিষ্কার করে। আবার অনেক কিছু আরও অস্পষ্ট করে।
দেশে থাকতে আপনি কিছু বিষয়কে স্বাভাবিক মনে করেন। বাইরে গেলে হঠাৎ সেগুলো অদ্ভুত লাগে। আবার বিদেশে থেকেও আপনি এমন কিছু অভ্যাস, ভয় বা স্মৃতি বহন করেন, যেগুলো আপনি কখনো সচেতনভাবে বেছে নেননি।
অভিবাসী জীবন তাই শুধু একটি দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া নয়। এটি নিজের ভেতরে একাধিক জায়গা বহন করা কখনো মনে হয় আপনি কোথাও পুরোপুরি ঘরের মানুষ নন। আবার একই সঙ্গে বুঝতে পারেন, আগের ঘরটিও আর আগের মতো নেই।
আপনার লেখায় অতীত বারবার বর্তমানের মধ্যে ফিরে আসে। ইতিহাস কি আপনার কাছে ব্যক্তিগত?
তাশ আও: ইতিহাস কখনো শুধু বইয়ের বিষয় নয়। ইতিহাস মানুষের শরীরে থাকে। পরিবারে থাকে। ভয় পাওয়ার পদ্ধতিতে থাকে। কোনো কথা না বলার অভ্যাসে থাকে। একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব হয়তো কয়েক দশক পরে একটি পরিবারের সম্পর্কের মধ্যে দেখা যায়। একজন বাবা কেন তার সন্তানকে সত্যিটা বলেন না—তার উত্তর হয়তো তার নিজের শৈশবের কোথাও লুকিয়ে আছে।
এই কারণেই আমি ইতিহাসকে বড় ঘটনাগুলোর তালিকা হিসেবে দেখতে চাই না। ইতিহাস মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ভেতর কীভাবে ঢুকে পড়ে, সেটাই আমার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আপনি কি মনে করেন লেখালেখি সেই নীরবতাকে ভাঙতে পারে?
সব নীরবতা ভাঙা সম্ভব নয়। আর সব নীরবতা ভাঙাও হয়তো দরকার নেই। কখনো লেখার কাজ হলো নীরবতার দিকে তাকিয়ে থাকা। কেন একজন মানুষ কথা বলতে পারছে না, কেন একটি পরিবার একটি ঘটনা ভুলে যেতে চাইছে, কেন একটি সমাজ কিছু স্মৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে—এই প্রশ্নগুলো করা। আমি মনে করি, সাহিত্যের শক্তি উত্তর দেওয়ার মধ্যে যতটা, প্রশ্নটিকে বাঁচিয়ে রাখার মধ্যেও ততটাই।
আপনার পরবর্তী বই নিয়ে কী বলা যায়?
তাশ আও: পরবর্তী বইটির পটভূমি লন্ডন। এটি আবারও পরিচয়, সম্পর্ক এবং স্থান পরিবর্তনের প্রশ্নে ফিরে যায়। তবে এবার শহরটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একটি শহর আপনাকে বদলে দেয়। আপনি ভাবেন, আপনি শহরটিকে দেখছেন। কিন্তু আসলে শহরও আপনাকে দেখছে—আপনার চলাফেরা, আপনার ভাষা, আপনার অর্থনৈতিক অবস্থান, আপনার একাকিত্ব। সম্ভবত শেষ পর্যন্ত আমার বইগুলোর প্রশ্ন একই— মানুষ কোথায় নিজের বলে অনুভব করে? আর সেই অনুভূতি তৈরি করতে তাকে কী কী হারাতে হয়?
কারণ বাড়ি কখনো শুধু একটি জায়গা নয়। কখনো বাড়ি হলো এমন একটি স্মৃতি, যেখান থেকে আপনি পালাতে চেয়েছিলেন। আবার শেষ পর্যন্ত সেখানেই ফিরে আসতে হয়।

পরিচিতি
তাশ আও মালয়েশীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক, যার সাহিত্যে ব্যক্তিগত স্মৃতি, পরিবার, অভিবাসন, শ্রেণি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাস পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়। ১৯৭১ সালে তাইপেতে জন্ম নেওয়া আও মালয়েশিয়ায় বেড়ে ওঠেন। পরে তিনি ইংল্যান্ডে পড়াশোনা করেন এবং লন্ডনে স্থায়ী হন।
২০০৫ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘দ্য হারমনি সিল্ক ফ্যাক্টরি’ তাকে আন্তর্জাতিক সাহিত্যাঙ্গনে পরিচিত করে। উপন্যাসটি মালয়েশিয়ার ঔপনিবেশিক অতীত, যুদ্ধ ও পারিবারিক সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে লেখা। বইটি প্রথম উপন্যাস হিসেবে ‘কমনওয়েলথ রাইটার্স প্রাইজ’-এর আঞ্চলিক পুরস্কার লাভ করে এবং ম্যান বুকার প্রাইজ-এর দীর্ঘ তালিকায় জায়গা পায়।
এরপর প্রকাশিত ‘ম্যাপ অব দ্য ইনভিজিবল ওয়ার্ল্ড’ (২০০৯) ও ‘ফাইভ স্টার বিলিয়নেয়ার’ (২০১৩)–এ তিনি মালয়েশিয়া ও বৃহত্তর এশিয়ার দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজকে দেখেছেন। ফাইভ স্টার বিলিয়নেয়ার-ও ম্যান বুকার প্রাইজ-এর দীর্ঘ তালিকায় ছিল। তার স্মৃতিকথাধর্মী বই ‘স্ট্রেঞ্জার্স অন আ পিয়ার’ (২০১৬) পরিবার, পরিচয়, যৌনতা ও দেশত্যাগের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে অনুসন্ধান করে।
আও-এর লেখায় ইতিহাস কখনো দূরের কোনো বিষয় নয়; তা মানুষের পরিবার, শরীর, আকাঙ্ক্ষা ও নীরবতার মধ্যে বেঁচে থাকে। তার সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘দ্য সাউথ’–এও পারিবারিক স্মৃতি ও মালয়েশিয়ার সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনের সেই দীর্ঘ ছায়া ফিরে এসেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









